কেপিআই এলাকায় মার্কেট
বিসিসির বিরুদ্ধে আদালতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
Advertisement
আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশালে ব্যাংক সড়কের পাশে কেপিআই ঘেঁষে চলছে সিটি করপোরেশনের মার্কেট নির্মাণের কাজ। সোমবার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা (কেপিআই) আর ব্যস্ত সড়ক ঘেঁষে বহুতল মার্কেট নির্মাণ করছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। এর প্রতিবাদে মানববন্ধন-বিক্ষোভ হলেও বন্ধ হয়নি কাজ। সবশেষ এ নিয়ে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় জনতার পক্ষেও দায়ের করা হচ্ছে মামলা। এত কিছুর পরও দিন-রাত চলছে মার্কেট নির্মাণের কাজ। মাত্র ১০ ফুট চওড়া আর ১৪৫ ফুট লম্বা জমিতে ১০ ফুট গর্ত করে হচ্ছে বেজ ঢালাই। অথচ আইন অনুযায়ী কেপিআইভুক্ত স্থাপনার ২৫ মিটারের মধ্যে এ ধরনের কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। তাছাড়া মার্কেট হলে সহজে চলাচলের পথ হারাবে পেছনে থাকা বেশ কয়েকটি পরিবার।
বরিশাল নগরীর ব্যস্ততম বগুড়া রোড ও দ্বীনবন্ধু সেন রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বরিশাল শাখা। আবাসিক এলাকা হিসাবে পরিচিত ওই এলাকায় রয়েছে বরিশাল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আড়ংসহ দেশের বেশ কয়েকটি খ্যাতনামা ব্র্যান্ডের শোরুমও রয়েছে এর আশেপাশে। ফলে দিন-রাতের অধিকাংশ সময় যানজটে আটকে থাকে পুরো এলাকা। আর এখানেই একটি বহুতল মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। বগুড়া রোড ও দ্বীনবন্ধু সেন রোডের সংযোগ মোড়ে ওই মার্কেট নির্মাণ করছে তারা। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে নগর ভবনের একটি সূত্র জানায়, ‘সেখানে সিটি করপোরেশনের ১০ শতাংশ জমি রয়েছে। তার মধ্যে মার্কেট নির্মাণের জন্য ১০ ফুট চওড়া ও ১৪৫ ফুট লম্বা একটি জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। মার্কেট নির্মাণে ঠিকাদার নিয়োগের পর শুরু হয়েছে কাজ। ৩০ সেপ্টেম্বর এই কাজ উদ্বোধন করার কথা ছিল বিসিসি প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনের। তবে কিছু জটিলতা হওয়ায় তিনি আর যাননি সেখানে। প্রশাসক না গেলেও ওইদিন থেকেই শুরু হয় মার্কেট নির্মাণ।’
যেদিন বিসিসি প্রশাসকের উদ্বোধনের জন্য যাওয়ার কথা, ঠিক সেদিনই উদ্বোধনস্থলে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন। যুগান্তরকে নাসরিন বলেন, ‘যানবাহনের চাপে এমনিতেই এই সড়ক দিয়ে চলা যায় না। যেখানে সড়ক প্রশস্ত করে যান চলাচল সহজ করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের, সেখানে মার্কেট করে সমস্যা আরও বাড়াচ্ছে তারা। একদিকে এটি সড়কের একটি ব্যস্ত মোড়, অন্যদিকে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়সহ রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাছাড়া পুরো এলাকাটি আবাসিক। এখানে বহুতল মার্কেট হলে ভিড় যেমন বাড়বে, তেমনি দুর্ভোগ বাড়বে স্থানীয় জনসাধারণের। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবির প্রতি সংহতি জানাতে আমি এখানে এসেছি।’ ৩০ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভের পর মার্কেট নির্মাণ বন্ধের দাবিতে ৩ অক্টোবর মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী। স্থানীয় বাসিন্দা এবং আফরোজা নাসরিনসহ বিএনপির বেশ কিছু নেতাকর্মীও অংশ নেন ওই মানংববন্ধনে।
এলাকাবাসীর এই দাবির পাশাপাশি বৃহস্পতিবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বরিশাল শাখা। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যে জায়গায় মার্কেট নির্মাণ চলছে তার সীমানাতেই রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের জমি। আইন অনুযায়ী কেপিআইভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের ২৫ মিটারের মধ্যে করা যাবে না এ ধরনের কোনো স্থাপনা। বিষয়টি জানিয়ে বৃহস্পতিবার চিঠি দেয়া হয় সিটি করপোরেশনকে। নির্মাণকাজ বন্ধের অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তারপরও কাজ অব্যাহত থাকায় রোববার বরিশাল থেকে চিঠি দেয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের আইন বিভাগে। চিঠিতে স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ চাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান বরিশাল শাখার নির্বাহী পরিচালক মফিজুর রহমান খান চৌধুরী। যুগান্তরকে মফিজুর রহমান খান বলেন, ‘এখানে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানই সরকারি। কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন ভবন বা স্থাপনা নির্মাণে সব নিয়ম মেনে সবকিছু হবে, এটিই চাওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকেও উচ্চ আদালতে রিট করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘মাত্র ১০ ফুট চওড়া জমিতে কি করে পাঁচতলা মার্কেট হয়? সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো ভবন বা স্থাপনা নির্মাণ করতে গেলে সামনে পাঁচ ফুট এবং চারদিকে তিন ফুট করে জায়গা ছাড়তে হয়। এখন নগর ভবন কি তাদের নিজেদের আইন ভেঙে ভবন করবে? এই জমির পেছনে অনেকগুলো পরিবার আছে। মার্কেট হলে তারা কীভাবে রাস্তায় বের হবে?’
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য বিসিসি প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনের মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন দেয়া হলেও ধরেননি তিনি। তবে নগর ভবনের পক্ষে জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেলের দেয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে-‘আলোচ্য জমিটি দীর্ঘদিন অবৈধ দখলে থাকার পর ২০২৫ সালে দখলমুক্ত করে তৎকালীন প্রশাসক রায়হান কাওছারের সময়ে এই উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় উন্নয়ন কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে ড্রেন নির্মাণসহ প্রস্তাবিত উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করলে কতিপয় লোক বাধা সৃষ্টি করছে।’ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জনস্বার্থে চলমান উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা করার জন্য সর্বসাধারণকে অনুরোধ জানানো হয়।
