বোয়িংয়ের পর এয়ারবাস
ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় সমান সুযোগ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিমানের উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপের এয়ারবাসকেও সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর এয়ারবাসের প্রস্তাবকে ‘খুব গুরুত্ব সহকারে’ বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় জোট। সরকারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো দেশের কোম্পানিকে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে বাণিজ্যিক যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদও দিয়েছেন তারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে রোববার ইইউভুক্ত ২৭ দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে এ অবস্থান তুলে ধরেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার।
বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মাইকেল মিলার বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে, এয়ারবাসের একটি অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার রয়েছে। এটিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত।’ এয়ারবাস ও বিমানের মধ্যে আলোচনা দ্রুত শেষ করার প্রত্যাশাও জানান তিনি।
এ সময় ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা সব ক্ষেত্রে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির অনুরোধ করছি। সরকারি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে নেওয়া হয় এবং আমাদের কোম্পানিগুলো যেন যে কোনো দেশের কোম্পানির সঙ্গে সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারে।’
বোয়িং-এয়ারবাসের প্রতিযোগিতা নিয়ে ইইউর এ বক্তব্য এসেছে এমন সময়ে, যখন ৩০ এপ্রিল বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ করার কথা।
বিমানবহর আধুনিকায়নে এর আগে এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সমীকরণে শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়।
চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গোর এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে বোয়িং কেনার সিদ্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ জানান।
এ অবস্থায় এয়ারবাসকে নিয়েও বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইউরোপ। ইইউর বক্তব্যে এখন স্পষ্ট হয়েছে, তারা বোয়িংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এয়ারবাসকে পিছিয়ে রাখতে চায় না।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এর আগে জানিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য-মূল্য, মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সুবিধা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
৬১ বাণিজ্য বাধার ৪৮টির সমাধান : ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে অশুল্ক বাধা দূর করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। ইইউর চিহ্নিত ৬১টি অশুল্ক বাণিজ্য বাধার মধ্যে ৪৮টির সমাধান করা হয়েছে। বাকি ১৩টি বিষয়ও সমাধানের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, মার্চে ইইউ রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার বিষয় তুলে ধরে। এরপর এনবিআর, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, নৌপরিবহণসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সমাধান হওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন লজিস্টিক কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নের জটিলতা দূর করা। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক স্যাম্পল আমদানির বার্ষিক সীমা ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার মার্কিন ডলার করা হয়েছে। রপ্তানি পণ্যের ট্রেসিবিলিটি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত স্ক্যানিং স্মার্ট কার্ডের শুল্কায়ন জটিলতাও দূর করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ফলে এ বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা ও বাড়ানোর জন্য অশুল্ক বাধা দূর করার পাশাপাশি পণ্য বহুমুখীকরণেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
এফটিএ নিয়ে চলতি সপ্তাহেই আলোচনা : বাংলাদেশ ও ইইউর মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি নিয়েও বৈঠকে অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছে।
মাইকেল মিলার বলেন, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষ হলে চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে যৌথ কারিগরি আলোচনা শুরু হতে পারে।
এফটিএ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বর্তমান বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে ইউরোপের বাজারে শুল্ক সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন নিয়েও ইইউর সমর্থন চেয়েছে ঢাকা। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ও ইকোসকের দুটি ধাপ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বিষয়টি উঠলে ইইউর সমর্থন প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বা সরকারি ক্রয় নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও জনগণের প্রয়োজন বিবেচনা করেই আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ।
জ্বালানি ও খাদ্যশস্য আমদানির ক্ষেত্রে মূল্য, মান ও অপচয়ের হার বিশ্লেষণ করেই সরকারি ক্রয় কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়।
