ক্ষুধা মোকাবিলায় ভারত পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
পাকিস্তান সরকারের দারিদ্র্য মুক্তকরণ তহবিলের অর্থ তুলতে লাইনে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি নারীরা।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, পাকিস্তানের পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো বাংলাদেশের এই অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিপরীতে, পাকিস্তানে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি, শিশুদের অপুষ্টি, নারীদের কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ দেশটির ক্ষুধা পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স—জিএইচআই) প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল ক্ষুধা মোকাবিলায় ধারাবাহিক উন্নতি করেছে। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেই অগ্রগতির ধারা বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির পরিস্থিতি আবারও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
জার্মানির বনভিত্তিক ক্ষুধা মোকাবিলায় কাজ করা সংস্থা ওয়েলথাঙ্গারহিলফে, সুইজারল্যান্ডের জুরিখভিত্তিক সহায়তা সংস্থা হেলভেটাস এবং জার্মানির রুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ইনস্টিটিউট যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষুধা সূচকের স্কোর ১৯ দশমিক ২ নির্ধারণ করা হয়েছে। এই স্কোর অনুযায়ী, দেশটি মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের স্কোর ২৪ দশমিক ১, যা গুরুতর ক্ষুধা পরিস্থিতির নির্দেশক। পাকিস্তানের স্কোর আরও বেশি—২৫ দশমিক ৫। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও নেপাল।
পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ২০১৮ সালে দেশটির ক্ষুধা সূচকের স্কোর ছিল ২৪ দশমিক ০। বর্তমানে তা বেড়ে ২৫ দশমিক ৫ হয়েছে। সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১২২টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১০৬তম। দেশটির চেয়ে বেশি স্কোর রয়েছে আফগানিস্তান, সিয়েরা লিওন ও সিরিয়ার মতো কয়েকটি দেশেরও।
বাংলাদেশের অগ্রগতিতে নারীর কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবার ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুধা ও অপুষ্টি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার বিস্তার।
লন্ডনভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষক জাভেদ হাসান জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত নারীদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণও ক্ষুধা মোকাবিলায় দেশের অগ্রগতিতে অবদান রেখেছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজাও মনে করেন, নারীদের কর্মসংস্থানের ধারাবাহিক উন্নতি বাংলাদেশের ক্ষুধা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থান পাকিস্তানের তুলনায় খুব বেশি আলাদা না হলেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার এবং সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চারটি সূচকে নির্ধারিত হয় ক্ষুধার মাত্রা
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক চারটি প্রধান সূচকের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। এগুলো হলো—জনসংখ্যার মধ্যে অপুষ্টির হার, শিশুমৃত্যুর হার, বয়সের তুলনায় শিশুদের উচ্চতা কম হওয়া এবং উচ্চতার তুলনায় শিশুদের ওজন কম হওয়া।
সূচক নির্ধারণে অপুষ্টি ও শিশুমৃত্যুর জন্য ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ করে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাকি ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ করে গুরুত্ব পায় শিশুদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম হওয়া এবং উচ্চতার তুলনায় ওজন কম হওয়ার বিষয়টি।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে স্কোর নির্ধারণ করা হয় শূন্য থেকে ১০০-এর মধ্যে। স্কোর ১০-এর কম হলে ক্ষুধার মাত্রা কম, ১০ থেকে ১৯ দশমিক ৯ হলে মাঝারি, ২০ থেকে ৩৪ দশমিক ৯ হলে গুরুতর, ৩৫ থেকে ৪৯ দশমিক ৯ হলে আশঙ্কাজনক এবং ৫০ বা তার বেশি হলে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই হিসাবে বাংলাদেশের ১৯ দশমিক ২ স্কোর মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা পরিস্থিতি নির্দেশ করে। বিপরীতে, পাকিস্তানের ২৫ দশমিক ৫ স্কোর দেশটিতে গুরুতর ক্ষুধার চিত্র তুলে ধরে। ২০১৮ সালের তুলনায় পাকিস্তানের স্কোর বেড়ে যাওয়ায় দেশটির খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

