বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা
বিলীন হতে পারে দেশের কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য
ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে পর্যটনকেন্দ্রিক করা হবে -সংস্কৃতিমন্ত্রী * ভূমিকম্প-সহনীয় করতে রেট্রোফিটিংয়ের উদ্যোগ প্রয়োজন -অধ্যাপক আনসারী * রেট্রোফিটিং প্রযুক্তি প্রয়োগে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে -ডিজি, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর
Advertisement
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী পানামনগরীর স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখছেন দর্শনার্থীরা। শনিবার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বড় ধরনের ভূমিকম্পের শঙ্কায় রয়েছে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। রিখটার স্কেলে ৭ বা এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে এসব এলাকায় অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূতাত্ত্বিক বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মাটির দুর্বল গঠনের কারণে ঢাকার অধিকাংশ বহুতল ভবন ধসে পড়ার বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এর সঙ্গে শেষ হয়ে যেতে পারে কয়েক শ বছরের পুরোনো শত শত স্থাপনা বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। একটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো সেই দেশের হেরিটেজ বা ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিশেষ করে পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়তে পুরোনো স্থাপনা সংস্কারের বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেরিটেজ সংস্কারের উদ্যোগ বাংলাদেশে অতীতেও হয়েছে। দেশে বর্তমানে এসব নিয়ে গবেষণাও চলমান। তবে দ্রুত প্রয়োগ না হলে ভূমিকম্পে মাটিচাপা পড়তে পারে কয়েক শ বছরের প্রত্ন-ঐতিহ্য।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাবিনা আলম বলেন, ‘দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজ করলেও বড় ধরনের ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো বিশেষ কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ এখনো আমাদের দেশে রপ্ত হয়নি। আধুনিক উচ্চপ্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাচীন ও ভঙ্গুর ইটের বা চুন-সুরকির গাঁথুনির দেওয়ালগুলো ভূমিকম্প-সহনীয় করার মতো আধুনিক রেট্রোফিটিং (কোনো বিদ্যমান কাঠামো, মেশিন বা ভবনে নতুন প্রযুক্তি, উপকরণ বা সরঞ্জাম যুক্ত করার প্রক্রিয়া) প্রযুক্তি এসব প্রত্নস্থলে নিয়মিত প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কারিগরি সহয়তা ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে।’ সাবিনা আলমের ভাষ্য, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে মেমোরেন্ডাম আন্ডারস্ট্যান্ডিং করে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মাটির নিচের কম্পন সহনশীলতা পরীক্ষা করার কাজ করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।’
এদিকে অতীতের ভূমিকম্পেও দেশের বেশকিছু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আংশিকভাবে ধসে পড়ার নজির রয়েছে বলে জানান বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী। তিনি বলেন, ‘সব স্থাপনার বর্তমান কাঠামোগত সক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়নের পাশাপাশি ভূমিকম্প-সহনীয় করতে রেট্রোফিটিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘ভূমিকম্পের সময় বড় ধরনের কম্পনের পাশাপাশি ছোট কম্পনেও স্থাপনাগুলোর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট কম্পনে স্থাপনাগুলোর প্রতিক্রিয়া পরিমাপ ও বিশ্লেষণ করা গেলে বড় ভূমিকম্পে এগুলোর সম্ভাব্য আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।’ ঐতিহাসিকভাবে দেশের বিভিন্ন স্থাপনা ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক আনসারী বলেন, ‘১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে আহসান মঞ্জিলের একটি অংশ আংশিকভাবে ধসে পড়েছিল। একই ভূমিকম্পে সোনা মসজিদ, কাঁঠাল মন্দির ও আর্মেনিয়ান চার্চও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক রেকর্ড ও পুরোনো ছবিতে দেখা যায়।’ তার ভাষ্যমতে, ‘এসব স্থাপনা পরে সংস্কার করা হয়েছে। অতীতের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয়, বড় ধরনের ভূমিকম্পে দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিমুক্ত নয়।’ এ অবস্থায় ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে শুধু সংস্কার না করে আগে বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এজন্য আধুনিক ‘রেট্রোফিটিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেন এই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমাদের কালচারাল হেরিটেজ নিয়ে আগ্রহ কম। বিদেশে এসব ঐতিহ্য দিয়েই বিশাল ব্যবসা করে। এগুলো সংরক্ষণ করে আকর্ষণীয় করা গেলে এখানে আয়ের একটা ব্যাপার আছে। বিদেশিরাও আসে।’
স্থাপনা উন্নয়নে আশ্বাস সংস্কৃতিমন্ত্রীর : ২৪ আগস্ট সাংস্কৃতিক পর্যটন বা কালচারাল ট্যুরিজমের উন্নয়নে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত হয়। ওইদিন দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সভা শেষে জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘পর্যটন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিল্প, যার সঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে দেশের জিডিপি পর্যটন খাতের অবদান ২ থেকে ৩ শতাংশ। এই অবদান ৭ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।’ সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হবে। দেশের সাংস্কৃতিক পর্যটন এগিয়ে নিতে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে।’ সংস্কৃতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দেশের ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চায় সরকার। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে পর্যটনকেন্দ্রিক করে উন্নয়ন করা হবে। দেশে ৫৫৪টি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে টাস্কফোর্স পরিদর্শন করবে। এরপর উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

