অরণ্যঘেরা পালং খিয়াং ঝরনার মায়া
অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের হাতছানি
Advertisement
মোহাম্মদ ইলিয়াছ, বান্দরবান
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বান্দরবানের আলীকদমে চিম্বুক রেঞ্জের গহিনে বহু স্তরবিশিষ্ট পালং খিয়াং ঝরনা। দুর্গম পথ পেরিয়ে এর স্ফটিকস্বচ্ছ জলের কাছে পৌঁছালে মুছে যায় সব ক্লান্তি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পূর্বাঞ্চলে চিম্বুক রেঞ্জের সুউচ্চ ও দুর্গম কির্সতং পাহাড়ের কাছাকাছি অবস্থিত প্রকৃতির নিবিড় স্নিগ্ধতায় ঘেরা ‘পালং খিয়াং’ ঝরনা। নতুন কোনো আবিষ্কার নয়, আদি ও অকৃত্রিম এই ঝরনাটি বহু বছর ধরে বান্দরবানের পাহাড়ি ট্র্যাকার, প্রকৃতিপ্রেমী ও রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক তীব্র আকর্ষণের নাম।
মাতামুহুরী নদীর প্রধান উপনদী তৈন খালের (টোয়াইন খাল) উজান বেয়ে এবং ঘন জঙ্গল ও খাড়া পাহাড়ের বুক চিরে এই ঝর্ণায় পৌঁছাতে হয়। ভৌগোলিক অবস্থান ও অত্যন্ত দুর্গম হওয়ার কারণে এটি দেশের অন্যতম কঠিন ও রোমাঞ্চকর ট্রেইল হিসাবে পরিচিত।
স্থানীয় প্রবীণ ও পাহাড়ি বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, পালং খিয়াং ঝরনাটি যুগ যুগ ধরে এই জনপদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে প্রবহমান রয়েছে। আলীকদম সদর থেকে পানবাজার হয়ে আমতলী ঘাট পার হয়ে ট্রলার বা নৌকায় তৈন খাল ধরে দোছরি বাজার পর্যন্ত যেতে হয়। এরপর সেখান থেকে পাহাড়ি ঝিরিপথ, পাথুরে বুক, থানকোয়াইন ঝরনা এবং হাজরাম পাড়া হয়ে গভীর জঙ্গল ও খাড়া পাহাড়ের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এই ঝরনার কাছে পৌঁছাতে হয়। দুর্গমতার কারণে দীর্ঘদিন এটি সাধারণ পর্যটকদের চোখের অন্তরালে থাকলেও অভিজ্ঞ ট্র্যাকার ও অভিযাত্রীদের কল্যাণে ধীরে ধীরে এর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বহুস্তরবিশিষ্ট এই ঝরনার সামনে জমা হওয়া স্ফটিক স্বচ্ছ পানি দেখে অনেকটা প্রাকৃতিক সুইমিংপুলের মতো মনে হয়।
ঐতিহ্যবাহী এই ঝরনা নিয়ে স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দা ইয়াংলিয়াং ম্রো বলেন, পালং খিয়াং ঝরনাটি আমাদের অঞ্চলে বহু বছর ধরে আছে। আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই ঝরনা দেখে আসছেন। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ আর গভীর বনের ভেতর দিয়ে পৌঁছাতে হয় বলে আগে শুধু আমরাই যাতায়াত করতাম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি রোমাঞ্চ ভালোবাসেন এমন পর্যটকরা এখানে আসছেন। এটি আমাদের এলাকার সৌন্দর্য প্রকাশ করছে, তবে পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি।
ঝরনাটি দেখার পর ঢাকা থেকে আসা পর্যটক ও অ্যাডভেঞ্চার ট্র্যাকার ফারহান আহমেদ বলেন, কঠিন ও দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পালং খিয়াং ঝরনার সামনে পৌঁছানোই আলাদা এক রোমাঞ্চ। বহু ঘণ্টা হাঁটার পর যখন ঝরনার অবিরাম ধারায় স্ফটিক স্বচ্ছ পানি নামতে দেখি, তখন সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। চিম্বুক রেঞ্জ ও কির্সতং পাহাড়ের পরিবেশ এখনো বন্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রেখেছে। প্রতিটি ট্র্যাকিংপ্রেমী মানুষের জন্য এটি একটি স্বপ্নের গন্তব্য।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনজুর আলম বলেন, পালং খিয়াং ঝরনাটি আলীকদমের অন্যতম এক প্রাকৃতিক ও পর্যটন সম্পদ। বহু আগে থেকেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে এর অস্তিত্ব রয়েছে। ভৌগোলিক ও যাতায়াতগত দুর্গমতার কারণে ঝরনাটি তার আদি ও বুনো সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় উপজেলা প্রশাসন সব সময় সচেতন রয়েছে। ইকোট্যুরিজমের টেকসই বিকাশের মাধ্যমে এই অঞ্চলের পর্যটন খাতকে আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা জানান, পালং খিয়াং ঝরনার ট্রেইলটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সাধারণ পর্যটকদের জন্য এটি উপযোগী নয়। অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইড এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এই পথে ভ্রমণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও জোঁকের উপদ্রব থাকায় সাধারণত শুকনো মৌসুম বা উপযুক্ত সময়েই ট্র্যাকাররা এখানে যাতায়াত করে থাকেন। সঠিক নীতিমালা ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহাসিক ঝরনাটি দেশের ইকো-ট্যুরিজমে আরও বড় অবদান রাখতে পারবে।
