বিলুপ্তির পথে ‘রেংমিটচ্যা’ জনগোষ্ঠী
ভাষা টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ
বিশ্বের মাত্র ৫ জন জানেন ‘রেংমিটচ্যা’ ভাষা
বান্দরবানের আলীকদমের দুর্গম ক্রাংসিপাড়ায় ‘রেংমিটচ্যা’ ভাষা জানা তিন ব্যক্তি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের মাত্র পাঁচজন মানুষ জানেন এরকম একটি ভাষা রয়েছে বাংলাদেশের বান্দরবানে। নাম ‘রেংমিটচ্যা’। যারা জানেন, তাদের প্রত্যেকের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ভাষাটি এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। কিন্তু একসময় এই ভাষায় মুখর ছিল আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ি জনপদ। ভাষাটি টিকিয়ে রাখতে চলছে অবিরাম যুদ্ধ। এ যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য অনেক প্রাসঙ্গিক। কারণ, এদেশের মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ফলে রেংমিটচ্যা ভাষা টিকিয়ে রাখতে প্রথমে গবেষণা শুরু করেন আয়ারল্যান্ডের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করা বাংলাদেশের পিএইচডি গবেষক আফসানা ফেরদৌস। বর্তমানে এ কাজ এগিয়ে নিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
সরেজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, বান্দরবানের আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি অঞ্চলের রেংমিটচ্যা ভাষা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সংকটাপন্ন। কেউ কেউ বলছেন, এটি ম্রো ভাষার উপভাষা। কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা। একসময় এ ভাষা একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করলেও বর্তমানে মাত্র ৫ জন প্রবীণ ব্যক্তি এটি বলতে পারেন। আবার তাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি। তাদের অবস্থান আলীকদম উপজেলার দুর্গম ক্রাংসিপাড়ায়। নতুন প্রজন্মকে রেংমিটচ্যা ভাষা শেখাতে ক্রাংসিপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেনা মৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেনাবাহিনী নিজেদের খরচের টাকা বাঁচিয়ে এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।
গবেষণায় দেখা যায়, কয়েক বছর আগেও রেংমিটচ্যা ভাষা জানা মানুষের সংখ্যা ছিল ১০ জন। তবে কেবল তিনজনই সাবলীলভাবে ভাষাটি বলতে পারতেন। তারা একই পরিবারের সহোদর। নাম-মাংপুং ম্রো (৭৪), রেংপুং ম্রো (৭০) ও মাংওয়াই ম্রো (৬৬)। দীর্ঘদিন লিভারের জটিলতার পর চলতি বছরের ৫ মে মাংওয়াই ম্রো মারা যান। এখন সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন মাত্র দুজন। তবে ভাষাটি আংশিকভাবে জানেন কুনরাও ম্রো (৬১), কেনি ম্রো (৭৪) ও থোয়াই লক ম্রো (৬০)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আরও ৩ থেকে ৪ জন প্রবীণ ব্যক্তি হয়তো এ ভাষা কিছুটা জানতে পারেন। তাদের কেউ একই পরিবারে বসবাস করেন না। তারা বিভিন্ন ম্রো অধ্যুষিত গ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করেন। ফলে দৈনন্দিন জীবনে রেংমিটচ্যার পরিবর্তে ম্রো ভাষা ব্যবহার করেন। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষাটি আর পৌঁছাচ্ছে না। আলীকদমের দুর্গম ক্রাংসিপাড়ায় ‘মাংপুং ম্রো’ এবং ‘রেংপুং ম্রো’র সঙ্গে সম্প্রতি যুগান্তরের এই প্রতিনিধির কথা হয়। তারা বাংলা বলতে পারেন না। আংশিক জানা একজন দোভাষীর মাধ্যমে তারা জানান, ‘আমরা এ ভাষাতে কথা বলি। কিন্তু এখন কথা বলার লোক নেই। আমাদের মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ভাষা জানা লোক কমে গেছে। আমরা চাই এ ভাষায় আরও মানুষ কথা বলুক। তাতে আমাদের সুবিধা হবে।’
বিলুপ্তির কারণ : ভাষাটির সংকটের পেছনে ঐতিহাসিক ও সামাজিক কারণ রয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগ এবং পাকিস্তান আমলের শুরুতে গুটিবসন্ত ও কলেরার ভয়াবহ মহামারিতে রেংমিটচ্যা জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যায়। ফলে বনসুপাড়া, কুইকিপাড়া, রানীপাড়াসহ একাধিক রেংমিটচ্যা অধ্যুষিত গ্রাম জনশূন্য হয়ে যায়। আর জনসংখ্যা কমে যাওয়ায় বেঁচে থাকা পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে আশপাশের বড় ম্রো গ্রামে বসবাস শুরু করে। পরবর্তী সময়ে আন্তঃবিবাহ (রেংমিটচ্যার সঙ্গে ম্রো) বৃদ্ধি পায়। ফলে ধীরে ধীরে রেংমিটচ্যা ভাষাভাষীরা ম্রো সমাজের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, আশির দশকে পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ছোট ছোট পাহাড়ি বসতিগুলো পুনরায় উচ্ছেদ হয়। ফলে ভাষাভিত্তিক সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ওই সময়ে পরিবারগুলোয় আর রেংমিটচ্যা ভাষায় কথা বলা হতো না। নতুন প্রজন্ম বড় হতে থাকে ম্রো ভাষার পরিবেশে। ফলে রেংমিটচ্যা ভাষার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ভাষাটির নিজস্ব লিপি না থাকা, বইয়ের অভাব, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত না হওয়া এবং অর্থনৈতিক কারণে অধিক প্রচলিত ভাষার ব্যবহার বেড়েছে, যা ভাষাটির বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করেছে।
ভাষাটির মাঠপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন গবেষক আফসানা ফেরদৌস। তিনি আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনে পিএইচডির অংশ হিসাবে রেংমিটচ্যা ভাষাভাষীদের খুঁজে বের করেন। তাদের ভাষা অডিও-ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করেন এবং দেড় হাজার শব্দের একটি অভিধানধর্মী খসড়া প্রস্তুত করেন। তিন ভাই মাংপুং, রেংপুং ও মাংওয়াই ম্রো’কে একত্রিত করে তাদের কথোপকথন ও উচ্চারণ নথিভুক্ত করেন এই গবেষক। অন্যদিকে গবেষক ইয়াংঙান ম্রো ‘মিটচ্যা তথক’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। যেখানে তিন হাজারেরও বেশি শব্দ ও দৈনন্দিন কথোপকথন সংরক্ষিত হয়েছে। ভাষাটির নিজস্ব লিপি না থাকায় গ্রন্থটি বাংলা ও ম্রো ভাষার সহায়তায় প্রকাশ করা হয়।
যেভাবে চেষ্টা চলছে : নতুন প্রজন্মকে ভাষাটি শেখাতে আলীকদমের দুর্গম ক্রাংসিপাড়ায় প্রতিষ্ঠা করা হয় সেনামৈত্রী প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে ৫ থেকে ১২ বছরের ৪০ জন শিক্ষার্থী ভাষাটি শিখছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন ‘সিংরাও ম্রো’। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। সেনাবাহিনী আমাকে মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন দেয়। এছাড়াও স্কুলের খরচ দেয়। মূল সমস্যা হলো, বই নেই। তবে বই রচনার কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, আমিও পুরোপুরি ভাষাটি জানি না। সমস্যা হলে যারা জীবিত আছেন, ওনাদের কাছ থেকে শিখে আসি।

