প্রশাসনের নাকের ডগায় ভুয়া জার্মান ক্লাব
বিদেশি ক্লাবের সাইনবোর্ডে রমরমা মাদক ব্যবসা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী ঘিরে বিদেশি ক্লাবের সাইনবোর্ডে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান রমরমা মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতি রাতেই ডিজে পার্টিসহ নানা ধরনের বিতর্কিত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর নেপথ্যে ঢাকায় অবস্থানরত কতিপয় বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সম্প্রতি গুলশানে কথিত জার্মান ক্লাবে অভিযানের পর এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। এমনকি সবচেয়ে উদ্বেগের খবর হলো-আলোচ্য জার্মান ক্লাব সম্পর্কে জার্মান দূতাবাস কিছুই জানে না। অথচ জার্মান ক্লাব নাম দিয়ে অনেক বছর ধরে ডিপ্লোম্যাটিক জোনের মধ্যে বিশাল প্লটজুড়ে এমন কারবার চলছে। এমনকি মূল ফটকের সামনে সার্বক্ষণিক পুলিশের চেকপোস্ট বিদ্যমান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্লাব ঘিরে বিভিন্ন ধরনের পার্টি, ইভেন্ট ও মাদক ব্যবসাসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া পাশ্চাত্য ধারার অপসংস্কৃতিতে উঠতি বয়সিদের অনেকে ক্রমেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে।
যেভাবে অভিযান : সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ১৬ অক্টোবর রাত আড়াইটায় গুলশানের জার্মান ক্লাবে অভিযানের প্রস্তুতি নেয় নারকোটিক্স। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ফটক ভেতর থেকে তালা বন্ধ পাওয়া যায়। আভিযানিক দলের সদস্যরা বারবার গেট খোলার অনুরোধ করলেও ভেতর থেকে সাড়া মেলেনি। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের পেছন দিক দিয়ে বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পরে আভিযানিক দলের সদস্যরা পেছন দরজা দিয়ে ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, চারদিকে জমকালো আলোকসজ্জা। ‘নোভা’ নাইটস নামে ডিজে পার্টির আয়োজন। কয়েক জায়গায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ-বিয়ার স্তূপ করে রাখা। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। টানা ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা অভিযানে বিপুল পরিমাণ আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি মদ-বিয়ারসহ ডিজে পার্টির টিকিট, আর্থিক লেনদেনের বিভিন্ন ব্যংক রিসিট এবং মাদক সেবনের নানা ধরনের উপকরণ পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নারকোটিক্সের উপস্থিতি টের পেয়ে কর্তাব্যক্তিদের সবাই তড়িঘড়ি অন্যত্র সরে পড়েন। তবে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আতাউর রহমান শামীমকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় নারকোটিক্স। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অবৈধ মদ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজনের নাম বলেন। এদের একজন হলেন ওমর জামিল ওরফে জুডো ওরফে ডিজে জুডো। এ ঘটনায় নারকোটিক্সের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন।
গ্রেফতারকৃত শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নারকোটিক্স কর্মকর্তারা জানান, সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় জার্মান ক্লাবের সাইনবোর্ডে নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড চালানো হতো। বিশেষ করে অবৈধ মদের বারে গভীর রাত পর্যন্ত ডিজে পার্টির আয়োজন হতো নিয়মিত। বাড়ির বাইরে পুলিশি প্রহরা থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অনেকেই ভাবতেন এটি হয়তো বিদেশি দূতাবাস কিংবা পশ্চিমা কূটনৈতিকদের আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠান।
নারকোটিক্স কর্মকর্তারা জানান, অপরাধের বিস্তারিত জানার জন্য প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি কম্পিউটার হার্ডডিস্ক এবং সিসি ক্যামেরার ডিভিআর জব্দ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
অভিযানসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, সেখানে আয়োজিত ডিজে পার্টির একেকটি টিকিট ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হতো। এতে বেশকিছু বিদেশি অতিথি অংশ নিলেও বেশির ভাগই এ দেশীয়। এছাড়া ধনাঢ্য পরিবারের কতিপয় বখাটে সদস্যরাও নিয়মিত অংশ নিতেন।
তদন্তে পার্টি আয়োজক হিসাবে ওমর জামিল জুডো ওরফে জুডো, আয়ান এবং ডিজে সুমনের নাম পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে জুডো এবং আয়ানের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আতাউর রহমান সুমন জানিয়েছেন গুলশান-১ এর অবস্থিত এসটিএল (সাবের ট্রেডার্স লি.) নামের শুল্কমুক্ত মদের দোকান থেকে জার্মান ক্লাবের নামে গোপনে বিপুল পরিমাণ মদের চালান আনা হতো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মদের চালান আনার সময় ব্যবহার করা হতো হলুদ নম্বর প্লেটের গাড়ি।
রোববার দুপুরে সরেজমিন গুলশান-২ এ গিয়ে এক রিকশাচালককে জার্মান ক্লাবের নাম বলতেই তিনি ১০৪ নম্বর রোডের ২৪ নম্বর বাড়ির সামনে নিয়ে যান। রাস্তার পাশেই বিশাল এক বাড়ি দেখিয়ে বলেন এটিই জার্মান ক্লাব। রিকশা থেকে নেমে বাড়িটির কাছে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে বড় হরফে লেখা ৭৮ রেস্ট হাউজ সোসাইটি। ভেতরে জার্মানির পাতাকা টাঙানো।
ভারী স্টিলের পাত দিয়ে তৈরি পাশাপাশি দুটি ফটক। দুটিই ভেতর থেকে বন্ধ। এক পাশে পুলিশ বক্স। কিন্তু সেখানে কোনো পুলিশ সদস্য নেই। দরজার ওপরে ক্লাব বন্ধের নোটিশ ঝুলছে। এতে লেখা নির্মাণসংক্রান্ত কাজের জন্য ক্লাবের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।
দরজায় কয়েকবার টোকা দিলে কাচের জানালা দিয়ে মুখ বের করে একজন বলেন ক্লাব সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। পরে যোগাযোগ করবেন। নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ক্লাবের নিরাপত্তাকর্মী। নাম বলা নিষেধ।
ক্লাবের ওয়েবসাইটে যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বর এবং একটি ল্যান্ডফোন নম্বর দেওয়া রয়েছে। ফোন করা হলে মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ল্যান্ডফোনে রিং হলেও কেউ ফোন ধরেননি। ওয়েবসাইটে খাবার এবং পানীয় পরিবেশনের বেশকিছু ছবি থাকলেও ক্লাবের কার্যক্রম সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য নেই।
নারকোটিক্স বলছে, জার্মান ক্লাব নামে এটি পরিচালিত হলেও বাস্তবে এর সঙ্গে জার্মানির কোনো সম্পর্ক নেই। জার্মান ক্লাব সাইনবোর্ডের আড়ালে সেখানে অবৈধ মদের বার খোলা হয়। এর সঙ্গে স্থানীয় একটি চোরাকারবারি চক্র জড়িত।
অবৈধ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় পুলিশি প্রহরার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগ) আজাদ রহমান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ক্লাবের নিরাপত্তা দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটিতে কূটনীতিক এবং বিদেশি নাগরিকদের আনাগোনা ছিল। মূলত তাদের নিরাপত্তা দিতেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় পুলিশের নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়।

