আইএমএফ’র পূর্বাভাসে অর্থনীতির দুঃসংবাদ
প্রবৃদ্ধি আরও কমবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি
মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাবে, প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩.২-এ নামবে * পরিস্থিতির উন্নয়নে দাতাদের সহায়তা চায় বাংলাদেশ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে দুঃসংবাদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির নতুন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হবে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যসহ বাড়বে মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়। এতে সাধারণ মানুষের কষ্ট আরও বেড়ে যাবে। অপর দিকে প্রবৃদ্ধির গতি কম থাকলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই পূর্বাভাস নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ পরিস্থিতির উন্নয়নে দাতাদের সহায়তা চায় বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফের সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস প্রকাশ করা হয়। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা উপলক্ষ্যে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির এ চিত্র উঠে আসে। এদিন আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় অর্থমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।
‘রেজিলিয়েন্স আন্ডার স্ট্রেইন, আর্জেন্ট চয়েসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি নানা ধাক্কা সামলে টিকে থাকলেও সব দেশ সমানভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে না। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুবিধা পাওয়া দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো বেশি চাপে রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটাতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা, বিদ্যুৎ ও পরিবহণ ব্যয় এবং উৎপাদন খরচের ওপর চাপ তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে পণ্য ও সেবায়। যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনুষ্ঠানস্থলে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অর্থমন্ত্রী। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য কোনো সংস্থার পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চায় না সরকার। সংস্থাগুলো নিজ নিজ হিসাব ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পূর্বাভাস দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক দেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যাবে। তিনি বলেন, আইএমএফ তাদের মতো করে হিসাব দিয়েছে। আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের মধ্যে যে সহযোগিতা দরকার, সেই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে এটাই মূল কথা।
চলতি বছরের এপ্রিলে আইএমএফ পূর্বাভাসে বলেছিল, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। তিন মাস পর জুলাইয়ে তা কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশের কথা বলেছিল। এবার তা আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশের কথা বলছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পূর্বাভাসও কমেছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পূর্বাভাস দিয়েছে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির। তুলনামূলকভাবে আইএমএফের পূর্বাভাস সবচেয়ে কম। এতে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সংস্কার কর্মসূচি এগিয়ে নিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আইএমএফের নির্বাহী পরিচালক উরজিত প্যাটেল এবং বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিয়ার্দের সঙ্গে বৈঠক করেন। বার্ষিক সভায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও অনিশ্চয়তা : আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিকূলতার মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতি সহনশীলতা বজায় রেখেছে। তবে সেই সক্ষমতা ধরে রাখার ব্যয় বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহণ খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ২০২৬ সালে বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য ইতিবাচক উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং এআই খাতে বিনিয়োগ নিয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশার সংশোধন ঘটলে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থব্যবস্থার সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ।
বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ : বাংলাদেশের জন্য এখন বড় হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি উঁচুতে থাকার পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নিলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়েও উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ছিল জিডিপির প্রায় শূন্য শতাংশ। ২০২৬ সালে তা ঘাটতিতে পড়ে জিডিপির শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে ঘাটতি বেড়ে ২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। সরকার কীভাবে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেবে, সে বিষয়েও পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া বেশি কার্যকর। প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে বাজারদর কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রাখার ব্যবস্থা নিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরামর্শের গুরুত্ব রয়েছে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি নির্ধারণের সময়ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের নীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক একমত : বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের নীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক একমত বলে জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক শেষে মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও নীতির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক পুরোপুরি একমত। এ বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে ছিল। আগের সময়ের বিভিন্ন দায়দায়িত্বের বোঝা বহন করতে হচ্ছে সরকারকে। এর সঙ্গে বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও রয়েছে। এসব বিষয় বিশ্বব্যাংক অনুধাবন করছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার যেসব নীতি গ্রহণ করেছে, সেগুলোর সঙ্গে সংস্থাটি একমত। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পাশে থাকতে আগ্রহী। আমরা যে নীতি গ্রহণ করেছি তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক একমত। এ বিষয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে প্রকাশিত খবরের প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি ও মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা রয়েছে। বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার এবং সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানের সামঞ্জস্য রয়েছে। কীভাবে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে এবং নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্বের কাঠামো নিয়েও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব লিখিতভাবে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

