বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস আজ
হতদরিদ্রদের অর্ধেকই পান না সামাজিক সুরক্ষা
Advertisement
আরমান হেকিম
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দারিদ্র্য কমাতে যত উদ্যোগই নেওয়া হোক না কেন মূল্যস্ফীতির ফলে কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকায় আয় বাড়ানোর সুযোগও সীমিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়ন এ তথ্যে দেখা যায়, গত ৪ বছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দারিদ্র্যের হার বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। অথচ বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই সামাজিক সহায়তা পায় না। অর্থাৎ যাদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের বড় একটি অংশই সরকারি সুরক্ষার আওতায় নেই।
এর বাইরে রয়েছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষ। দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা এসব মানুষ অসুস্থতা, চাকরি হারানো, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ধাক্কায় আবার দরিদ্র হয়ে পড়তে পারেন। ফলে দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি মানুষকে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এমন বাস্তবতা সামনে রেখে আজ (শনিবার) বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্যে নিরাপদ আবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে দারিদ্র্যের বর্তমান চিত্র শুধু আয় ও কর্মসংস্থানের সংকট নয়, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বরাদ্দ বাড়ানোর পরও কেন সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের একটি বড় অংশ সহায়তার বাইরে থাকছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
দারিদ্র্য কমার অগ্রগতিতে ছেদ : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছিল। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এলেও এই অগ্রগতির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তুলনামূলকভাবে বেশি পেয়েছেন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ আয়ের মানুষ। দরিদ্র মানুষের আয় ও ভোগের উন্নতি হয়েছে কম। আয়বৈষম্য এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা দারিদ্র্য হ্রাসের গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এর প্রভাব পড়েছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আগের কয়েক বছরের অগ্রগতির পর আবার দারিদ্র্য বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে থাকা জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, অসুস্থতা কিংবা জীবিকার ক্ষতি হলে তাদের একটি অংশ আবার দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারেন। ফলে বর্তমানে দরিদ্র মানুষের সহায়তার পাশাপাশি এই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আয় বাড়লেও কমছে ক্রয়ক্ষমতা : দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। খাদ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যয় বাড়ায় ক্রয়ক্ষমতা কমে আগের আয় দিয়েই প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। উচ্চ আয়ের পরিবার বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে পারলেও নিম্ন আয়ের পরিবারকে খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শিক্ষার মতো প্রয়োজনীয় খাতে কাটছাঁট করতে হয়। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে, ঋণ করে কিংবা পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমিয়ে সংসার চালায়। সাময়িক সংকট এভাবে দীর্ঘমেয়াদি বঞ্চনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কর্মসংস্থানের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে শ্রমবাজারের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের দুর্বলতা এবং উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের অভাবের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কাজের সুযোগ সীমিত হলে নতুন শ্রমশক্তির জন্য আয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়। আবার কাজ থাকলেও তা যদি অনিয়মিত হয় কিংবা মজুরি দিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানো না যায়, তাহলে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থান এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য কমাতে শুধু কাজের সুযোগ বাড়ালেই হবে না; নিয়মিত আয় ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেয়, এমন কর্মসংস্থানও তৈরি করতে হবে।
বরাদ্দ বাড়লেও সহায়তার বাইরে দরিদ্ররা : দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার ঝুঁকি কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারীদের ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্যসহায়তা এবং বিভিন্ন নগদ সহায়তার মাধ্যমে সরকার দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। সে হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে ১৭ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। তবে বরাদ্দ বাড়লেই সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত নয়। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক সামাজিক সহায়তা পায় না। অন্যদিকে, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের একটি অংশও এসব কর্মসূচির সুবিধা পায়। শহরের সবচেয়ে সচ্ছল ২০ শতাংশ পরিবারের কাছে বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পৌঁছানোর বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এ চিত্রে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুটি দুর্বলতা স্পষ্ট-প্রকৃত দরিদ্রদের একটি অংশকে শনাক্ত করতে না পারা এবং তুলনামূলক সচ্ছল মানুষ সরকারি সুবিধা পাওয়া। ফলে বরাদ্দ বাড়লেও তার সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে।
নিরাপদ আবাসনও দারিদ্র্য মোকাবিলার অংশ : দারিদ্র্যকে শুধু আয় দিয়ে পরিমাপ করলে মানুষের বঞ্চনার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। একটি পরিবারের আয় কিছুটা বাড়লেও যদি নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকে কিংবা চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে ঋণ করতে হয়, তাহলে তাদের দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকেই যায়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসের এবারের ভাবনায় নিরাপদ আবাসনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান মানুষের মর্যাদা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে আয়ের বড় অংশ চলে যায় বাড়িভাড়ায়। ফলে খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্য হাতে অর্থ কম থাকে। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে নদীভাঙন, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে বসতভিটা হারালে পরিবারগুলো শুধু ঘরই হারায় না; তাদের সঞ্চয়, জীবিকার উপকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন করে ঘর করতে গিয়েও অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় পড়ে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘করোনা মহামারিতে চাকরি হারানোসহ নানা কারণে অনেক মানুষের আয় কমেছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা আরও কমেছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে আগের চেয়ে কম খরচ করেও অনেক পরিবার তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। আয় কমে যাওয়া এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার এই চাপ মানুষকে আরও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’
দারিদ্র্যের চক্র ভাঙতে প্রয়োজন কার্যকর নীতি : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি চ্যালেঞ্জ। একদিকে বর্তমানে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমানো, অন্যদিকে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা। এজন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং কৃষি ও শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তরুণ ও নারীদের জন্য স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
