এ যেন শেকড়ে ফেরা
পুথির সুরে মাতল গ্রাম
Advertisement
পবিত্র তালুকদার, চাটমোহর (পাবনা)
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হারিকেন আর কুপির আলোয় পুঁথি পাঠ করছেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক, সামনে মন্ত্রমুগ্ধ শ্রোতা। বৃহস্পতিবার রাতে পাবনার চাটমোহরের সোনাহারপায়া গ্রামে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সময়টা ছিল আশির দশক। চলনবিল এলাকার গ্রামগুলোতে তখনো পৌঁছেনি বৈদ্যুতিক আলো। গ্রামে গ্রামে সন্ধ্যা হলেই কুপি (কেরোসিনের বাতি) জ্বালিয়ে বসত পুথিপাঠের আসর। এলাকার শত শত নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর গ্রামের একেক দিন একেক বাড়িতে মিলিত হতো। উঠোনের এককোণে জলচৌকিতে বসতেন একজন পাঠক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো পুথিপাঠ শুনতেন সবাই। কয়েক দশক আগেও এই পুথিপাঠের আসর বসত পাবনার চাটমোহর উপজেলার অধিকাংশ গ্রামে। বাঙালির শত বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্য যখন নিভু নিভু, তখনই পুথিপাঠ আবার ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন এক চিকিৎসক।
বৃহস্পতিবার রাতে দেখা মিলল হারিয়ে যাওয়া সেই দৃশ্য। গ্রামীণ পরিবেশে পুথিপাঠের আসরে জড়ো হয় শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধরাও। উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারপাড়া (সগুনাপাড়া) গ্রামের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন পুথিপাঠ। কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির আঙিনা ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। আকাশে ছিল শরতের পূর্ণিমার চাঁদ। উঠোনে শত শত মানুষ মাদুর পেতে বসে আছেন। সামনে জলচৌকিতে বসলেন একজন পাঠক। হারিকেন আর কুপির আলোয় এক মায়াময় পরিবেশ। চারপাশে সুনসান নীরবতা। আলো-আঁধারির মাঝে সুর উঠল পুথির। পাঠ করছিলেন নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল। পুথির সুর চলে রাত ৯টা থেকে সোয়া ১০টা পর্যন্ত।
বিপ্লব আচার্যের সঞ্চালনায় আসরের শুরুতে মুখবন্ধ পাঠ করেন আয়োজক ডা. আতিকুর রহমান আতিক। এরপর শুরু হয় পুথিপাঠ। আসরে বিবি সোনাভানের কাহিনি পাঠ করেন নব্বই দশকের নাট্যজন ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল। গাজী কালু ও চম্পাবতী পাঠ করেন লইমুদ্দিন প্রামাণিক। শেষে তাদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন আয়োজকরা। পুথিপাঠের গায়েন মায়াবী সুরের জাদুতে মাতিয়ে তোলেন দর্শক-শ্রোতাদের। জ্যোৎস্না রাতে মুগ্ধতায় ভাসেন উপস্থিত সবাই। ছোটবেলায় দাদা-দাদির মুখে গল্প শোনা পুথিপাঠের আসর স্বচক্ষে দেখে আবেগাপ্লুত হন দর্শক-শ্রোতা। এ যেন শেকড়ে ফিরে যাওয়া।
৭৫ বছর বয়সি কৃষক হাসান প্রামাণিক বলেন, ৪০ বছর আগে শুনেছিলাম এই পুথিপাঠ। কাজের অবসরে রোজ সন্ধ্যায় আসরে বসতাম। এত বছর পর আয়োজনটা দেখে অনেক ভালো লাগল। পুথিপাঠ দেখতে ছেলেকে নিয়ে এসেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, ছোটবেলায় যখন আমি স্কুলে পড়তাম, তখন নানাবাড়িতে বৈঠকখানায় বসত পুথিপাঠের আসর। আবারও যেন ফিরে পেলাম শৈশব।
ফয়সাল মাহমুদ নামের এক তরুণ বলেন, আগে কখনো দেখিনি। তাই আব্বুর সঙ্গে পুথিপাঠ দেখতে এসেছি। খুবই সুন্দর লাগল। এই উদ্যোগ ধরে রাখতে কার্যকর পদক্ষেপে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত বলে জানালেন চাটমোহর প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত সভাপতি রকিবুর রহমান টুকুন।
পুথিপাঠ করতে পেরে আবেগাপ্লুত নাট্যজন আসাদুজ্জামান দুলাল বলেন, মানুষের মধ্যে একাত্মতাবোধ তৈরিতে পুথিপাঠের আসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আয়োজক ডা. আতিক বলেন, আমাদের যেসব ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ইতিহাস আছে, সেগুলোর অন্যতম হলো পুথিপাঠ। আমরা ফিরে যেতে চেয়েছি সেই সময়টায়। হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের মাঝে তুলে ধরতে এ আয়োজন।
পুথিপাঠের আসরের আয়োজনের খবর জানতে পেরে ঢাকা থেকে ছুটে আসেন পাঁচবার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শব্দ প্রকৌশলী রিপন নাথ। এখন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে নতুন করে গল্প তৈরি করতে হবে। যাতে মানুষের শোনার আগ্রহ বাড়ে।
