আজ অমর শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের জন্মবার্ষিকী
Advertisement
সাংস্কৃতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গানের সুরে গ্রামবাংলার জনজীবন, প্রেম-বিরহ ও লোক-ঐতিহ্য তুলে ধরে বাংলা সংগীতে স্বতন্ত্র আসন করে নিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। দরদভরা কণ্ঠে নজরুল সংগীত, ভাওয়াইয়া, ইসলামি গান, পল্লিগীতি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদিসহ নানা ধারার গান গেয়ে গ্রামীণ ও শহরের মানুষের কাছে আদরণীয় হয়ে উঠেছিলেন বাংলার লোকসংগীতের এই অমর শিল্পী। তার দেখানো পথ ধরেই পত্রেপুষ্পে পল্লবিত হয় আমাদের সংগীতাঙ্গন। আজ ২৭ অক্টোবর এই কিংবদন্তি শিল্পীর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষ্যে রাজধানীতে আয়োজন করা হয়েছে দুটি স্মরণ অনুষ্ঠান। এ ছাড়াও নানাভাবে তাকে স্মরণ করবে সংগীতপ্রিয় মানুষেরা।
বিশিষ্টজনদের ভাষ্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে এসে আব্বাসউদ্দীন জনপ্রিয়তার শিখর স্পর্শ করেন। শুধু তাই নয়, নজরুলের লেখা বাঙালি মুসলমানের প্রাণের গান- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশি ঈদ’ তিনি প্রথম গেয়েছিলেন। এটি সৃষ্টির নেপথ্যেও ছিল খ্যাতিমান এই শিল্পীর সম্পৃক্ততা। কাজী নজরুলের লেখা ‘হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ’সহ অসংখ্য গজলও গেয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। কবি জসীমউদদীন, গোলাম মোস্তফার ইসলামি ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়ে জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছিলেন। আব্বাসউদ্দীনের আত্মজীবনী ‘আমার শিল্পীজীবনের কথা’ বই থেকে জানা যায়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সহায়তায় কলকাতায় গ্রামোফোন রেকর্ডে গান রেকর্ড করেন তিনি। তার প্রথম রেকর্ড ‘কোন বিরহীর নয়নজলে বাদল ঝরে গো’।
লোকগবেষকরা মনে করেন, শহুরে জীবনে লোকগীতিকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব আব্বাসউদ্দীনের। আব্বাসউদ্দীন ছিলেন প্রথম মুসলমান গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচএমভি থেকে গানের রেকর্ড বের করেন। রেকর্ডগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিল। তাই অন্যান্য হিন্দুধর্মের গায়করা মুসলমান ছদ্মনাম ধারণ করে গান করতে থাকেন। বিশিষ্ট চিন্তক ফরহাদ মজহারের ভাষ্য, আব্বাসউদ্দীন কেবল গায়ক ছিলেন না, এই প্রজন্মের গায়করা যদি ভাবেন আব্বাসউদ্দীন শুধু গান গেয়ে এ দেশের মানুষের মন জয় করেছেন তাহলে তা মস্তবড় ভুল হবে। আব্বাসউদ্দীন তার সময়কালের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছিলেন।
কে না জানে-ও কি গাড়িয়াল ভাই, আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, আমায় এত রাতে কেন ডাক দিলি, নাও ছাড়িয়া দে, আমার গলার হার খুলে নে, ফাঁন্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে, আগে জানলে তোর ভাংগা নৌকায়, আমার হাড় কালা করলাম রে, নদীর কূল নাই কিনার নাই এবং মাঝি বাইয়া যাও রে-সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান তো বাংলা লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ।
আব্বাসউদ্দীন আহমদ : ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জের বলরামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। তার বাবা জাফর আলী আহমদ ছিলেন তুফানগঞ্জ মহকুমা আদালতের আইনজীবী। নিজ প্রচেষ্টায় গান শেখা শুরু করলেও পরে কিছুদিন ওস্তাদ জমিরউদ্দীন খাঁর কাছে উচ্চাঙ্গসংগীতের তালিম নেন। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন আব্বাসউদ্দীন। এ সময় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করার পাশাপাশি সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন। দেশ ভাগের পর ঢাকায় এসে সরকারের প্রচার দপ্তরে সং অর্গানাইজার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
নিজের সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রচনা করেন ‘আমার শিল্পীজীবনের কথা’। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত বইটি তার জীবন ও সংগীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর মারা যান আব্বাসউদ্দীন।
সংগীত জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছে স্বাধীনতা পদক এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার। প্রাইড অব পারফরম্যান্সসহ আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তার উত্তরসূরি হিসাবে পিতার পথেই ফেরদৌসী রহমান এবং মরহুম মুস্তাফা জামান আব্বাসী গান গেয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন। সংগীতে ও শিক্ষকতায় আলো ছড়াচ্ছেন নাতনি নাশিদ কামালও।
জন্মবার্ষিকী ঘিরে কর্মসূচি : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় একাডেমির সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ শীর্ষক সংগীতানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আব্বাসউদ্দীন আহমদের গান পরিবেশন করবেন দেশের প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীরা।
একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে ‘ছায়ানটের বিশেষ শ্রোতার আসর-আব্বাসউদ্দীন আহমদ স্মরণ’।
