Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

সন্ধ্যায় বৃষ্টির হানা

শিশুপ্রহর শেষ আজ বইমেলা শেষ কাল

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুপ্রহর শেষ আজ বইমেলা শেষ কাল

বইমেলায় শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশু প্রহরে পাপেট শো দেখছে শিশুরা -যুগান্তর

আগামীকাল রোববার শেষ হতে যাচ্ছে বাঙালির আবেগ ও উচ্ছ্বাসের অমর একুশে বইমেলা। এর আগে মেলার শেষ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হলো শিশু-কিশোরদের বহুল প্রতীক্ষিত ‘শিশুপ্রহর’। যেখানে শিশুদের জন্য ছিল পাপেট-শো, বায়োস্কোপ প্রদর্শন, পছন্দের বই দেখা ও কেনার সুযোগ। এছাড়াও ছিল আবৃত্তি, গান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশু-কিশোরদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ। সব মিলে শিশুদের উচ্ছ্বাস, হাসি আর সৃজনশীল অংশগ্রহণে বইমেলা প্রাঙ্গণ রঙিন হয়ে ওঠে। একই আয়োজন থাকছে আজ। দিনটিতে মেলার শেষ শিশু প্রহরে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুরা নিজেদের মতো করে আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। থাকবে যথারীতি কাকতাড়ুয়া থিয়েটার আয়োজিত পাপেট-শো, বায়োস্কোপ ও শিশুতোষ বইয়ের পাতা উলটানোর সুযোগ। এছাড়া মেলার নানা দিকে নান্দনিক ক্যানভাস পেছনে রেখে ছবি তোলার সুযোগ। শুক্রবার শিশুপ্রহর উপলক্ষ্যে সকাল থেকেই মেলায় ছিল শিশু ও অভিভাবকদের ভিড়। ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা যেমন- নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ মেলার প্রবেশদ্বার খোলার আগেই এসে উপস্থিত হন। মেলায় ঢুকেই চলে যান শিশুদের আনন্দ আয়োজনে। সময় গড়াবার সঙ্গে সঙ্গে সবার অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। ভিড় জমতে থাকে শিশুতোষ বইয়ের স্টলগুলোতেও। তবে এই ভিড় পুরো মেলা প্রাঙ্গণ স্পর্শ করেনি। অর্থাৎ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একদিকে ছিল ভিড় অন্যদিকে খরা। তবুও অন্যান্য দিনের তুলনায় রোববার বইপ্রেমী মানুষের আনাগোনা ছিল একটু বেশি। একদিকে শিশুরা আনন্দ উপভোগ করে, অন্যদিকে পুরস্কার নিয়ে মেলায় প্রবেশ করে। উচ্ছ্বসিত শিশুদের হাসিমুখে ভরে ওঠে শিশুপ্রহর। 

এদিন শিশুদের আনন্দ আয়োজনে যোগ হয়েছিল জনপ্রিয় লেখক ও অভিনয় শিল্পীদের আগমন। মেলায় প্রথমবারের মতো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কবি আনিসুল হক, অভিনয়শিল্পী ডা. এজাজুল ইসলামসহ বেশকজনকে দেখা যায়। তাদের ঘিরে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যায়। অনেকেই অটোগ্রাফ ও ফটোগ্রাফ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 

রমজান মাসে চলা বইমেলায় বিক্রির খরায় রোববার কিছু স্টলে তুলনামূলক ভালো বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মেলার অন্যপ্রান্তে-ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউশনের দিকে পাঠক ছিল না বললেই চলে। 

কাকতাড়ুয়া থিয়েটারের ঠিক উলটো দিকের স্টলটির নাম দোলন। এর স্বত্বাধিকারী কামাল মোস্তফা জানান, পুরো মাসে এবার যা বিক্রি হয়েছে অন্যান্য বছরের এক দিনের চেয়েও কম। সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ রসিকতা করে বলেন, মেলায় পাঠককে ডেকে ডেকে স্টলে আনতেছি এবার! পাঠক যেন আসতেই চান না!

