মাসোহারা সিন্ডিকেট পোস্টিং-বাণিজ্য
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেড় হাজার কোটি টাকার ‘সুফল (টেকসই বন ও জীবিকা) প্রকল্প’ শুধু কেনাকাটার দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বনায়নের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং বাণিজ্য এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের ঘিরে ‘মাসোহারা সিন্ডিকেট’-এর চিত্রও সামনে এসেছে। প্রকল্পের টাকা ভাগাভাগি ও কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে খোদ প্রকল্প পরিচালককে (পিডি) সরিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগও করেছেন বন কর্মকর্তাদের কয়েকজন।
প্রকল্পের আওতায় ‘সমৃদ্ধকরণ বাগান’ তৈরির নামে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের নথিতে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে অ-কাঠ বনজ পণ্য বা এনটিএফপিভিত্তিক বাগান তৈরির নামে আরও ১৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে কোনো ধরনের বাগান না করেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এই বিপুল অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। দুই খাত মিলিয়ে দুর্নীতির অভিযোগের পরিমাণ ৬৩ কোটি ১০ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।
পিডি বদলেও আর্থিক সমঝোতা : বন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সুফল প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক রাকিবুল হাসান মুকুলকে সরিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে ছিল আর্থিক সমঝোতার বিষয়। তাদের দাবি, প্রকল্পের মোট বাজেট থেকে ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন হিসাবে দেওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ড. গোবিন্দ রায়কে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের আর্থিক সমঝোতা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লাভজনক পদে ‘পোস্টিং বাণিজ্য’ : সুফল প্রকল্পের বনায়ন ও বাজেট বরাদ্দ যেখানে বেশি ছিল, সেসব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসার জন্য আর্থিক লেনদেনের একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বন কর্মকর্তা। তাদের ভাষ্য, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন চেকস্টেশনে পদায়ন ঘিরে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হতো।
দুদকের অভিযানসংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বন অধিদপ্তরে বদলি, পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
মাসোহারার অভিযোগ : প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, রেঞ্জ ও চেকস্টেশন থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন বন কর্মকর্তা। অভিযোগকারীদের দাবি, দেশের প্রায় ৪৫ জন বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছ থেকে মাসে কয়েক কোটি টাকা, প্রায় ৪২০টি রেঞ্জ থেকে আরও কয়েক কোটি টাকা এবং বিভিন্ন চেকস্টেশন থেকেও নিয়মিত অর্থ নেওয়ার একটি ব্যবস্থা ছিল। তাদের দাবি, এই ‘মাসোহারা সিন্ডিকেট’-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নেওয়া হতো।
‘বিশেষ বলয়’ নিয়ন্ত্রণে প্রকল্প : ২০২০ সালের মার্চে মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রধান বন সংরক্ষকের দায়িত্ব নেন। তার ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত একটি ‘বিশেষ বলয়’ সুফল প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয় বলেও দাবি করেছেন কর্মকর্তাদের কয়েকজন। ওই বলয়ে আরএসএম মনিরুল ইসলাম, বিপুল কৃষ্ণ দাস, মো. আব্দুল আওয়াল সরকার, মিহির কুমার দে, মো. মাইন উদ্দিন, ড. গোবিন্দ রায় ও জাহেদুল কবিরের নাম এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের (ক্ষমতাচ্যুত) আমলে তৎকালীন বন ও পরিবেশমন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় আরএসএম মনিরুল ইসলাম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও অন্য এক বন কর্মকর্তার ভূমিকা ছিল। প্রধান বন সংরক্ষক তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী মহলের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
দুদকের জালে দুর্নীতির খতিয়ান : সুফল প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম। তারা বিভিন্ন নথি সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একই বছরের আগস্টে সুফল প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত শুরু হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও প্রকল্পটির বনায়ন কার্যক্রম নিয়ে দুদকের গভীর অনুসন্ধানের কথা এসেছে। কাগজে দেখানো বনায়নের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় প্রায় ৩৫০ হেক্টরের ব্যবধান নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১২ ধরনের নথি চাওয়া হয় : এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানের অংশ হিসাবে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় প্রধান বন সংরক্ষকের দপ্তরে সুফল প্রকল্পের ১২ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি চাওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল মূল ও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব, প্রতিটি ক্রয় প্যাকেজের দরপত্র, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, গাড়ি ও সরঞ্জাম কেনার চুক্তি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট তথ্য, নিরীক্ষা প্রতিবেদন, বনায়নের স্থানভিত্তিক তালিকা, অবস্থান নির্ণায়ক তথ্য, উপগ্রহচিত্র, নার্সারি থেকে চারা উত্তোলন ও বিতরণের রেজিস্ট্রার, বাগানভিত্তিক হিসাব, টিস্যু কালচার ল্যাবের উৎপাদন তথ্য, প্রকল্পের অর্থছাড় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমোদনসংক্রান্ত নথি।
আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে তথ্য সরবরাহ না করে সংশ্লিষ্ট দপ্তর একাধিকবার সময় নেয়। এরপরও চাওয়া তথ্যের বড় অংশ পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের সব কাজ নিয়ম মেনে হয়ে থাকলে ব্যয়, ক্রয় ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের নথি প্রকাশে বাধা কোথায়?
তথ্যের লুকোচুরি, নীরব অভিযুক্তরা : প্রকল্পের অভিযোগের বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করলেও তিনি কোনো সদুত্তর দেননি। পরে তথ্য অধিকার আইনে চাওয়া তথ্যের বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি শুধু ‘দিচ্ছি, দেব’ বলে সময়ক্ষেপণ করেছেন।
সুফল প্রকল্পের পরিচালক ড. গোবিন্দ রায়ের সঙ্গেও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও কোনো উত্তর দেননি।
সুফল প্রকল্পের অভিযোগ যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ তথ্যই সরকারি নথিতে থাকার কথা। একটি গাড়ির দাম কেন বেশি-তার উত্তর রয়েছে দরপত্রে। ফটোকপি মেশিন কত দামে কেনা হয়েছে, তা জানা যাবে কার্যাদেশে। কোনো বাগান সত্যিই হয়েছে কি না, তার প্রমাণ থাকার কথা অবস্থান নির্ণায়ক তথ্য, মাঠপর্যায়ের ছবি ও উপগ্রহচিত্রে। ল্যাব চালু হয়েছে কি না, তার উত্তর রয়েছে উৎপাদন রেজিস্ট্রারে। প্রকল্পের অর্থ কোথায় গেছে, তা জানা সম্ভব অর্থছাড়, হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। ফলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পর নির্ধারিত সময়ে তথ্য না দেওয়া এবং গড়িমসি করায় দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বন রক্ষার জন্য নেওয়া প্রকল্পে যদি বনায়ন কেবল কাগজেই থাকে, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত অবকাঠামো যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়, ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য ব্যবধান থাকে এবং প্রকল্পের নথি চেয়েও তা পাওয়া না যায়, তাহলে প্রশ্ন শুধু আর্থিক অনিয়মের নয়-রাষ্ট্রীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থের ব্যবহার ও জবাবদিহি নিয়েও।
প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার এই জাতীয় প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ডিপিপি, দরপত্র, ঠিকাদারি বিল এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন জনগণের সামনে প্রকাশের দাবি উঠেছে। বনের জন্য বরাদ্দ অর্থ কোথায় গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, দুদক গত বছর ‘সুফল’সহ বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে বন অধিদপ্তরে একটি অভিযান পরিচালনা করে। পরে অভিযোগগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তিনি বলেন, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা বন অধিদপ্তরে রেকর্ডপত্র তলব করেছেন। বন অধিদপ্তরের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

