এবার অডিটে ধরা পড়ল অনিয়ম
‘ভুয়া পিএইচডি’ নিয়ে নিয়োগ মালা খানের
বেতন-ভাতায়ই সরকারের কোটি টাকা গচ্চা * ২১ দিনের মধ্যে আপত্তির জবাব দিতে অধিদপ্তরের চিঠি
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টসের (বিআরআইসিএম) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মালা খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ‘ভুয়া পিএইচডি’ ও ‘অপর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা’ নিয়েই। আট বছর আদালতে তার নিয়োগের বৈধতা নিয়ে মামলা ঝুললেও এবার খোদ অডিট অধিদপ্তর এ বিষয়ে ঘোর আপত্তি তুলেছে। অডিটের তথ্য অনুযায়ী, যোগ্যতা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়ায় শুধু বেতন-ভাতা বাবদই সরকারের ১ কোটি ৫ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন খাতে আরও প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকাসহ ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হয়েছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য এবং প্রযুক্তি অডিট অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কমপ্লায়েন্স অডিটে এ আপত্তি উত্থাপন করা হয়। এ বছর ২৮ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত বিআরআইসিএমের কার্যক্রমের ওপর করা অডিটে মোট ১৩টি আপত্তি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম (এসএফআই) এবং ৭টি সাধারণ আর্থিক অনিয়ম (নন-এসএফআই)।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগের শর্ত ছিল বিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রির পাশাপাশি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৪ বছরের গবেষণা অভিজ্ঞতা ও বিশেষ অবদান। ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাছাই কমিটির সভায় মালা খানের প্রয়োজনীয় গবেষণা অভিজ্ঞতা ও অবদানের প্রমাণ না থাকায় তার আবেদন বাতিলের সুপারিশ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, যে প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি পিএইচডি করেছেন, সেটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত নয়। এরপরও তার আবেদন পুনর্বহাল করা হলে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট বিসিএসআইআরের ডিপিসি-১ তাকে তৎকালীন ডিআরআইসিএমের (বর্তমান বিআরআইসিএম) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে সুপারিশ করে। তবে বিসিএসআইআর বোর্ডের ২৮৬তম সভায় এই সুপারিশ নাকচ করে দেওয়া হয়।
বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে রিট করেন মালা খান এবং পক্ষে রায় পান। পরবর্তীতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে সরকার। ২০১৭ সালের ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেন। কিন্তু আট বছর পার হলেও আপিল বিভাগে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তি না হলেও মালা খান ২০১৭ সাল থেকে আজও (প্রায় ৯ বছর) অবৈধভাবে চাকরি করে যাচ্ছেন। নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি মালা খানের নিয়োগে অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পেলে ২০২৫ সালের ২৫ মে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। কিন্তু তিনি খুব চতুরতার সঙ্গে ২০১৭ সালের অমীমাংসিত মামলাকে সামনে রেখে সাময়িক বরখাস্তের বিপরীতে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন।
বিআরআইসিএম সূত্র জানায়, ২০২২ সালে একটি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে মালা খানকে দ্বিতীয়বার বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু রিট পিটিশনের মাধ্যমে সেই আদেশের ওপরও স্থগিতাদেশ বাগিয়ে নেন তিনি।
বিআরআইসিএমে ৪ কোটি ৬১ লাখ টাকার অনিয়ম : অডিট প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু নিয়োগই নয়, প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক লুটপাট ও বিধি লঙ্ঘনের চিত্র পাওয়া গেছে। যার মধ্যে রয়েছে-পারসোনাল লেজার (পিএল) খাত থেকে ব্যয় না দেখিয়েই ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা উত্তোলন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ফেলোশিপ ভাতা দিয়ে ৬২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা অনিয়মিত ব্যয়। বিল থেকে বিধি অনুযায়ী আয়কর ও ভ্যাট কর্তন না করায় প্রায় ২১ লাখ টাকার ক্ষতি। বাজেট বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে বিল পরিশোধের মাধ্যমে ২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে বিভিন্ন খাতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মিত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার ৫৩১ টাকা। এসব আপত্তির জবাব চেয়ে গত ১০ আগস্ট বিআরআইসিএমকে চিঠি দিয়েছে অডিট অধিদপ্তর।
এদিকে, মালা খানের অভিযোগের বিষয়ে গত ২১ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও বিআরআইসিএমকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠি দেয়। কিন্তু আজও বিআরআইসিএম এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
এসব বিষয়ে বিআরআইসিএম-এর মহাপরিচালক মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘অডিট আপত্তিগুলো মূলত অডিট দপ্তরের। যেসব বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়েছে, সেগুলোর তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে জবাব দেওয়ার পর অডিট দপ্তর আবার যাচাই-বাছাই করে। এরপর পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাছাড়া ওই সময় আমি প্রশিক্ষণে থাকায় অন্য একজন দায়িত্বে ছিলেন। ফলে এখনই বলতে পারছি না।
মালা খানের মামলার বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘এটি আদালতের বিষয়। আদালতে চলমান বিষয়ে এ মুহূর্তে বলার কিছু নেই।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাব দেওয়া হয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখনো দেওয়া হয়নি। জবাব তৈরির কাজ চলছে।’
মালা খানের বক্তব্য জানতে চাইলে তার অফিসে গিয়ে কথা বলতে বলেন। কিন্তু বিআরআইসিএমে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে কল করা হলে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়ে জানান তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সত্য নয়। তার স্বপক্ষে তথ্যপ্রমাণ দেবেন বলে প্রতিবেদকের সঙ্গে ২০ সেপ্টেম্বর বসার কথা জানালেও পরে সাড়া দেননি।
এসব বিষয়ে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মহাপরিচালক মো. নূরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনিও সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যুগান্তরে ‘বিআরআইসিএম-এ কেনাকাটা : মালা খানের ২৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে ওই সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে অডিট দপ্তর অনুসন্ধান নামে।

