গ্রেনেড, ট্যাংকি, চিংড়ি, বেজি, গলাকাটা
খুলনায় প্রতিটি নামই যেন একেকটি অপরাধের গল্প
Advertisement
আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কারও নাম গ্রেনেড বাবু। কারও পরিচয় ট্যাংকি শাওন। কেউ চিংড়ি পলাশ, কেউ বা আবার পরিচিত বেজি আলামিন নামে। আবার কারও নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গলাকাটা। মূল নাম হারিয়ে এসব ডাকনামই যেন হয়ে উঠেছে তাদের মূল পরিচয়। মহল্লা থেকে অপরাধের আড্ডা, পুলিশের নথি থেকে মামলার কাগজ সব ক্ষেত্রেই আসল নামের থেকে এসব নামই বেশি উচ্চারিত হয়।
খুলনার অপরাধজগতের কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তির ডাকনাম খেয়াল করলে দেখা যায় নামের মধ্যেই তাদের নৃশংসতার মাত্রা লুকিয়ে আছে। এসব নামের বেশির ভাগই উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ড বা হত্যার ধরন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে।
খুলনা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় বর্তমানে বিভিন্ন অপরাধীচক্রের তৎপরতা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নগর ও আশপাশে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের নামও এসেছে। শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তালিকাভুক্ত ১৮১ সন্ত্রাসী। এর মধ্যে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, ট্যাংকি শাওন গ্রুপসহ কয়েকটি নাম রয়েছে। তবে এসব নামের পেছনের গল্পও অদ্ভুত।
ট্যাংকি শাওন : শেখ সাইদুর রহমান শাওন। তবে খুলনায় এ নামের চেয়ে ‘ট্যাংকি শাওন’ নামেই তিনি বেশি পরিচিত। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে পূজাখোলায় এক যুবককে হত্যার পর লাশ সেপটিক ট্যাংকে ঢুকিয়ে রাখার ঘটনায় শাওনের নাম আলোচনায় আসে। এরপর স্থানীয়ভাবে তার নামের সঙ্গে ‘ট্যাংকি’ শব্দটি যুক্ত হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
গ্রেনেড বাবু : খুলনার সব থেকে আলোচিত নাম রনি চৌধুরী ওরফে বাবু। কিন্তু খুলনার অপরাধজগতের আলোচনায় তার নাম প্রায় অবিচ্ছেদ্যভাবে উচ্চারিত হয় ‘গ্রেনেড বাবু’ হিসাবে। পুলিশের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই রনি চৌধুরীর নামের সঙ্গে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি যুক্ত হয়। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘গ্রেনেড বাবু’ নামটিই তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। তার সঙ্গে যুক্ত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে যে অপরাধী নেটওয়ার্কের কথা বলা হয়, সেটির নাম ‘বি-কোম্পানি’। নামটির মধ্যেও রয়েছে অপরাধজগতের আরেক পরিচিত ছায়া।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, মুম্বাইভিত্তিক অপরাধজগতের আলোচিত দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি-কোম্পানি’ নামের আদলে ‘বি-কোম্পানি’ নামটি নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও গ্রেনেড বাবুকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে তার বাড়িতে যৌথবাহিনীর অভিযান চালানোর খবর প্রকাশিত হয়।
ঘেরের চাঁদা থেকে চিংড়ি পলাশ : পুরো নাম পলাশ তালুকদার। খুলনায় সবাই তাকে চেনেন চিংড়ি পলাশ নামে। র্যাব জানায়, পলাশ তালুকদার খুলনা ও আশপাশের এলাকার চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দিলে ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো হতো। তুলে নিয়ে মারধর করা হতো ব্যবসায়ীদের। স্থানীয়ভাবে চিংড়ি ঘেরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার নাম এতটাই জড়িয়ে পড়ে যে, পলাশ তালুকদারের মূল নামকে ছাপিয়ে যায় ‘চিংড়ি পলাশ’ পরিচয়ে।
শৈশবের ডাকনাম থেকে বেজি আলামিন : দিঘলিয়ার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আলামিনের পরিচিতি বেজি আলামিন নামে। ২৬ সেপ্টেম্বর জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। দিঘলিয়া থানার ওসি সানোয়ার হুসাইন মাসুম জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা, একটি দস্যুতা ও একটি সাধারণ মামলা রয়েছে। বেজি নামের উৎস নিয়ে তিনি বলেন, আলামিন ছোটবেলায় দুষ্টুমি ও ধূর্ততার কারণে বন্ধুদের কাছ থেকে ‘বেজি’ ডাকনাম পেয়েছিল। বেজির মতো চতুর হওয়ায় বন্ধুরা তাকে এই নামে ডাকত।
গলাকাটা রাজু : রাজু মুন্সি। খুলনার অপরাধজগৎ ও মামলার নথিতে তিনি পরিচিত গলাকাটা রাজু নামে। ২০১৭ সালের ১৪ জানুয়ারি নগরীর আমতলা মোড়ের বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক চিত্তরঞ্জনের বাড়িতে ডাকাতির সঙ্গে রাজু জড়িত ছিল। ডাকাতির সময় বাধা দেওয়ায় চিত্তরঞ্জনকে হাত-পা ও মুখ বেঁধে হত্যা করা হয় এবং বাড়ি থেকে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে যায় ডাকাতরা। এ ঘটনায় খুলনা সদর থানায় হত্যা ও ডাকাতির মামলা হয়। এই ঘটনাতেই তার পরিচয়ের সঙ্গে ‘গলাকাটা’ শব্দটি স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
এছাড়া বেশ কিছু সন্ত্রাসী রয়েছেন যারা ভিন্ন নামে পরিচিতি পেয়েছেন। তারা হলেন খুঁড়িয়ে হাঁটে তাই ঠুণ্ডা শামীম, গায়ের রং কালো তাই কালা রাজু, ব্ল্যাকে মালামাল বেচাকেনা করত তাই ব্ল্যাক রাজু, ঢাকার বাসিন্দা তাই ঢাকাইয়্যা শামীম, পালসার গাড়ি চুরি করত তাই পালসার সোহেল, ব্লেড দিয়ে ছিনতাই করত তাই ব্লেড বাবু, কাউয়া মিরাজ।
সন্ত্রাসীদের এমন সব নামের বিষয়ে কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) এম শাকিলুজ্জামান বলেন, সন্ত্রাসীদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ধরনের সঙ্গে বিশেষণ যুক্ত হয়েছে। এরপর মানুষ এসব বিশেষায়িত নাম ধরে ডাকা শুরু করে। পরে মূল নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এসব নাম দ্বারা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হিংস তা প্রকাশ পায়। অনেক সময় নিজেরাও এসব নাম যুক্ত করে দেয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য।
