২১ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে চলছে প্রতিবন্ধী জমেলার ‘কুরআনের পাঠশালা’
Advertisement
পবিত্র তালুকদার, চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএম
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন জমেলা খাতুন (৪২)। রাত পার হতেই হাত-পা বাঁকা হয়ে যায় তার। দিনমজুর বাবা অভাবের কারণে চিকিৎসা করাতে পারেননি। একটা সময় শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন জমেলা। দুহাতের ওপর ভার দিয়ে এখন চলাফেরা করতে হয় ৪২ বছর এই নারীকে।
ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল জমেলার। স্থানীয় এক হাফেজের কাছে পবিত্র কুরআন শরিফ পড়া শুরু করেন। পুরো কুরআন আয়ত্বে আনার পর প্রায় ২১ বছর ধরে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছেন জমেলা।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের ডেফলচড়া গ্রামের মৃত জমশের আলীর বড় মেয়ে জমেলার বাড়ির উঠানে প্রতিদিন ‘কুরআন শিক্ষার পাঠশালায়’ আসেন বয়োবৃদ্ধ নারী থেকে শুরু করে শিশু-কিশোররা। কুরআন শরিফের বিভিন্ন সুরা ও আয়াতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক।
শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও যেভাবে দিনের পর দিন কুরআন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন জমেলা- তা দেখে স্থানীয়রা মুগ্ধ। তবে স্থান সংকুলান না হওয়ায় এবং ঘর না থাকায় কুরআন শিখতে আসা সবাইকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, জরাজীর্ণ টিনের ঘরের চৌকাঠের ওপর বসে আছেন জমেলা খাতুন। আর বাড়ির উঠানে বসে কুরআন পড়া শিখছে বেশকিছু শিশু-কিশোর ও কিশোরী। জমেলার পড়ানো দেখতে এসেছেন বেশ কিছু অভিভাবক।
জমেলার পাশে বসে আছেন মা জয়গুন খাতুন। তিনি বলেন, সারাদিনে কয়েক ধাপে বয়োবৃদ্ধ নারী থেকে শুরু করে অনেকেই এই পাঠশালার ছাত্রী হয়ে ওঠেন। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজারের অধিক নারী ও শিশু-কিশোরের হাতে পবিত্র কুরআন তুলে দিয়েছেন জমেলা। পরিবারে অভাব থাকা সত্ত্বেও কারো কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক নেন না জমেলা।
শুধু তাই নয়, কেউ জোর করে টাকা দিলে সেই টাকা দিয়ে দরিদ্রদের কুরআন শরিফ কিনে দেন। শত কষ্টের মাঝেও ধর্মীয় কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে পেরে সন্তুষ্ট এই প্রতিবন্ধী নারী। তবে ২১ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে ধর্মের বাণী প্রচার করে যাওয়া জমেলার জন্য একটি নতুন ঘর হলে পাঠদানে সুবিধার পাশাপাশি সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশে জীবনযাপন করতে পারতেন তিনি-এমনটাই জানান স্থানীয়রা।
জমেলার কাছে কুরআন শিক্ষাগ্রহণ করা ষাটোর্ধ্ব নারী সাবেলা খাতুন বলেন, ছোটবেলায় কুরআন শরিফ পড়া শিখেছিলাম। কিন্তু পরে ভুলে গেছি। জমেলার কাছে শিখে এখন কুরআন শরিফ পড়তে পারি। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও মেয়েটা যেভাবে শেখায়, তাতে মুগ্ধ হয়েছি। এর জন্য জামেলা কোনো টাকা-পয়সাও নেয়নি।
রাজিয়া খাতুন নামে আরেক নারী বলেন, মেয়েটার পরিবার খুব অভাবী। এখন পর্যন্ত অনেককে কুরআন পড়া শিখিয়েছে। শত অভাবের মাঝেও টাকা-পয়সার কোনো চাহিদা নেই তার। টাকা দিতে চাইলেও নেয় না। জোর করে দিলেও উলটো সেই টাকা দিয়ে কুরআন শরিফ কিনে বিতরণ করে। তার (জমেলা) জন্য একটা নতুন ঘর ও শিক্ষার্থীদের বসে পড়ার জন্য একটা ঘর হলে খুবই উপকৃত হতো বলে জানান তিনি।
জামেলা খাতুন বলেন, সবাই আল্লাহর পথে চলুক। এই দুনিয়াতে মানুষ চিরদিন থাকবে না। মহান আল্লাহ তায়ালার অতি পছন্দ ও তাকে সন্তুষ্টি করতে পবিত্র কুরআন পাঠের কোনো বিকল্প নেই। পরকালের সুখের আশায় শত কষ্টের মাঝেও কুরআন শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। তবে, আমার ভাঙাচোরা ঘরে ঝড়-বৃষ্টির দিনে পানি পড়ে। আর বাড়ির উঠানে বসে রোদের মধ্যে পড়াতে গিয়ে কষ্ট হয়। আমাকে একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিলে খুব উপকার হতো।
