Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

যে শহরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন কবি

কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে গেছে নজরুলের ভেনিস

Advertisement

আকতার ফারুক শাহিন

আকতার ফারুক শাহিন

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কংক্রিটের জঙ্গলে হারিয়ে গেছে নজরুলের ভেনিস

ব্রিটিশ আমলে বরিশালে এসে এই ক্যাথলিক চার্চ দেখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম -যুগান্তর

Advertisement

জীবদ্দশায় ৩ থেকে ৪ বার বরিশালে এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। শহরের ভেতরে তখন বইতো ২৪টি জোয়ার-ভাটার খাল। ছিল অসংখ্য ঝাউ আর পাম গাছের সারি। নানা রঙের ফুলে-ফলে সাজা গাছ গাছালির সঙ্গে কীর্তনখোলা তীরের লাল সুরকির রাস্তার সৌর্ন্দয্যে বিমোহিত হন নজরুল। মুগ্ধ আবেশ নিয়ে লেখেন, ‘বরিশাল। বাংলার ভেনিস। আঁকা-বাঁকা লাল রাস্তা। শহরটি জড়িয়ে আছে ভুজ বন্ধের মতো করে। রাস্তার দু’ধারে ঝাউগাছের সারি। তারই পাশে নদী। টলমল টলমল করছে বোম্বাই শাড়ি পরা ভরা যৌবন বধূর পথ চলার মতো করে। যত না চলে অঙ্গ দোলে তার চেয়ে অনেক বেশি।’ জাতীয় কবিকে মুগ্ধ করা সেই শহর অবশ্য বহু আগেই হারিয়ে গেছে আধুনিক সভ্যতা নামের ইট-পাথর আর কংক্রিটের জঞ্জালে। উন্নয়নের নামে খুন করা খালগুলো এখন ময়লা-আবর্জনায় আটকে থাকা ড্রেন। তারপও কবি’র ছুয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি আর সদর হাসপাতাল এলাকায় টিকে থাকা পাম গাছের বর্তমান প্রজন্ম সাক্ষ্য দেয় এই শহরে তার পথচলার। সেই নজরুল, যার বিদ্রোহ আজও ছুয়ে যায় এদেশের দামাল তারুণ্যকে। যে তারুণ্য ‘চির উন্নত মম শির’ হয়ে বুক পাতে বুলেটের সামনে। রাজপথে রক্ত ঝরিয়ে ছিনিয়ে আনে গণতন্ত্রের বিজয়।

নজরুলের সাংবাদিকতা জীবন শুরু হয় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের পত্রিকা ‘নবযুগ’র যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে। বাকলা চন্দ্রদ্বীপের কৃতী সন্তান এই শেরেবাংলা’র সঙ্গেই ১৯২০ সালে প্রথম বরিশালে আসেন জাতীয় কবি। নজরুল গবেষক আনিসুর রহমান স্বপন বলেন, ‘বিভিন্ন ইতিহাস সূত্রে যতটুকু জানা গেছে তাতে বরিশালে কম করে হলেও ৪/৫ বার এসেছেন নজরুল। তবে প্রমাণ মেলে দু’বারের। ১৯২০ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নির্বাচনি প্রচারণায় আসেন তিনি। সে সময় বিভিন্ন সভায় পরিবেশন করেন দেশাত্মবোধক গান। তখনকার সময়ে বরিশাল আর ফরিদপুর মিলিয়ে ছিল নির্বাচনি এলাকা। বরিশালের পাশাপাশি ফরিদপুরেও যান নজরুল। পরবর্তিতে ১৯৩০ সালেও একবার নোয়াখালী হয়ে বরিশালে এসেছিলেন বিদ্রোহী কবি। প্রতিবারেই বরিশালের সৌন্দর্যে মুক্ত হন তিনি। তার সেই মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটে কবি রচিত বিখ্যাত উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’য়। অমর কবি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকায় নানা খণ্ডে এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৩৪ সালের অগ্রহায়ণ থেকে ১৩৩৬’র ফাল্গুন পর্যন্ত। পরবর্তিতে ১৯৩০ সালে সেটি প্রকাশিত হয় সংকলিত বই আকারে।’

