কুমিল্লায় ধানখেতে কিশোরীর লাশ
কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, আর কিছু বলব না
হত্যার আগে ধর্ষণ আত্মরক্ষায় ছোটাছুটি
Advertisement
কুমিল্লা ও যশোর ব্যুরো
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘সড়কের পাশে বিলে ধানখেতের মাঝে পড়ে আছে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এগিয়ে যেতেই দেখি এর ২০-৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। খেতের মাঝে ব্যাপক ধস্তাধস্তির চিহ্ন, অনুসরণ করে এগোতেই দেখতে পাই কাদায় মাথা গোঁজানো অবস্থায় কিশোরীর বিবস্ত্র লাশ। গলায় গামছা প্যাঁচানো। পরে গামছা দিয়ে লাশটি ঢেকে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে জানাই।’
কুমিল্লার লালমাইয়ে এক কিশোরীর লাশ উদ্ধারের এমন বর্ণনা দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন। আরেক বাসিন্দা মো. মুহিন বলেন, ‘ধানখেতের অবস্থা দেখেই বোঝা যায়, মেয়েটিকে অনেক কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’ আলামত দেখে স্থানীয়রা বলছেন, হত্যার আগে কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আত্মরক্ষায় সে ধানখেতে ছোটাছুটি করেছে। তবে পুলিশ ধর্ষণের বিষয়ে কিছু জানায়নি।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন তার মা-বাবা। দুপুরে তার বাড়িতে গেলে বিলাপ করতে করতে কিশোরীর বাবা বলেন, আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িতদের দ্রুত শনাক্তের দাবি জানাই। এ সময় সাংবাদিকদের ছবি তুলতে দেখে কিশোরীর মা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘কী হবে ছবি তুলে?
আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে, এখন আর কিছু বলব না।’ তবে পরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘কিশোরী যে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিল, সেই দায়ী। তাকে ধরলেই এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হবে।’ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এদিকে ওই কিশোরীকে অপহরণের আগের একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে তাকে ঘিরে কয়েকজন যুবককে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়। এই ফুটেজসহ সার্বিক বিষয়টি খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিলিং মিশনের হোতা হিসাবে ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।
বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বান্ধবীদের সঙ্গে কক্সবাজারে ঘোরাঘুরি শেষে সপ্তম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ নামে একটি দূরপাল্লার বাস থেকে কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে। সিসিটিভি ফুটেজে বাস থেকে তাকে একাই নামতে দেখা যায়। শহরের বাসায় ফেরার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে অটোরিকশাকে সিগন্যাল দিতে তাকে দেখা যায়। শহরগামী অটোরিকশা না পেয়ে সে হোটেল নূরজাহানে কিছুক্ষণ বসে। আবারও রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। এ সময় তাকে একা দেখে ৪-৫ যুবক টার্গেট করে। রাত সোয়া ১২টার দিকে সে সেখান থেকে হেঁটে বের হয়ে একটু সামনে গিয়ে অটোরিকশায় ওঠে।
ধারণা করা হচ্ছে, গভীর রাতে একা পেয়ে বা পরিবহণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ওই কিশোরীকে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যায় সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র। নির্জন ধানখেতে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে তাকে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায় তারা। বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। লালমাই থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেছেন কিশোরীর বাবা।
ঘটনার ওই রাতে কিশোরী তার বাবাকে মোবাইল ফোনে বলেছিল, ‘বাবা আমাকে ওরা আটকে রেখেছে, নিয়ে যাও।’ পাশাপাশি সে লাইভ লোকেশনও শেয়ার করেছিল। তবে সে কোথায় ছিল, তা নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার। একাধিকবার কল ব্যাক করলেও তা রিসিভ হয়নি। উদ্বিগ্ন হয়ে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি তারা।
এদিকে অটোরিকশার সূত্র ধরে শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে চালক সুমন মিয়াকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, গ্রেফতার সুমন বখাটে প্রকৃতির। তার বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়ায়। সে মাসখানেক আগে বসতঘর বিক্রি করে দিয়ে এসে কুমিল্লার বাগমারা দক্ষিণের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকত। তাকে কুমিল্লা ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
কিশোরীর বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। সেই সুবাদে তার পরিবার কুমিল্লা নগরীতে ভাড়া বাসায় থাকে। তাদের গ্রামের বাড়ি যশোর সদরে। শুক্রবার সকালে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তার লাশ দাফন করা হয়েছে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে আমরা সিএনজিচালক সুমনকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সে গ্রেফতার হওয়ায় আমরা দ্রুত রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারব। তিনি আরও বলেন, হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ বা কী ধরনের নির্যাতন করা হয়েছে তা ময়নাতদন্ত ও আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসতে পারে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, কিশোরীকে হত্যার স্থানটিতে অন্তত পাঁচটি ধানখেতে ছোটাছুটি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন দেখা গেছে। এতে বোঝা যায়, সে জীবন বাঁচাতে হত্যাকারীদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিল।
