বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে মৃত্যুর মিছিল
এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি সুপারিশ
Advertisement
মো. শহীদুল হক সরকার, নাটোর
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নাটোরের বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক এখন আক্ষরিক অর্থেই এক মৃত্যুফাঁদ। ২০১৪ সালে এক দুর্ঘটনায় ৩৮ জনের প্রাণহানির পর সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা এবং ডিভাইডার নির্মাণের সুপারিশ করা হলেও এক যুগেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সরু সড়ক, বিপজ্জনক অসংখ্য বাঁক, ফিটনেসবিহীন বাস আর ধীরগতির তিন চাকার যানের অবাধ চলাচলে এই মহাসড়কে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ।
সবশেষ মঙ্গলবার একই মহাসড়কে আরও ১২ জনের প্রাণহানির পর আবারও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুই ‘মৃত’ চালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত বাসের ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না। জানা যায়, ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বড়াইগ্রামের রেজুর মোড়ে দুটি যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নারী ও শিশুসহ ৩৮ জন নিহত হন। সেই ঘটনার পর তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং দুর্ঘটনা রোধে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটি সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা, ডিভাইডার নির্মাণ ও বিপজ্জনক বাঁকগুলো সোজা করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু এক যুগেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। ১২ বছর আগের সেই শোকাবহ দিনেই মঙ্গলবার বড়াইগ্রামে আবারও ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণ গেছে; আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এর কিছুদিন আগে আইড়মারী এলাকায় বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ৮ জন প্রাণ হারান। বনপাড়ার বাসিন্দা কলেজশিক্ষক নাজমুল ইসলাম জানান, কয়েক বছর আগে একই স্থানে যাত্রীবাহী বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন এবং বনপাড়া গাজী অটো রাইস মিলের পাশে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে আরও ১৪ জন নিহত হয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি হয়, কিছু সুপারিশ আসে, কিন্তু দিনশেষে তা ফাইলেই বন্দি থেকে যায়।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অত্যন্ত ব্যস্ত এই মহাসড়কটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক সরু এবং এতে কোনো ডিভাইডার নেই। বড়াইগ্রাম অংশের মাত্র ২৫ কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ১৫টি এবং অপর একটি ৬ কিলোমিটারের অংশে রয়েছে ১০টি বিপজ্জনক বাঁক। বাঁকগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও চালকরা তা তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গতিতে ওভারটেকিং করেন।
বাসচালক নুরুল ইসলাম জানান, মহাসড়কে অবাধে চলাচল করা ইজিবাইক ও অটোরিকশার মতো তিন চাকার যান এবং সড়কের খানাখন্দ দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ।
এ বিষয়ে নাটোর সওজ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আজহারুল ইসলাম বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সড়কটির প্রশস্ততা বাড়ানো জরুরি। মহাসড়কের উভয় পাশে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীত করার একটি পরিকল্পনা সরকারের মাস্টারপ্ল্যানে রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।
নাটোর-২ আসনের সংসদ-সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, মঙ্গলবারের দুর্ঘটনায় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ পেলে এবার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটির সদস্য ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দিতে পারব বলে আশা করছি।
‘মৃত’ দুই চালকের বিরুদ্ধে মামলা : বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, বনপাড়ায় বাস-ট্রাকের সংঘর্ষের ঘটনায় ‘মৃত’ দুই চালককে আসামি করে থানায় মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বড়াইগ্রাম থানায় মামলাটি করেন হাইওয়ে থানার এএসআই আকবর হোসেন। এ বিষয়ে থানার ইনচার্জ উপপরিদর্শক আলমগীর হোসেন বলেন, দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তারা প্রকৃতই চালক না সুপারভাইজার সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তে যদি দুই চালকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয় তাহলে মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হবে।
বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না : দুর্ঘটনাকবলিত আরপি পরিবহণের বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না। বিআরটিএ নাটোর অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বাসটির রুট পারমিট ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত রয়েছে; তবে এর ফিটনেস সনদের মেয়াদ গত ১৩ মে শেষ হয়। বুধবার দুপুরে নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে এই ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলার পেছনে দায়ীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
