রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা
দুই আসামির জবানবন্দির পরও কাটছে না ধোঁয়াশা
Advertisement
মাহবুব রহমান, রংপুর
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার দুই তরুণ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপরও এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের রহস্য নিয়ে জনমনে ধোঁয়াশা কাটছে না। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া বা চিনে ফেলায় ওই দুই তরুণ চারজনকে হত্যা করেছে বলে পুলিশ দাবি করলেও ঘটনার পেছনের অসঙ্গতি, বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করার রহস্য এবং ৬০ লাখ টাকার হদিস না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা। পুলিশের তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবিতে সোমবার রংপুরে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন নিহত শিক্ষকের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
চার হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, রোববার রাতে রংপুরের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে কড়া নিরাপত্তায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
যেসব বিষয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা : পুলিশের দাবি, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। শিক্ষক গণপতি তাদের চিনে ফেলায় এবং ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় আসামিরা তাকেসহ পরিবারের চারজনকে একে একে শ্বাসরোধে হত্যা করে। তবে গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তীসহ অপর স্বজন, প্রতিবেশী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মনে পুলিশের এই বিবরণ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন-ছাদের দরজা খোলার শব্দ পেয়ে আসামিরা পালিয়ে না গিয়ে কেন নিরস্ত্র অবস্থায় চারজনকে হত্যা করলেন? এছাড়া ওই বাড়ির বিদ্যুৎসংযোগই বা কীভাবে বিচ্ছিন্ন হলো? পুলিশ বলছে, আসামিরা আলমারি ঘেঁটে স্বর্ণালংকার লুট করেছে। অথচ স্বজনদের দাবি, ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার জন্য ওই শিক্ষকের বাসায় গচ্ছিত ৬০ লাখ টাকার কোনো হদিস মিলছে না।
শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ : হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর জিলা স্কুলের সামনের প্রধান সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা অবরোধের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। নিহত গণপতি চক্রবর্তী এই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তার ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী একই স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুই যুবককে গ্রেফতার করে কীভাবে এত বড় হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করছে পুলিশ? জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থী পুলক রহমান বলে, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড কিনা, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান বলে, চারজন মানুষকে মাত্র দুজন হ্যাংলা-পাতলা ছেলে কীভাবে হত্যা করল, তা অবিশ্বাস্য।
আজ নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে প্রার্থনার পর সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
মামলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর : রোববার বিকালে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানান, আসামি সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করতে আগ্রহ প্রকাশ করায় তাদের আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে মামলাটি বর্তমানে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবির উপকমিশনার (ডিসি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, স্পর্শকাতর এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলীকে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আসামিরা পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্যই আদালতে স্বীকার করেছেন। দ্রুত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার চেষ্টা চলছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
শনিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
