বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
৭৯ খাতে দুর্নীতি ১২১ কোটি টাকা
Advertisement
আনু মোস্তফা, রাজশাহী
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’-এই প্রবাদের মতো অবস্থা যেন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ)। প্রতিষ্ঠানটির এমন কোনো সেবা খাত নেই যেখানে দুর্নীতির থাবা পড়েনি। এমনকি প্রকল্পে যে খাত নেই, সেখান থেকেও টাকা তুলে লোপাট করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানে সরকারি মেকানিক থাকলেও মেরামত বাবদ লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। টেন্ডারে পদে পদে দুর্নীতি হয়েছে।
বিল ছাড়া আত্মসাৎ করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি শুধু কাগজ-কলমে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে কেবল প্রকল্প পরিচালকরাই নন, দুর্নীতির ভাগ সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও পেয়েছেন। যে কারণে দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। চলতি মাসের শুরুর দিকে কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে পণ্য ও সেবা খাতে ৩৪০ কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির চিত্র প্রকাশিত হয়েছিল। এবার দ্বিতীয় পর্বে আরও ১২১ কোটি টাকা দুর্নীতির তথ্য সামনে এসেছে।
সম্প্রতি দুই মন্ত্রণালয়ের ১৬ সদস্যের দল বিএমডিএর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন খাতের আর্থিক লেনদেন ও কার্যাবলি নিরীক্ষা করে। চলতি মাসের শুরুতে তারা মন্ত্রণালয় ও মহাহিসাব নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেয়। দুই পর্বের ওই প্রতিবেদনে এমন চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় বিএমডিএর আঞ্চলিক, জেলা ও উপজেলা কার্যালয়গুলোতে অবাধে ঘটেছে এসব দুর্নীতি। কিন্তু এসব ঘটনায় একজন ছাড়া কারও বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, অনুমোদন ছাড়াই প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কয়েকজনকে উচ্চতর বেতন গ্রেড দেওয়া হয়। এতে এক বছরে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে নিরীক্ষা দল ব্যাখ্যা চাইলেও কর্তৃপক্ষ পরে জানাব বলেছে। তাদের ভাষ্য, এটা অর্থব্যয়ে স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা।
খালে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সেচ প্রকল্পে পন্টুন মেরামত খাত ছিল না। তবুও পন্টুন মেরামতে শ্রমিকের মজুরি দেখানো হয়েছে ১২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। নাটোরের বড়াইগ্রামে বিএমডিএ কার্যালয় নির্মাণে ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এ টাকা থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ফটোকপিয়ার মেশিন ও আইসিএস কেনা বাবদ ৫০ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এই দুই খাতে ৬৩ লাখ ৩১ হাজার টাকার অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে বিএমডিএ কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। রাজশাহীর তানোর ও দিনাজপুরের বীরগঞ্জে নির্ধারিত কাজের অতিরিক্ত ১৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা ব্যয়ের বিষয়টি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিএমডিএর অধিকাংশ টেন্ডারে পিপিআর-২০০৮-এর সব বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। তিনটি টেন্ডার নিজেরাই মূল্যায়ন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়েছে। এতে ১৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকার অনিয়ম হয়েছে। তানোর ও বাগমারায় বিএমডিএর পর্যাপ্ত সংখ্যক মেকানিক থাকার পরও বাইরে থেকে মেকানিক এনে পাম্প মেরামত দেখিয়ে ১৪ লাখ ২৭ হাজার টাকা বিল দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষায় বলা হয়েছে এটা পুরোপুরি একটি দুর্নীতি।
ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে টেন্ডারে নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে। একটি প্যাকেজ টেন্ডারকে সর্বোচ্চ ৫ লটে ভাগ করা যায়। কিন্তু কর্মকর্তারা কাজগুলোকে শত শত লটে বিভাজন করে ঠিকাদারদের ভাগবাঁটোয়ারা করে দিয়েছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। সেচ প্রকল্পে ১ হাজার মিলিমিটার ডায়া-সংবলিত এইচডিপিই পাইপ সরবরাহ ও স্থাপন কাজের টেন্ডারের শর্ত ছিল প্রতিষ্ঠানের ১২ কোটি টাকার বেশি কাজের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু শর্ত লঙ্ঘন করে আরএফএল প্লাস্টিককে ১৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। নিরীক্ষার মন্তব্য-এই কাজের জন্য কোম্পানিটি যোগ্যই ছিল না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাইপ ও ফিটিং প্রকল্পের বিপরীতে ৬৯ কোটি ৯২ লাখ ৫১ হাজার টাকা ছাড় হয় মন্ত্রণালয় থেকে। সমাপনীতে সমপরিমাণ টাকা ব্যয়ও দেখানো হয়। অথচ ৪ কোটি ১ লাখ টাকার বিল ভাউচার দেখাতে পারেননি প্রকল্প পরিচালক। এই টাকা সরকারি কোষাগারেও জমা হয়নি।
অন্যদিকে, বিএমডিএর ভূগর্ভস্থ সেচনালা বর্ধিতকরণ প্রকল্পে রীতিমতো ‘সাগরচুরি’ হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে টেন্ডারে অনভিজ্ঞ ঠিকাদারদের ৪০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার কাজ ভাগবাঁটোয়ারা করে দেওয়া হয়।
নিয়োগপ্রাপ্ত সেচপাম্প অপারেটরদের সরিয়ে ভাড়া করা অপারেটরদের ভাতা বাবদ ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা অপচয় করেছে সংস্থার সেচ বিভাগ। সেচ পাম্প ক্রয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ট্রান্সফরমার কেনায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। হাইড্রোলিক এলিভেটেড ড্রাম নির্মাণ, পাইপ ও ফিটিং ক্রয়ে ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। নওগাঁর সাপাহার ও ধামুইরহাট এবং রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সেচ চার্জ আদায়ে অনিয়মে ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৯ খাতে ৩৪০ কোটি এবং আরও ৭৯ খাতে ১২১ কোটিসহ মোট ১০৮টি খাতে দুর্নীতি-অনিয়ম শনাক্ত করেছে নিরীক্ষা দল। এক অর্থবছরে এই প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬১ কোটি টাকা। সম্প্রতি ভুয়া ভাউচারে ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পবা জোনের সহকারী মেকানিক মোতাহার হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাকে পঞ্চগড়ে সংযুক্তির পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক যিনি আগে সেচ বিভাগের প্রধান ছিলেন। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে সেচ বিভাগে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, নিরীক্ষায় উঠে আসা অভিযোগ-আপত্তিগুলো পর্যালোচনা করছি। কিছু ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ও জবাব দেওয়া হয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
