সোনারগাঁয়ে চাঁদাবাজের পিটুনিতে নিহত
ছেলের আবদার পূরণ করা হলো না মুমিনুলের
Advertisement
আমির হুসাইন স্মিথ, নারায়ণগঞ্জ, আল আমিন তুষার সোনারগাঁ
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ছোট ছেলের সঙ্গে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া বায়না পূরণ হলো না সোনারগাঁয়ের সনমান্দী ইউনিয়নের নাজিরপুর গ্রামের হতদরিদ্র অটোরিকশাচালক মো. মুমিনুল মিয়ার। ইচ্ছা ছিল অতিরিক্ত সময় অটোরিকশা চালিয়ে বেশি টাকা আয় করে ছেলের জন্য একটি ব্রয়লার মুরগি কিনে বাড়িতে ফিরবেন। ছোট ছেলে হাসান ও বড় ছেলে রহিমকে নিয়ে একসঙ্গে রান্না করা মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খাবেন। কিন্তু অটোরিকশা চালাতে গিয়ে এক পেশাদার চাঁদাবাজের পিটুনিতে তাকে খুন হতে হয়।
লাইনম্যান নামের চাঁদাবাজ শাহিনের দাবি করা ১০ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় মমিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাবাকে হারিয়ে সেই কথাই বারবার বলছেন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে হাসান। একমাত্র উপার্জনক্ষম গৃহকর্তাকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন স্ত্রী রিনা আক্তার। বারবার বলছিলেন, মমিন মিয়ার আয় দিয়েই চলত তাদের চারজনের সংসার। এখন কীভাবে চলবে দুই ছেলের লেখাপড়া। সংসার চলবে কীভাবে?
রিনা আক্তার বৃহস্পতিবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মাত্র ১০ টাকা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় জীবন দিতে হয়েছে মমিনকে। যে চাঁদাবাজ মমিনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তার সঙ্গে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতাকর্মীও চাঁদা উত্তোলনে জড়িত। তাদের আশ্রয়ে মূলত স্থানীয় দড়িকান্দী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রতিনিয়ত চাঁদা উত্তোলন করত মূলহোতা শাহিন। তাদের ভয়ে এলাকার কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। মুমিনুল মিয়াকে পিটিয়ে আহত করার পর থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও পুলিশের ভূমিকাও ছিল রহস্যজনক। ঘটনার মূলহোতা চাঁদাবাজ শাহিনকে গ্রেফতার করতে একবারও ঘটনাস্থলে অভিযান চালায়নি পুলিশ।
মমিনের বড় ছেলে হাসান সোনার বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনির ছাত্র। আর ছোট ছেলে নাজিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।
জানা যায়, উপজেলার দড়িকান্দি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় শাহিন ৫ আগস্টের পর থেকে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার যোগসাজশে প্রতিদিন বিভিন্ন অটোরিকশা ও সিএনজি বেবিট্যাক্সি থেকে ১০ টাকা করে চাঁদা উত্তোলন করে আসছিল। রোববার বিকালে মুমিনুল তার অটোরিকশা নিয়ে দড়িকান্দি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান করলে শাহিন মিয়া তার কাছে ১০ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এ সময় মুমিনুল মিয়া তাকে ১০ টাকা আগেই পরিশোধ করেছেন বলে উল্লেখ করেন। এতে কোনো কর্ণপাত না করে চাঁদাবাজ শাহিন আবারও মমিনের কাছে ১০ টাকা দাবি করেন। এক পর্যায়ে তাদের উভয়ের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। পরে শাহিন মিয়া অটোরিকশা চালক মুমিনুল মিয়াকে মাথার বিভিন্ন স্থানে অব্যাহতভাবে কিলঘুষি মারতে থাকেন। এ সময় মুমিনুল মিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে মুমূর্ষু অবস্থায় রাজধানীর নিউরোসাইন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিওতে) পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে বুধবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা। এ সময় মহাসড়কের চট্টগ্রাম লেনে যান চলাচল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। ঘণ্টাব্যাপী এ অবরোধে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত চাঁদাবাজ শাহিন মিয়া পলাতক রয়েছে। এ ঘটনায় মমিনের বড় ভাই মোবারক হোসেন সোনারগাঁ থানায় একটি মামলা করেন।
এদিকে বুধবার বিকালে মমিন মিয়ার লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে এক হৃদয় বিদারক ঘটনার অবতারণ ঘটে। স্বজনদের কান্নায় আশপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পরে জানাজা শেষে স্থানীয় নাজিরপুর সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার বলেন, পুলিশ ইতোমধ্যে আসামিকে গ্রেফতারের ব্যাপারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু করেছে।