এমনসব আলোচনার সময় বাংলা একাডেমির একজন প্রতিনিধিকে স্টলে স্টলে একটি স্লিপ দিয়ে যেতে দেখা যায়। জানতে চাওয়া হয় বিক্রির পরিমাণ ও সার্বিক অবস্থা। স্টল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মেলার শেষদিনে বাংলা একাডেমি জানিয়ে দেবে মেলার বিক্রির মোট হিসাব। ওইদিন প্রতিবারের মতো এবারও নান্দনিক বই প্রকাশ ও স্টল নির্মাণের জন্য দেওয়া হবে পুরস্কার। 

এদিকে শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর অন্যান্য স্থানের মতো নামে ফাগুনের বৃষ্টি। এই বৃষ্টি গ্রামীণ জীবনে বহুল প্রত্যাশিত হলেও বইমেলায় স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আঘাত হানে। এসময় মেলায় আগত বইপ্রেমী মানুষদের স্টলে ও গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতে দেখা যায়। আর বিক্রয় প্রতিনিধি ও প্রকাশকরা পলিথিন দিয়ে ঢেকে স্টলের বই ও নিজেদের বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করে। 

শিশু-কিশোরদের মধ্যে পুরস্কার পেলো যারা : শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ক-শাখায় ১ম হয়েছে মো. আফ্ফান আল হাসনাইন, ২য় হয়েছে আনহিতা রেদোয়ান আভা, ৩য় হয়েছে মো. রিসালাত শাহ। খ-শাখায় ১ম হয়েছে চারুলতা রহমান জারা, ২য় হয়েছে বায়ান রাশদান, ৩য় হয়েছে দ্যুলোক দ্যুতিমান। গ-শাখায় ১ম হয়েছে শ্রেয়া রায়, ২য় হয়েছে স্বস্তি চৌধুরী, ৩য় হয়েছে আদিত্য সাহা। 

শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় ক-শাখায় ১ম হয়েছে পূর্ণতা আদিত্য, ২য় হয়েছে সাহানা ইসলাম সাইফা এবং ৩য় হয়েছে আরওয়া রহমান তাজরি। খ-শাখায় ১ম হয়েছে তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছে বেহজারিন হাসান তারফি এবং ৩য় হয়েছে কারিমা হোসাইন দিয়া। গ-শাখায় ১ম হয়েছে সিমরিন শাহীন রূপকথা, ২য় হয়েছে রাজ্যশ্রী সাহা এবং ৩য় হয়েছে সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ। 

শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতায় ক-শাখায় ১ম হয়েছে শ্রীজা মন্ডল, ২য় হয়েছে মাগফিরাহ্ মাবরুরা তৈষী এবং ৩য় হয়েছে হিয়াঞ্জলি তরফদার। খ-শাখায় ১ম হয়েছে তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছে সার্থক সাহা এবং ৩য় হয়েছে বিদ্যাস্তুতি সিংহ। গ-শাখায় ১ম হয়েছে রোদসী নূর সিদ্দিকী, ২য় হয়েছে তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং ৩য় হয়েছে নাবিলা আক্তার রায়না। 

বদরুদ্দীন উমর ছিলেন সমাজবিশ্লেষক বুদ্ধিজীবী : বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত ‘স্মরণ : বদরুদ্দীন উমর’ শীর্ষক আলোচনায় প্রবন্ধ উপস্থাপনক্ষণে ফিরোজ আহমেদ বলেন, বদরুদ্দীন উমরের প্রধান পরিচয় তিনি একজন রাজনীতিবিদ, একজন বিপ্লবী তাত্ত্বিক। রাজনৈতিক বিপ্লব ছিল যার জীবনের লক্ষ্য। অন্যদিকে তিনি একজন সমাজবিশ্লেষক বুদ্ধিজীবী ছিলেন। উনিশ শতক নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ ছিল, কারণ তিনি উনিশ শতকেই গড়ে ওঠা এখানকার মধ্যবিত্তের সংকটকে সূত্রপাতের সময়টি দিয়েও বুঝতে চেয়েছেন। দেশভাগ নিয়ে তার আগ্রহ ছিল, কারণ আরও অনেক কিছুর সঙ্গে তা পরবর্তীকালের রাজনৈতিক গতিপথকে বহুভাবে প্রভাবিত করেছে। কৃষক ও কৃষি নিয়ে বদরুদ্দীন উমর বিপুল পরিমাণে লিখেছেন, কারণ এ দেশে সমাজ-রূপান্তরের ভিত্তি হিসাবে তিনি ভূমি সংস্কারকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। এ সব বিষয়েই বদরুদ্দীন উমরের লেখালেখি বেশ জনপ্রিয় এবং এখনো পাঠকপ্রিয়। তার রাজনীতির সঙ্গেও এ রচনাগুলোর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। 