যতবার এসেছেন ঠিক ততবারই যেন বরিশালের প্রেমে পড়েছিলেন আমাদের এই জাতীয় কবি। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ২৪ খালের আঁকাবাঁকা রূপ, বহতা পানির স্রোত বিমুগ্ধ করে তাকে। তখনকার সময়ে এসব খাল ব্যবহৃত হতো অভ্যন্তরীণ আর দূরপথের যোগাযোগে। খালে চলতো পণ্য আর যাত্রীবাহী ছোট-বড় নৌকা। তাল আর লয়ে পানির বুকে উঠতো নামতো দাঁড়-বৈইঠা। মাঝি-মাল্লার ভাটিয়ালি সুর ঢেউ তুলতো সকাল সন্ধ্যার এলোমেলো বাতাসে। খালগুলোর এই সৌন্দর্য্য দেখেই বরিশালকে প্রাচ্যের ভেনিস বলে নাম দেন কবি। মুগ্ধ হয়ে লেখেন, ‘নদীর ওপারে ধানখেত। তারও ওপারে নারিকেল-সুপারি কুঞ্জঘেরা সবুজ গ্রাম, শান্ত নিশ্চুপ। সবুজ শাড়ি পরা বাসরঘরের ভয় পাওয়া ছোট্ট কনে বৌটির মতো। এক আকাশ হতে আর আকাশে কার অনুনয় সঞ্চারণ করে ফিরছে? বৌ কথা কও, বৌ কথা কও। আঁধারে চাঁদর মুড়ি দিয়ে তখনো রাত্রী অভিসারে বেরোয়নি। তখনো বুঝি তার সন্ধ্যা প্রসাধন শেষ হয়নি। শঙ্কায় হাতের আলতার শিশি সাঁঝের আকাশে গড়িয়ে পড়েছে। পায়ের চেয়ে আকাশটাই রেঙে উঠেছে বেশি। মেঘের কালো খোপায় ভূতীয়া চাঁদরে গো’ড়ে মালাটা জড়ায়ে গিয়ে বেঁকে গেছে। উঠোনময় তারার ফুল ছড়ানো...।’

নজরুল গবেষক আনিসুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন লেখায় কবির তখনকার যে বর্ণনা তাতে বরিশালের ঝাউয়ের সারি সারি বাধা পামগাছ, লাল সুরকির সড়ক, ছোট-বড় খাল আর খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের কয়েকটি গীর্জার বর্ণনা পাওয়া যায়। যার প্রায় সবকিছুই হারিয়ে গেছে এই শহরের বুক থেকে। নৌ-পথে বরিশালে এসে তিনি নামেন কীর্তনখোলার তীরে। সেখান থেকে শহরে ঢোকার মুখেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের দুটি গীর্জা। তখন তো আর এতো এতো দোকান পাট দালান-কোঠা ছিল না। এই গীর্জা দুটির কথাই বলেছেন তিনি। যে দুটি এখানো দাঁড়িয়ে আছে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীদের উপাসনালয় হয়ে। তবে এসব গীর্জার অভ্যন্তরীণ ইতিহাসে কবির এখানে আসার কোনো বর্ণনা আছে কিনা তা অবশ্য জানা সম্ভব হয়নি। গীর্জাগুলোর কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে কোনো গবেষককে কখনো সহায়তা করেছেন তেমন নজির নেই। নদীর তীরে লাল সুরকি বিছানো সড়ক আর দু’ধারে ঝাউ-পাম গাছের সারি বলতে কবি বুঝিয়েছিলেন আজকের বান্দ রোডকে। তখন দু’পাশে ভবন আর দালান-কোঠা না থাকায় নদী থেকেই চোখ জুড়াতো এই পথের সৌন্দর্য্য। এসবের তো এখন আর কিছুই নেই আজকের মহানগরীতে। বহু বছর আগেই বিলীন হয়েছে ঝাউ-পামের সারি। লাল সুরকি দখল করেছে পিচ ঢালাই রাজপথ। যে ২৪টি বহতা খাল ছিল সেগুলোও হারিয়েছে অস্তিত্ব। দখল আর দূষণ সয়ে কোনোমতে টিকে আছে একমাত্র জেল খাল। বাকি খালগুলো ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে ড্রেন। সেই ড্রেনেও আটকে থাকে ময়লা-আবর্জনা। মুগ্ধতার চোখে যে শহরের কথা বলতে গিয়ে বিমোহিত হয়েছিলেন কবি, তার সবটাই হারিয়ে গেছে ইট-পাথর কংক্রিটের জঙ্গলে। তাছাড়া নজরুলের তখনকার সেই সুন্দর শহরের ইতিহাস টেকাতে কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কখনো। নগরের প্রাণকেন্দ্র আগরপুর সড়কে ছিল শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের একটি বাড়ি। বিক্রির হাত বদলে সেই বাড়ির মালিকানা যে কতবার বদলেছে তারও কোনো হদিস নেই। সবমিলিয়ে বিদ্রোহী কবির বরিশাল পর্বের কোনো স্মৃতিই ধরে রাখেনি অভাগা বরিশাল।’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ শিক্ষকতা পেশা মর্যাদা সংকটে

শিক্ষকতা পেশা মর্যাদা সংকটে

দুর্গোৎসব ঘিরে সতর্ক বিএনপি

দুর্গোৎসব ঘিরে সতর্ক বিএনপি

গলাচিপায় ম্যানগ্রোভ প্রকল্প এক্সকেভেটর দিয়ে ধ্বংস চারশ গাছ

এক্সকেভেটর দিয়ে ধ্বংস চারশ গাছ

আপন ভাইদের নৃশংসতা চাপাতি দিয়ে ২ হাত বিচ্ছিন্ন মামলা না তোলায় খাবার বন্ধ

চাপাতি দিয়ে ২ হাত বিচ্ছিন্ন মামলা না তোলায় খাবার বন্ধ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম