আ.লীগ থেকে জামায়াত হয়ে বিএনপিতে
বরিশালে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক ‘মুজিব কেতাবের নুরুল’
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষকের মনোনয়ন পেয়েছেন দলবদলের মাস্টার বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম। শেখ মুজিবকে নিয়ে গ্রন্থ লেখা এই ব্যক্তি বরিশালে ‘মুজিব কেতাবের নুরুল’ নামে বেশি পরিচিত। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে আওয়ামী লীগ হিসাবে পরিচিত নুরুল ইসলাম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর হয়ে যান জামায়াতে ইসলামীর লোক। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর আবার সেই পরিচয় পালটে সেজেছেন বিএনপি। চাকরিজীবনে বহু অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বর্তমানে চলছে একাধিক তদন্ত। তারপরও কীভাবে বরিশাল জেলার শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক করা হলো তাকে, তা নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন! শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মনোনয়ন প্রশ্নে সরকারিভাবে থাকা নিয়মে তিনি বেশি পয়েন্ট পেয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোও আমরা উল্লেখ করেছি। এদিকে সব অভিযোগ অস্বীকার করে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক হিসাবে পরিচিত। কখনোই আওয়ামী লীগ করিনি। অনৈতিক সুবিধা নিতে ব্যর্থ যারা, তারাই এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
২০২৩ সালের ১৩ মে জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হতে শিক্ষা দপ্তরে একটি ফরম পূরণ করে জমা দেন নুরুল ইসলাম। তার স্বাক্ষরে জমা হওয়া ফরমের ৭ নম্বর কলামে ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ-অন্তরে বঙ্গবন্ধু’ ও ‘মার্চের চেতনা জন্ম-ভাষণ-স্বাধীনতা’ নামে দুটি গ্রন্থ লিখেছেন বলে জানান তিনি। কেবল শিক্ষা দপ্তরে দেওয়া তথ্যই নয়, আলোচ্য দুটি গ্রন্থের প্রচ্ছদসহ লিফলেট আর সেই লিফলেটের ছবি দিয়ে ফেসবুকেও চালান প্রচার। সেসময় বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন নুরুল ইসলাম। বরিশালের মেয়র ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নগর সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। কৌশলী নুরুল ইসলাম আগে থেকে পরিকল্পনা করে একবার হজে যান। একই সময়ে হজে যান সাদিক আব্দুল্লাহর মরহুম মা সাহানারা আব্দুল্লাহ। মক্কায় তার সঙ্গে দেখা করা এবং খাওয়ার ছবি তুলে আবেগঘন কথা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করেন নুরুল ইসলাম। একই ঘটনা ঘটান মাদারীপুর জিলা স্কুলে কর্মরত থাকাবস্থায় সেখানকার তৎকালীন এমপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানকে নিয়ে। সেখানেও নিজেকে আওয়ামী লীগ আর শাহজাহান খানের ঘনিষ্ঠ প্রমাণ করতে কেবল শাহজাহান খানই নন, তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেসব ছবি আপলোড করেন ফেসবুকে।
২০২৩ সালে বরিশাল জিলা স্কুলে কর্মরত থাকাবস্থায় নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ। ভুয়া বিল-ভাউচারে সরকারি অর্থ আত্মসাৎসহ আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসাবে স্কুল ফান্ডের টাকা নয়ছয় করার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে বরিশাল থেকে বদলি করা হয় ঝালকাঠি হরচন্দ্র সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে স্কুলের নির্মাণসংক্রান্ত কাজে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন নুরুল ইসলাম। এই জেলায় কর্মরত থাকাবস্থায় আবাসিক হোটেলে নারী কেলেঙ্কারিতেও জড়ান তিনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর রাতারাতি জামায়াতে ইসলামীর লোক বনে যান এই প্রধান শিক্ষক। জামায়াতের প্রভাবশালী একটি পক্ষের সহায়তায় বদলি হয়ে পুনরায় আসেন বরিশাল জিলা স্কুলে। অবশ্য সেসময় জামায়াতের সমর্থনের পাশাপাশি শিক্ষা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বদলি বাবদ মোটা অঙ্কের উৎকোচ দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বরিশালে এসেই জামায়াত তোষণে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন নুরুল ইসলাম। জিলা স্কুলের শত বছরের ইতিহাস ভেঙে ইসলামী ছাত্রশিবির পরিচালিত একটি কোচিং সেন্টারকে স্কুল ভবন ব্যবহার করে ক্লাস/পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ দেন তিনি। এক্ষেত্রে স্কুল কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসকের কাছ থেকেও নেননি অনুমতি।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি আরেক দফা ভোল পালটে হয়ে যান বিএনপি সমর্থক। শুরুতেই ফুল নিয়ে ছুটে যান বরিশাল-৩ (হিজলা-মুলাদী) আসনের এমপি বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিনের কাছে। বরিশাল সদর আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ারের কাছেও ফুল নিয়ে ছুটে যান তিনি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হওয়ার পর এই তালিকায় যুক্ত হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিনের নাম। কেবল ফুল দেওয়াই নয়, অনেকটা বিনা প্রয়োজনে স্কুল প্রাঙ্গণে পরপর দুটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আলাদাভাবে প্রধান অতিথি করেন মজিবর রহমান সরোয়ার ও বিসিসি প্রশাসক বিলকিস জাহানকে। এসব অনুষ্ঠানে যাওয়া বিএনপি নেতাদের উপহার দেন শাড়ি-পাঞ্জাবি। নেতাদের বাড়ি বাড়ি উপহার হিসাবে দেওয়ালঘড়িও পৌঁছানোর ইতিহাস রয়েছে তার। বলা বাহুল্য, এসব করা হয়েছে স্কুল ফান্ড তথা সরকারি টাকায়। অবশ্য কিছু দেওয়ালঘড়ি তিনি কিনেছেন নিজের টাকায়। আওয়ামী লীগ আমলের মতো এবারও বিএনপি নেতাদের নিয়ে করা এসব আয়োজনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে নিজেকে খাঁটি বিএনপির তকমা দেন তিনি।
এত অভিযোগ সত্ত্বেও নুরুল ইসলাম কীভাবে সেরা শিক্ষক হলেন-এমন প্রশ্নে জেলা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার বলেন, ‘গুণী শিক্ষক নির্বাচনের জন্য পয়েন্টভিত্তিক কিছু বিষয় থাকে। সেই পয়েন্ট প্রতিযোগিতায় তিনি (নুরুল ইসলাম) বেশি পয়েন্ট পেয়েছেন।’
অভিযোগ সম্পর্কে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে আমাকে বিএনপি-জামায়াত বলা হয়েছে। এখন আবার বলা হচ্ছে আওয়ামী লীগ। আমি ইসলামিক কায়দায় জীবনযাপন করি। এ কারণে সবাই আমাকে বিএনপি-জামায়াত মনে করে। আমি কখনোই আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলাম না। সরকারি কর্মকর্তা হিসাবে মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয় বলে রেখেছি। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্য নয়। স্কুলের কিছু কর্মচারী অনৈতিক সুবিধা চেয়ে না পেয়ে এসব মিথ্যা ছড়াচ্ছে।’