আলোচকের বক্তব্যে সুমন রহমান বলেন, বদরুদ্দীন উমর বাংলাদেশে মার্কসবাদের রূপ এবং যুদ্ধপূর্ব ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক সমস্যাটি তিনি সুচারুরূপে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি গণ-অভ্যুত্থানের ধারণাকে যেমন সমর্থন জানিয়েছেন, তেমনি অভ্যুত্থানকে বিপ্লবে পৌঁছানোর একটি পথ বলে মনে করেছেন।

সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ আজম বলেন, বদরুদ্দীন উমরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, তিনি একজন একাডেমিক বুদ্ধিজীবী। তিনি জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব চাইতেন, গণ-অভ্যুত্থান চাইতেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আকাঙ্ক্ষাটি ছিল একটি রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের পরিগঠিত হওয়া, আর এজন্য তিনি অনবরত সমসাময়িক ইতিহাস বিশ্লেষণ করে গেছেন এবং জনগণের মধ্যে সেই আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন।

অন্যদিকে লেখক বলছি অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন নাসির আলী মামুন ও মোহন রায়হান। আলোচনা শেষে ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন এ. বি. এম সোহেল রশিদ, মিজানুর রহমান, এনামুল হক জুয়েল। সংগীত পরিবেশন করেন আলম আরা মিনু, হাসান চৌধুরী, জাকির হোসেন আখের, পিয়াল হাসান, ফরহাদ হোসেন নিয়ন, অধ্যক্ষ আশরাফ শাহিন, মনির হোসেন, হাবিবুর রহমান রেখা সুফিয়ানা, মৌসুমী ইকবাল, জ্যোৎস্না, মিতা মল্লিক ও রাফিজা আলম লাকি। অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন সংগীত পরিচালক জাবেদ আহমেদ কিছলু ও অভিনেতা এ বি এম সোহেল রশিদ। অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন জাসাসের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খান ও সদস্য জাকির হোসেন রোকন। 

আজকের বইমেলা : আজ শনিবার মেলা শুরু হবে বেলা ১১টায়। চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। থাকবে শিশুপ্রহর। বিকাল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেবেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করবেন আবুল আহসান চৌধুরী।

বইমেলায় আইনমন্ত্রীর বইয়ের মোড়ক উন্মোচন : অন্য প্রকাশ থেকে এসেছে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বই ‘শুধু মাধবীর জন্য’। শুক্রবার বিকালে অমর একুশে বইমেলায় অন্য প্রকাশের সামনে বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়। এ সময় নিজের বই সম্পর্কে আইনমন্ত্রী জানান, মনে মনে যা চেয়েছেন, যা কল্পনায় ভেবেছেন, সেটিই নিজের লেখা বই ‘শুধু মাধবীর জন্য’তে তুলে ধরেছেন। 

তিনি বলেন, ‘শুধু মাধবীর জন্য বইটি ড্রামাটিক মনোলগ, ১৮৫৫ সালে রবার্ট ব্রাউনিংয়ের কবিতার মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছে। মাধবী লেখকের একাকিত্বের বন্ধন পেরিয়ে কল্পনায় কাউকে নিজের মনের কথা খোলাসা করে বলার একটা প্ল্যাটফর্ম। আমি সেটাই করেছি। মনে যা চেয়েছি, যা কল্পনায় ভেবেছি, আমি মাধবীতে সেটারই সংকলন করেছি। এটা সেই সংকলনেরই বই আকারে প্রকাশিত রূপ।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেকটা লেখকের জন্যই তার পাঠক প্রেরণার উৎস। যারা আমার বই কেনার জন্য ভিড় করেছেন, তারা আমার পাঠক হবেন, এটা ভাবছি। সেটা আমার প্রেরণার উৎস হয়ে থাকছে।’

‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটি প্রকাশ প্রসঙ্গে অন্যপ্রকাশের কর্ণধার প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম বলেন, আসাদুজ্জামান লেখক এবং রাজনৈতিক কর্মী। মাধবী ওনার একটি কাল্পনিক চরিত্র। এই চরিত্র নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই গদ্য লিখে আসছেন। প্রায় ২৪৩টির মতো গদ্য লিখেছেন, চিঠি লিখেছেন মাধবীকে। সেই মাধবীকে নিয়ে লেখা চিঠিগুলোর ১২৫টি চিঠি নিয়ে ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইয়ের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হলো। পরবর্তী সময়ে হয়তো আরেকটা খণ্ড প্রকাশিত হবে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .