রংপুর টাউন হল
সার্ধশতবর্ষী স্মারক ধুঁকছে অবহেলায়
Advertisement
মাহবুব রহমান, রংপুর
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কালের সাক্ষী রংপুর টাউন হল -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক স্মারক হিসাবে প্রায় সার্ধশতবর্ষ ধরে দাঁড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হল। এটি শুধু আনন্দ, চিত্তবিনোদন বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূতিকাগার নয়। ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যের অনন্য এই নিদর্শন উত্তরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর কেন্দ্রবিন্দুও ছিল। পাশাপাশি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদারদের নির্মম নির্যাতনকেন্দ্র হিসাবেও এর ইট-পাথরে জড়িয়ে আছে বীরঙ্গনাদের আর্তচিৎকার আর অশ্রুসিক্ত ইতিহাস। ১৮৯১ সালে কাকিনার রাজা মহিমা রঞ্জন রায়ের স্মৃতিঘেরা জমিতে নির্মিত এই স্থাপনা আজ চরম অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। শরৎচন্দ চট্টোপাধ্যায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক থেকে সরোজিনী নাইডুর মতো মনীষীদের পদচারণায় ধন্য ঐতিহ্যবাহী কেন্দ টি অবিলম্বে সংস্কারে সোচ্চার হয়েছেন বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
রংপুর টাউন হলের নাম আসলে একজনের নাম আসে সবার আগে, তিনি হলেন রাজা মহিমা রঞ্জন রায়। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকলেও তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি ছিল প্রবল অনুরাগ। এ জন্য তিনি বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরির জন্য জমি দান করেছেন।
রংপুর অঞ্চলের নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশের জন্য ১৮৮৫ সালে তৎকালীন ‘রঙ্গপুর নাট্য সমাজ’ (রংপুর ড্রামাটিক অ্যাসোসিয়েশন বা আরডিএ) নামে রঙ্গ মঞ্চ বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৮৯১ সালে তিনি উৎসাহিত নাট্য সমাজকে একটি রঙ্গশালা প্রতিষ্ঠার জন্য ১০ বিঘা ৩ কাঠা জমি লিখে দেন। যার মধ্যে টাউন হলও ছিল। প্রথমে এর নাম ছিল ‘রংপুর নাট্য সমাহ গৃহ’। পরে এটি কালক্রমে জেলা প্রশাসনের মালিকানায় চলে আসে। অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রাদেশিক জাতীয় কংগ্রেসের কনফারেন্স উপলক্ষ্যে রংপুরে এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ চট্টোপাধ্যায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ বসু ও জেএম সেনগুপ্ত। সেখানে ‘দত্তা’ উপন্যাসের নাটরূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সুভাষ চন্দ বসু ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এখানে এসেছিলেন সরোজনী নাইডু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই টাউন হলে স্থাপন করেছিল ‘নারী নির্যাতন’কেন্দ । অনেক মুক্তিকামী নারী-তরুণীকে এখানে ধরে এনে ধর্ষণ ও নির্যাতন করে হত্যা করা করেছিল তারা। দেশ স্বাধীনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধরা সেখান থেকে অনেক নির্যাতিতাকে উদ্ধার করেছিলেন। সেখানে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের লাশ টাউন হলের পেছনে জঙ্গলে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া অনেকের লাশ সেখানের একটি কুয়ায় ফেলা হতো। সেখান থেকে উদ্ধার কিছু প্রামাণ্য স্মৃতি পরে কুড়িগ্রামের উত্তরবঙ্গ জাদুঘরে রাখা হয়। ওই কুয়ার কাছে পরে একটি স্মৃতি ফলক স্থাপন করা হয়। অথচ সেই স্মৃতিবিজড়িত ও ঐতিহ্যের স্মারক স্থাপনাটি এখন সংস্কারের অভাবে রুগ্নদশায় পরিণত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজী মোহাম্মদ জুন্নুন বলেন, রংপুরের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। আজ ভেতরের নকশা, পলেস্তারা খসে পড়েছে। চেয়ারগুলো ভেঙে গেছে, রুম অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নানা সংকটে ধুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি। সংস্কার না হলে এটি একদিন হারিয়ে যাবে।
নাট্য ব্যক্তিত্ব বিপ্লব প্রসাদ বলেন, আমরা যারা নাট্যচর্চা করে অভিনয় শিল্পী হয়েছি তাদের সবার সম্মান অর্জনের জন্য টাউন হলের অবদান রয়েছে। এ হলের মঞ্চ অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী তৈরি করেছে-যারা দেশে সিনেমা ও নাট্য জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। এই হলের ভগ্নদশা ক্রমাগত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এখনই এর সংস্কার জরুরি।
রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) রমিজ আলম জানান, টাউন হল একটি প্রাচীন স্থাপনা, অবকাঠামোগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে এটির সংস্কার প্রয়োজন। এ বিষয়ে আর্থিক বরাদ্দের জন্য বিভিন্ন ফোরামে কথা বলা হয়েছে। এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অর্থ পাওয়া গেলে এর সংস্কার কাজের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
