লটারির মাধ্যমে পদায়ন শুরু আজ
সাবরেজিস্ট্রার পদে বদলি বাণিজ্যে ‘গুডবাই’
সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য প্রশংসিত আইনমন্ত্রী। তবে যোগ্য কর্মকর্তা বাছাই নিয়ে আছে সংশয়ও
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাবরেজিস্ট্রার নিয়ে আর ‘বদলি বাণিজ্য’ থাকছে না। দীর্ঘদিনের এই অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে আইন মন্ত্রণালয় অভূতপূর্ব এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এখন থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি কিংবা পদায়ন করা হবে। এজন্য প্রথম ধাপে ঢাকা জেলাধীন সব কটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পোস্টিং দেওয়া হচ্ছে। আজ সকাল ১০টায় মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন শুভকাজের উদ্বোধন করবেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ সময় আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লাসহ সংশ্লিষ্ট পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাবরেজিস্ট্রার পদে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগকে ‘গুডবাই’ জানানো হচ্ছে। এজন্য আইনমন্ত্রীর এমন সাহসী সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছেন অনেকে। তবে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হলে একটা সমস্যা থেকেই যাবে। সেটি হলো-যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে খুবই দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা পদায়ন করা প্রয়োজন হবে সেখানে অনেকাংশে সফল নাও হতে পারে। কেননা সারা দেশে বর্তমানে ৫ শতাধিক সাবরেজিস্ট্রারের পদ থাকলেও সবাই একই যোগ্যতাসম্পন্ন নয়। আবার ‘এ’ ক্যাটাগরির স্টেশন হলেই যে তিনি খুবই পারদর্শী বা অভিজ্ঞ হবেন-তেমন নাও হতে পারেন। বিশেষ করে রাজধানীর মতো ভিআইপি এলাকার স্টেশনগুলোতে অধিকতর সৎ, দক্ষ ও ডিপার্টমেন্টের কাজের বিষয়ে খুবই দক্ষ কর্মকর্তা পোস্টিং দেওয়া প্রয়োজন। এখানকার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে সব ক্যাটাগরির দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে। এছাড়া এখানে সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী লোকজনের অবস্থান যেমন বেশি, সম্পদের মূল্যও অনেক বেশি। ফলে ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোতে ডাকসাইটে সাহসী সিনিয়র কর্মকর্তাদের পদায়ন করতে হবে। যেসব সাবরেজিস্ট্রার তিন-চার বছর পর জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি পাবেন এবং যাদের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে সেখান থেকে তালিকা করে লটারি করা উচিত। তা না হলে পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ হলেও সঠিকভাবে সেবাপ্রদান করাসহ রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব আদায় বিঘ্নিত হতে পারে।
এদিকে এসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সাবরেজিস্ট্রারদের অনেকে আইনমন্ত্রীর এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাবরেজিস্ট্রার যুগান্তরকে বলেন, অন্তত মহাদুর্নীতিবাজ প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের খপ্পর থেকে সাধারণ সাবরেজিস্ট্রাররা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবেন। এভাবে যদি পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করে লটারির মাধ্যমে পোস্টিং নিশ্চিত করা হয় তাহলে এ সেক্টরের অনিয়ম-দুর্নীতি করার চাপ অনেকটা কমবে। তারা বলেন, প্রতিটি সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সেবার মান বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রারদের সদিচ্ছার পাশাপাশি সার্বিকভাবে ভালো কাজ করার পরিবেশও থাকতে হবে। বেশির ভাগ অফিসে স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা করে। এসব বন্ধ হতে হবে। তাহলে প্রতিটি অফিসে ‘খুশি কমিশন’ কিংবা ‘অফিস খরচ’ নামে যে প্রথা চালু আছে তাতে যে কোনো সাবরেজিস্ট্রার চাইলে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নেশা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারেন।
সূত্রটি জানায়, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, সারা দেশে অন্তত ৬০টি এমন গুরুত্বপূর্ণ সাবরেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে, যেখানে পোস্টিং নিতে হলে সর্বনিম্ন ৪০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। এটিই অলিখিত প্রতিষ্ঠিত কালচার। যে এলাকার জমির দাম যত বেশি এবং দলিল রেজিস্ট্রি খরচ যত বেশি হয়, সেই অফিসের পোস্টিং রেটও তত বেশি। চিরায়ত এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে সব সরকারের আমলে দায়িত্বশীলরা একবাক্যে বলবেন-এসব অভিযোগ বানোয়াট। কিন্তু বাস্তবতা হলো রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টজুড়ে কয়েক স্তরে পোস্টিং বাণিজ্যের কিছু ‘জিন-ভূত’ আছে। যারা এসব কাজে বেশ পারদর্শী। সরকার বদল হলেও এ চক্র ঠিকই বহাল তাকে। হয়তো কিছু নাম যুক্ত হয়, আবার কিছু নাম বাদ যায়। কিন্তু এদের হাত থেকে মুক্তি নেই। ফলে অনেকে আশা করছেন, এবার হয়তো লটারি প্রথার মাধ্যমে সেটি ধীরে ধীরে বিদায় নিতে পারে।
