ডেঙ্গুর মৌসুমে চাহিদা বাড়ছে, সরবরাহে টান
রোগীর পথ্য এখন বিলাসপণ্য
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডেঙ্গু রোগীর শিয়রে এক বাটি মাল্টা বা কমলা। দিনকতক আগেও এটা ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এখন সেই পথ্যই অনেক পরিবারের কাছে বিলাসিতা। রাজধানীর বাজারে মাল্টা প্রতি কেজি ৫২০ টাকা। আর কমলার দাম উঠেছে ৬০০ টাকা কেজিতে। আপেল, আঙুর, নাশপাতিসহ আমদানিনির্ভর অন্য ফলও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফলে রোগীর পথ্য কিংবা পরিবারের পুষ্টির অংশ হিসাবে যে ফল একসময় নিয়মিত কেনা হতো, তা এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়া, উচ্চ শুল্ক-কর, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন, পরিবহণ ও বন্দর ব্যয় এবং সরবরাহ ঘাটতিই বিদেশি ফলের দাম বাড়ার বড় কারণ। একই সঙ্গে আমদানি ও খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে ফলের সরবরাহ বাড়াতে দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য আমদানিকারকদের তাগিদ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার সচিবালয়ে ফল ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি মাল্টার দাম ৫২০ টাকা হওয়ার কারণ জানতে চান। অস্বাভাবিক দামে বিক্রির প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকেও নির্দেশ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। মন্ত্রী মাল্টার শুল্ক কাঠামো পর্যালোচনারও আশ্বাস দেন।
জানা যায়, মাত্র পাঁচ সপ্তাহ আগে আগস্টের শেষের দিকে ঢাকার বাজারে মাল্টা ২৮০ টাকা ও কমলা ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল। অর্থাৎ এই সময়ে মাল্টার দাম বেড়েছে ২৪০ টাকা বা প্রায় ৮৬ শতাংশ, আর কমলার দাম বেড়েছে ২৫০ টাকা বা প্রায় ৭১ শতাংশ। একই বৈঠকে খেজুরের আমদানি শুল্ক-কর নিয়ে চলতি সপ্তাহেই সরকারের সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের আন্তর্জাতিক উৎসমূল্য যাচাই করে যৌক্তিক নির্দেশক অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু নির্ধারণে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করবে। পরে সেই প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো হবে। সরকারের লক্ষ্য-ব্যবসায়ীরা যেন অযৌক্তিক শুল্কায়নের শিকার না হন, আবার পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগও যেন না থাকে।
আমদানিকৃত ফলের পাশাপাশি দেশি ফলের বাজারও চড়া। ঢাকার বাজারে দেশি ড্রাগন প্রতি কেজি ২৫০-৩০০ টাকা, পেঁয়ারা ১০০-১২০, সাগরকলা ডজন ১৬০-১৭০, জাম্বুরা প্রতি পিস মানভেদে ৮০-১২০ এবং আমড়া প্রতি কেজি মানভেদে ৭০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সরবরাহ সংকটের মধ্যে বাড়ছে চাহিদা : ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাল্টা এসেছে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার প্রয়োজন। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য ফলের বাড়তি চাহিদা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে আগস্ট থেকে হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগী বাড়তে থাকে। ফলে হাসপাতালকেন্দ্রিক বাজারে মাল্টা ও কমলার চাহিদা বাড়ার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় সামান্য বাড়তি চাহিদাও বাজারে বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমদানি করা ফলকে অনেক ক্ষেত্রে বিলাসপণ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ফলে আমদানিকারকদের ওপর উচ্চ কর-শুল্কের চাপ পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তার ওপর যায়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ফলের ওপর সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
