নিজের অপরাধ ঢাকতে ‘ঢাল’ হলো ভিকটিম
ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ছড়িয়ে দেন ওসি
Advertisement
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চকরিয়া থানার ওসি মনির হোসেন। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পুলিশ সদস্যের নির্যাতন ও নিজের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নিয়ে তৈরি হওয়া দেশজুড়ে সমালোচনা আড়াল করতে নিষ্ঠুর পথ বেছে নিয়েছেন কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন। সম্প্রতি এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ঘটনার নেপথ্য নির্দেশদাতা হিসাবে ওসির অপসারণ ও শাস্তির দাবি থেকে জনদৃষ্টি সরাতে অভিযানে উদ্ধার হওয়া ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে ‘ঢাল’ হিসাবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে।
আইনি ও মানবিক সব রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওই কিশোরীর ছবি থানা পরিচালিত ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেছেন খোদ ওসি। শুধু তাই নয়, অভিযোগ উঠেছে, বুকের ওড়না সরিয়ে ভিকটিমের সেই আপত্তিকর ছবি ওসি মনির নিজেই তুলেছেন। সোমবার রাতে ছবিটি প্রকাশ করা হয়। আইনি সুরক্ষার বদলে পুলিশের এমন চরম সংবেদনহীন ও বেআইনি আচরণে স্তম্ভিত স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা।
কেবল ছবি প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি ওসি মনির। অভিযোগ উঠেছে, নিজের ‘তৎপরতা’ জাহির করতে এবং সমালোচকদের কড়া জবাব দিতে সোমবার রাতে ওই ছবির সঙ্গে ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসও জুড়ে দেন তিনি। চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ওসির নিজের ভাষায় লেখা ওই দীর্ঘ বয়ানটি এতটাই কুরুচিপূর্ণ এবং ভিকটিমের জন্য আপত্তিকর যে, নৈতিক ও আইনি কারণে তা কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। সমালোচানার মুখে ফেসবুক পেজটি ডিএকটিভ করেন ওসি।
পুলিশ সূত্র জানায়, শনিবার সন্ধ্যায় চকরিয়ায় এক তরুণীকে উদ্ধারের অভিযানে গিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকাকে লাঠিপেটা করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে ওই রাতেই অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আরকানুল ইসলামকে চকরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। পুলিশের দাবি, উদ্ধার হওয়া তরুণী অপহরণ ও ধর্ষণের শিকার। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মামলার পর তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে শক্তি প্রয়োগ করা হয়। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ওসি মনির। স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।
ওসির এমন কাণ্ডে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনরা। ইসুফ বিন হোসেন নামের স্থানীয় এক সাংবাদিক ফেসবুকে লিখেছেন, কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে ছবি তুলে বিবৃতি দেওয়া কি বেশি জরুরি ছিল?
মেয়েটির বাবা যুগান্তরকে বলেন, আমার মেয়েকে পুলিশ উদ্ধারের পর কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। সেখানে চিকিৎসকরা আমার মেয়ের ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন বলে ওসি আমাকে জানিয়েছেন। তবে ফেসবুকে আমার মেয়ের ছবি প্রচারের বিষয়ে ওসি আমাকে কিছুই জানাননি, আমার কোনো অনুমতিও নেননি। মেয়ের মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন কি না, তাও আমি জানি না।
কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ১৪ ধারা অত্যন্ত স্পষ্ট। এ আইন অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার কোনো নারী বা শিশুর ছবি, নাম, ঠিকানা বা পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের জেল এবং অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের অভিযোগ, ওসির এ বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হলে বা সংবাদ প্রকাশ করলে সাংবাদিকদের ‘ডাকাতি ও ইয়াবা মামলায় ফাঁসানো’র হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, ওসি ফেসবুকে ভিকটিমের ছবি দিয়ে ঠিক করেননি। আমি তার সঙ্গে কথা বলব। পাশাপাশি তার আরও কিছু বিষয় আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার কক্সবাজারে এলে এ বিষয়ে এসপি স্যার আর আমি কথা বলব।
ওসির অপসারণসহ পৃথক শাস্তির দাবি : সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘ভিকটিমের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। সেখানে উলটো তার পরিচয় বা ছবি প্রকাশ করা হলে তা ভিকটিমের প্রতি দ্বিতীয় দফা অবিচারের শামিল। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ওসিকে অবিলম্বে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে পৃথকভাবে বিভাগীয় তদন্ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং প্রচলিত আইনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আমি দ্রুত জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়টি একটু জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
