‘প্যারেন্ট স্টক’ আমদানিতে বিধিনিষেধ
রোজায় মুরগির দাম বাড়ার শঙ্কা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে প্যারেন্ট স্টকে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া ব্যবসা করছে। খামারিদের জিম্মি করে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো একদিন বয়সি মুরগির বাচ্চার দাম বাড়িয়ে বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। এতে মাঝেমধ্যেই বেড়ে যাচ্ছে ব্রয়লার মুরগির দাম। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা, ২০২৬-এর চূড়ান্ত খসড়ায় মুরগির ‘প্যারেন্ট স্টক’ আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সি মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ খসড়া বাস্তবায়ন হলে প্রান্তিক খামারি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তেমনই মাংস সংকটে রমজান মাসে বাজারে ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির দামও বেড়ে যাবে। পাশাপাশি ধ্বংস হবে এই খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্প।
এদিকে ১৩ জানুয়ানি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ‘জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। খসড়া নীতিমালার ৫.৮.১.২ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সি বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। কেবল একদিন বয়সি গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে।
এ বিষয়ে পোলট্রি প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ কৃষিবিদ অঞ্জন মজুমদার বলেন, এ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ত্রিমুখী সংকট তৈরি হবে। সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হবেন প্রান্তিক খামারি ও ভোক্তা। এ নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে একটা গণশুনানি করা প্রয়োজন। যেখানে সব স্টেকহোল্ডার অংশগ্রহণ করে তাদের মতামত দেবেন। তারপর বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এটি অনুমোদন দেওয়া উচিত। তিনি জানান, প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্পে এমন একটি নীতিমালা করা উচিত হবে না, যা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল প্রোডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মুরগির ‘প্যারেন্ট স্টক’ আমদানি বন্ধ করার আগে আমাদের সংকটকালে সমস্যা তৈরি হওয়ার শঙ্কা আছে কি না, তা দেখতে হবে। যদি শঙ্কা থাকে তবে তার বিকল্প কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটা আগে বিবেচনায় নিতে হবে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব অংশীজনের যেন ইতিবাচক মত থাকে, সেটাও অবশ্যই দেখতে হবে। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর কাঠামো নিশ্চিত না করা হলে নীতির লক্ষ্য অর্জনের বদলে পোলট্রি শিল্প, খামারি ও ভোক্তা-সবাই চাপের মুখে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী বলেন, পোলট্রি শিল্প কেবল একটি ব্যবসায়িক খাত নয়, এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা যেন প্রান্তিক খামারিদের পক্ষে যায়, সেটা আগে ভাবতে হবে। খামারিরা যেন সঠিক সময়ে ন্যায্যমূল্যে বাচ্চা পান, সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। আর এই নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হবে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে মুরগি সংকটে রোজার আগেই দাম বেড়ে যেতে পারে।
পোলট্রি খাতের প্রান্তি উদ্যোক্তারা নতুন নীতিমালার চূড়ান্ত খসরায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, নীতিমালা প্রণয়নের আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আয়োজিত একাধিক বৈঠকে তারা মুরগির ‘প্যারেন্ট স্টক’ আমদানি বন্ধ না করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সে সময় অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার ওপর জোর দিলেও চূড়ান্ত খসড়ায় নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত যুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন প্রফেসর ও পোলট্রি বিশেষজ্ঞ ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশে একদিন বয়সি পোলট্রি বাচ্চা উৎপাদনে সরকারের নিজস্ব বড় কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে সংকটকালে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর সরকারি সহায়তা দেওয়ার সুযোগও সীমিত। যেহেতু এই খাতটি মূলত বেসরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল, তাই যে কোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত শোনা এবং আলোচনার মাধ্যমে এগোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সামগ্রিক পোলট্রি খাতের উন্নয়নে নীতিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে দেশের পোলট্রি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে আরও জোর দেবে।
