গুলিবিদ্ধের ৮ দিন পর কাইল্যা পলাশের মৃত্যু
আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোন্দলই কাল
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৮ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশ। শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের ৭ মে জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি। এর মাত্র এক মাসের মাথায় গুলিতে নিহত হলেন তিনি। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্বজনদের ধারণা-আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার এবং দীর্ঘদিনের শত্রুতার জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলার নেপথ্যে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
১২ জুন জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে রামপুরার বিটিভি ভবনের বিপরীত পাশের সড়কে হামলার শিকার হন কাইল্যা পলাশ। আগে থেকে ওতপেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তার মাথা ও শরীরে তিনটি গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে মাথা থেকে একটি গুলি অপসারণ করা হলেও জ্ঞান ফেরেনি। পরে ১৪ জুন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে টানা কয়েকদিন কোমায় থাকার পর শুক্রবার রাতে তার মৃত্যু হয়। শনিবার সকালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। পরে জানাজা শেষে তার লাশ আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেফতার দুই : পলাশের ওপর হামলার ঘটনায় তার স্ত্রী মাহমুদা খানম বাদী হয়ে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় আসামি হিসাবে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান এবং তার সহযোগী গুজা বাদশা, গলদা বাদশা, পিচ্চি শান্ত, সোলাইমান খন্দকার, ফারুক, হেবেল, মোল্লা জনি, ফিরোজ মোল্লা, তোতলা আলামিন ও সজীবসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। পলাশের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হামলার পর শুটারকে মোটরসাইকেলে পালাতে সহায়তার অভিযোগে ১৩ জুন বাড্ডা এলাকা থেকে ইমাম হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আর ১৫ জুন মগবাজারের উত্তর নয়াটোলা এলাকা থেকে মারুফ সুলতান ওরফে ফেরদৌসকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরে তাদের থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার দুজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত : তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, হামলায় পাঁচ থেকে ছয় সদস্যের একটি দল অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মামুন ও রনি ব্যাকআপ টিমের শুটার ছিল। আর ইমন নামে একজন সরাসরি কাইল্যা পলাশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলার পর শুটারকে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল ইমাম।
তদন্তকারীদের ধারণা, হামলা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। পলাশের গতিবিধি আগে থেকেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। জুমার নামাজ শেষে ফেরার সময়কে তারা সুযোগ নেয়। প্রাথমিক তদন্তে হামলাকারীরা জিসান গ্রুপের সদস্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পুরোনো শত্রুতার জের : ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে, ২০০২ সালে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা এবং পরবর্তী সময়ে আনোয়ারুল নামে আরেক ব্যক্তিকে হত্যা নিয়ে জিসান গ্রুপের সঙ্গে পলাশের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এছাড়া কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পলাশ আবারও এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং পুরোনো বিরোধের জেরে পলাশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। হামলার স্থানও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০২ সালে যুবদল নেতা মিজান হত্যার ঘটনাও ওই এলাকায় সংঘটিত হয়েছিল। ফলে সেই পুরোনো ঘটনার সঙ্গে বর্তমান হামলার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
কারাগারে থেকেও ছিল প্রভাব : পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজান হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন কাইল্যা পলাশ। বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে উচ্চ আদালত সেই সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন।
২০০৩ সালে গ্রেফতারের পর দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকলেও কাইল্যা পলাশের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তার। সহযোগীদের মাধ্যমে এলাকার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং আদালতে হাজিরার ফাঁকে বাসায় যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তদন্তও করেছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জিসান গ্রুপের দিকে নজর : পুলিশ সূত্র জানায়, জিসান আহমেদ মন্টি ওরফে জিসান পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। ২০০৩ সালে মালিবাগে ডিবির দুই সদস্য হত্যাকাণ্ডের পর সে বিদেশে পালিয়ে যায় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য। তবে বিদেশে অবস্থান করেও অনুসারীদের মাধ্যমে রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, গুলশান ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ যুগান্তরকে বলেন, গ্রেফতার দুজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের নাম বলেছে। শুটারকেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারে একাধিক টিম কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, তদন্ত চলছে। হামলায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা গেলে ঘটনার পেছনের পুরো চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

