জাতিসংঘের নতুন সতর্কবার্তা
রোহিঙ্গাদের জন্য কমছে আন্তর্জাতিক সাহায্য
Advertisement
নেসারুল হক খোকন, নিউইয়রর্ক থেকে ফিরে
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একদিকে রোহিঙ্গা সংকট প্রলম্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবিক অর্থ সহায়তাও কমছে। মিয়ানমারের সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বছর জাতিসংঘ ও অংশীদার সংস্থাগুলোর কাছে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। অর্থ সহায়তাকারী অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ইউকে। জাতিসংঘ বলছে, বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এবার সবচেয়ে জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী কর্মসূচিগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘে উপস্থাপিত নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে, এক বছরে রোহিঙ্গা সহায়তায় অর্থের চাহিদা কমেছে ২৭৪ মিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালের জন্য জাতিসংঘ ও অংশীদাররা দাতা সংস্থার কাছে ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চেয়েছিল। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের চাহিদা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে আবেদনের পরিমাণ কমেছে ২২৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা)। বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার অর্থ কমে যাওয়ায় ২০২৬ সালের পরিকল্পনাটি ‘স্কেলড-ডাউন’ বা সংকুচিত-নীতি এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক করা হয়। এতে আরও বলা হয়, ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে মূলত জীবনরক্ষাকারী সহায়তা চালু রাখার ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করা হবে।
খাদ্যেই লাগবে ৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা : ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের জন্য খাদ্য সহায়তায় চাওয়া হয়েছে ২৪৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। আশ্রয়ণের জন্য ১২৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা; পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার বা ৭৫৪ কোটি টাকা এবং শিক্ষায় ৫২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬৪৯ কোটি টাকা প্রয়োজন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে ৪৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬১৪ কোটি টাকা প্রয়োজন। জীবিকা ও দক্ষতা উন্নয়নে ৩৫ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা এবং সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় বিভিন্ন খাতে ৩৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৪৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
সহায়তার ওপর নির্ভরতা কাটেনি : জাতিসংঘের তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক অর্থ সহায়তা কমেছে। তবে রোহিঙ্গাদের বড় অংশ এখনো মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে ক্যাম্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবার মানবিক খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। ৪২ শতাংশ পরিবারের আয় ছিল অস্থায়ী ও অনিশ্চিত উৎস থেকে। ২৩ শতাংশ পরিবার মানবিক কর্মসূচির আওতায় নগদ আয়ের সুযোগ পেয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায় ৫ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬৬ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। এই অর্থের মাধ্যমে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা ও অন্যান্য জরুরি সেবা চালু রাখা সম্ভব হয়েছে।
নতুন করে এসেছে দেড় লাখ রোহিঙ্গা : রোহিঙ্গা সংকটের চাপ কমার বদলে নতুন করে বাড়ছে। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নতুন করে এসেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এ কারণে কক্সবাজারের অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোর ওপর মানবিক চাপ আরও বেড়েছে।
২০২৬ সালের সংশোধিত যৌথ পরিকল্পনা বা জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠী মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনায় জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিওসহ ৯৮টি অংশীদার যুক্ত রয়েছে।
২০২৫ সাল ছিল সমুদ্রযাত্রার বছর : অর্থ সংকটের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত অব্যাহত থাকায় শিগ্গির প্রত্যাবাসনের আশা কমছে। এর মধ্যে জীবিকার সুযোগ সীমিত হওয়া এবং সহায়তা কমে যাওয়ায় অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রার পথ বেছে নিচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০২৫ সাল ছিল রোহিঙ্গাদের এ ধরনের সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। গত এপ্রিলেও ২৭০ জনের বেশি মানুষ বহনকারী একটি নৌযান ডুবে যায়; মাত্র ৯ জন জীবিত উদ্ধার হয়।
স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই : রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক দায় সাময়িকভাবে সামলাতে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন হলেও এর স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশের মাটিতে সম্ভব নয়। জাতিসংঘ ও মানবিক অংশীদাররা বলছে, রোহিঙ্গাদের ‘নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই’ সংকটের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
২০২৬ সালের পরিকল্পনার প্রথম কৌশলগত লক্ষ্যই হচ্ছে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করা। তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ ।
যদিও একদিকে আন্তর্জাতিক তহবিল কমছে, কিন্তু বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ছে। নতুন করে আসা মানুষ, দীর্ঘস্থায়ী ক্যাম্পজীবন এবং রাখাইনে চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে মানবিক সহায়তার অর্থ কমিয়ে নয়, বরং সংকটের মূল কারণের সমাধান এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।
