পিঠা-পুরিসহ ১৬ খাবার বেচতে লাগবে নিবন্ধন
জীবিকা হারানোর শঙ্কায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকার ফুটপাত কিংবা সড়কের পাশে ছোট্ট একটি চুলা, কড়াই, কয়েকটি থালা আর সামান্য পুঁজি নিয়ে চলছে পেটে-ভাতে ব্যবসা। পিঠা কিংবা পুরি-পেঁয়াজু; ঝালমুড়ি কিংবা ফলের রস বিক্রি করেই চলে শত শত পরিবারের সংসার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে যা আয় হচ্ছে, তা দিয়েই চাল-ডাল কেনা, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা আর নিত্যদিনের খরচ মেটাতে হচ্ছে। এবার সেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের খাবার বিক্রি করতে নিবন্ধনের আওতায় আসতে হচ্ছে।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) শর্ত মেনে নির্ধারিত নিবন্ধন ও লাইসেন্স নিতে হবে। এই কার্যক্রমের আবেদন শুরু হওয়ার খবরে তাদের সামনে দেখা দিয়েছে নতুন শর্ত পূরণের দুশ্চিন্তা। এতে অনেক ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের মাথায় জীবিকা হারানোর শঙ্কা ভর করেছে।
এদিকে গত ১৬ জুলাই ‘নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা ২০২৬’ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী-রাস্তার পাশে পিঠা, পুরি, পেঁয়াজু ও ফলের রস বিক্রির দোকানসহ নির্ধারিত ১৬ শ্রেণির খাদ্য ব্যবসায় নিবন্ধন করতে হবে। রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান, শিশুখাদ্য, খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী এবং অন্যান্য নির্ধারিত ব্যবসাও এর অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১ নভেম্বর থেকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে। ছোট খাদ্য ব্যবসার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে নিবন্ধন করা যাবে।
বৃহস্পতিবার কথা হয় রাজধানীর রামপুরা এলাকার পিঠা বিক্রেতা আমেনা বেগমের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার স্বামী চার বছর আগে মারা গেছে। দুই মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। এক মেয়ে প্রাইমারি স্কুলে পড়ছে। আরেক মেয়ের বয়স ৩ বছর। আমি এই পিঠা বিক্রি করেই আমার দুই সন্তানের খরচ, বাড়িভাড়া ও সংসারের পুরো ব্যয় বহন করছি। নিবন্ধনের নামে ব্যবসা বন্ধ হলে পথে নামতে হবে।
একই দিন রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকায় কথা হয় ঝালমুড়ি বিক্রেতা মো. মেজবাহ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, মুদি দোকান থেকে মুড়ি, চানাচুর, মসলা ও কাঁচাবাজার থেকে পেঁয়াজ-মরিচ এবং ধনে ও পুদিনাপাতা কিনে আমি ঝালমুড়ি বানিয়ে বিক্রি করি। আমার পুঁজি অনেক কম। প্রতিদিন মুড়ি বিক্রি করে লাভের টাকা জমিয়ে ৫ জনের সংসার চালাই। ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে উপায় থাকবে না।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু যাদের অনেকেরই ব্যবসার পরিধি ছোট, পুঁজি সীমিত এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নেই, তাদের পক্ষে নিবন্ধন করা কঠিন হবে। এজন্য ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নিবন্ধনের মাধ্যমে খাদ্য ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে উৎসাহিত করা এবং জবাবদিহির আওতায় আনা সহজ হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল যুগান্তরকে বলেন, সব ধরনের বিক্রেতা নিবন্ধনের আওতায় এলে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে। কারণ অনিরাপদ খাবার আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমি ২০১৮ সালে প্রশিক্ষণে চীনে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখেছি-রাস্তা থেকে সবাই খাবার কিনে বাড়ি ফিরছেন। সেখানে কোনো তদারকি সংস্থাও তদারকি করছে না। কারণ সেখানকার বিক্রেতারা সব ধরনের নিয়ম মেনে খাবার বিক্রি করছেন। নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে এই বিক্রেতারা সাধারণ মানুষকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করতে বাধ্য হবে।
