উখিয়ায় ‘হা হা’ রিঅ্যাক্টে মবকাণ্ড
ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে পিটুনিতে মায়ের মৃত্যু
বিএনপি ও ছাত্রদলের প্রতিহিংসার শিকার
Advertisement
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মবকাণ্ডে ছৈয়দা বেগম প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার রাত ৮টার দিকে উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের টাইপালং এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ফেসবুকে ছাত্রলীগ কর্মী ইউনুসের ‘হা হা’ প্রতিক্রিয়া (রিঅ্যাক্ট) জানানোকে কেন্দ্র করে নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তিনি বিএনপি ও ছাত্রদলের প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। মারধরের শিকার ছাত্রলীগ নেতা ইউনুসকে গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এদিকে, অভিযুক্তদের কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ-এলাকায় তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার সকালে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। জানা যায়, দেওয়ালে ‘জয় বাংলা’ লেখা নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে এলাকায় উত্তেজনা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাতে উখিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী হাসেম সিকদার জিসান ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। আর এ স্ট্যাটাসে ছাত্রলীগ নেতা ইউনুস ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন। এতে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হন। জিসানের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ ইউনুসকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। এসময় তাকে বাচাতে গেলে বন্ধু ইমরানকেও মারধর করে। খবর পেয়ে ইমরানের মা ঘর থেকে ছুটে এসে ছৈয়দা বেগম নিজের শরীর দিয়ে ছেলেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকে অকাতরে কিল-ঘুসি মারা হয়। মারধরের একপর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ছৈয়দা এলাকার সাব্বির আহমদের স্ত্রী। এর আগে ইউনুসকে রক্ষা করতে গিয়ে এনজিওকর্মী এসএম ইমরান হামলার শিকার হন। তাকেও গণপিটুনি দেওয়া হয়।
ছৈয়দা বেগমের স্বজনদের অভিযোগ-এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপি ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী জড়িত। তারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘিরে রাখে ও পুলিশ সদস্যদের হুমকি-ধমকি দেয়। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন-চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও উখিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী হাসেম সিকদার জিসান, উখিয়া উপজেলা বিএনপির সদস্য মিজান সিকদার, দক্ষিণ রাজাপালং শ্রমিক দলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সিকদার, ছাত্রদল নেতা জুলফিকার রহমান আকাশ, বিএনপি নেতা শামসুল আলম (অ্যাম্বুলেন্স শামসু), আবদুল করিম, ছৈয়দ বাবুল, মাহবুবুর রহমান ও ছালাম সিকদার প্রমুখ। নিহতের ছেলে এসএম ইমরান বলেন, কয়েকদিন ধরে হামলাকারীরা বাড়িতে একাধিকবার হামলার চেষ্টা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে আসছিল।
এদিকে, সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি নেতা মিজান রহমান সিকদার দাবি করেন, ওই নারীর গায়ে কেউ হাত তোলেনি। তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিদিন এ ধরনের হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু হচ্ছে। এমন কয়জনের মৃত্যুর জন্য পুলিশ মামলা করতে পারবে?
স্থানীয়দের অভিযোগ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক গ্রুপ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও মব সন্ত্রাস চালিয়ে আসছিল। ছৈয়দা বেগম সেই দাপটেরই নির্মম শিকার। তাদের অভিযোগ-ছাত্রদল নেতা জিসানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক তারেক মাহমুদ রাজিব চৌধুরীর আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছেন। এ গ্রুপের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।
তারেক মাহমুদ চৌধুরী রাজিব যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ঘটনাটির তদন্ত করার অনুরোধ জানান তিনি। উখিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, দুই পক্ষ দুই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। এক পক্ষের দাবি-নিহত নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যপক্ষের দাবি-স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এ কারণে আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। প্রশাসনকে আমরা সহযোগিতা করব।
