আলোচনায় পিচ্চি রাজা
সোর্স থেকে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক সম্রাট
রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের উত্থান-পতনের অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। মাদকের নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন গ্রুপের বিরোধ ঘিরে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও কম নয়। এর মধ্যেই চলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান। কিন্তু বন্ধ করা যায়নি মাদকের কারবার। এক সময়ের শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াকের হয়ে কাজ করা রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’ও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে। একপর্যায়ে পুলিশের সোর্স হিসাবে কাজ করা এই তরুণ হয়ে ওঠেন ক্যাম্পের অন্যতম মাদকসম্রাট।
গত ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তার বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে। মোহাম্মদপুর থানায়ই মামলার সংখ্যা ২৯টি। এর মধ্যে তিনটি হত্যা, সাতটি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক এবং ১৩টি মাদকের মামলা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে গাজীপুরের নাওজোড় এলাকায় টয়লেটে যাওয়ার কথা বলে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান তিনি। এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পাঁচ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরপর থেকে ফের আলোচনায় পিচ্চি রাজা?
সবশেষ গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে নিজের অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ার কাহিনী বর্ণনা করেন পিচ্চি রাজা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে তিনি পুলিশের সোর্স হিসাবে কাজ করতেন। আয় কম হওয়ায় পরে একটি গ্যাস পাম্পে চাকরি নেন। সেখানে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু একটি ঘটনায় চাকরি হারানোর পর আবার ক্যাম্পে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালে ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। ওই অভিযানে তার কাছ থেকে কিছু না পেলেও তার বিরুদ্ধে ৫১ পিস ইয়াবার মামলা দেওয়া হয়। সেটিই ছিল তার বিরুদ্ধে প্রথম মামলা। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে মাদক বিক্রি শুরু করেন। প্রথম দিকে অল্প পরিমাণ মাদক কিনে বিক্রি করতেন এবং এতে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার টাকা আয় হতো। পরে আবার কারাগারে গেলে সেখানে অপরাধীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। বেরিয়ে এসে যুক্ত হন মাদক কারবারে। পিচ্চি রাজা তার জবানিতে পুলিশকে বলেন, এক পর্যায়ে সে নিজেই মাদক ব্যবসা শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় মাদক কারবারের নেতৃত্বের দিকে। স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৪ সালের পর অল্প বয়সেই ক্যাম্পের মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে যুক্ত হন রাজা। একই সময় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সোর্স হিসাবেও কাজ করতেন তিনি। ফলে ক্যাম্পের অপরাধজগতের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গেও তার যোগাযোগ তৈরি হয়। ২০২০ সালে করোনায় ইশতিয়াকের মৃত্যুর পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে আসে।
একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন পিচ্চি রাজা। ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ করে পিচ্চি রাজার সঙ্গে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, এলাকার লাইনম্যান নিয়োগ, অর্থ আদায় এবং আধিপত্য বিস্তার কেন্দ করে দুপক্ষের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৫ আগস্ট পরবর্তী অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। পিচ্চি রাজা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ‘রাজত্ব’ নিতে চেয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। ক্যাম্পে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বুনিয়া সোহেলের নামও বারবার উচ্চারিত হয় পিচ্চি রাজার বক্তব্যে। বুনিয়া সোহেল এমন অবস্থান চেয়েছিলেন যেখানে ক্যাম্পে তার ওপর আর কেউ থাকবে না। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন-এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি। স্থানীয়দের দাবি, বুনিয়া সোহেলের ওপর হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের পর ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণে নতুন করে পিচ্চি রাজার প্রভাব বাড়ে। এমনকি গত বছর অক্টোবরে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় হামলা ও লুটপাটের সময় পিচ্চি রাজাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে প্রভাব বিস্তারের কথা বলতে শোনা গেছে। পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের পাশাপাশি বিপুল অর্থ-সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন পারিবারিক ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার শ্বশুর খোরশেদ, শালা নয়ন এবং ফুফাতো ভাই রনিসহ কয়েকজন আত্মীয় এ অর্থের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তার ২৫ থেকে ৩০টি সিএনজিচালিত অটো এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি রয়েছে।
পিচ্চি রাজার সঙ্গে মাদক কারবার ও অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে আদি, নবাব, শাহজাদা, ফাইজান, বেলুন, রুবেল, রনি, নাটা সুমন, সুজন, ব্যাটারি কামরান, হীরা ও মঈন পিচ্চিসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তারা মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল নিশ্চিত করা এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজে যুক্ত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো অপরাধী সোর্স হিসাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে পরে সেই পরিচয়কে নিজেদের নিরাপত্তা ও প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে। ফলে একজন অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তার জায়গায় আরেকজনের উত্থান ঘটে। তবে এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ‘কে আমাদের সোর্স আর কে আমাদের সোর্স নয়, এটা আমাদের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। তিনি অপরাধী কি না, সেটাই আমাদের কাছে প্রধান বিষয়।’ তিনি বলেন, ক্যাম্পের সব অপরাধীকে গ্রেফতারে নিয়মিত অভিযান চলছে। পিচ্চি রাজাকে গ্রেফতারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে।
পিচ্চি রাজার খোঁজে থানায় মামলা : যুগান্তর প্রতিবেদন, গাজীপুর জানান, দুদিন পার হলেও খোঁজ নেই পিচ্চি রাজার। এ ঘটনায় গাজীপুরের কোনাবাড়ী থানায় মামলা করা হয়েছে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন জানান, থানার উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ মজুমদার বাদী হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে কোনাবাড়ী থানায় মামলা করেছেন। মামলার একমাত্র আসামি পিচ্চি রাজা। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে।

