বৈজ্ঞানিক পরিচয় শনাক্তের দাবি
রাজারহাটে রহস্যময় ‘অচিন গাছ’
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রহস্যময় ‘অচিন গাছ’ -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গাছটি কোথা থেকে এসেছে, কে লাগিয়েছেন, বয়সই বা কত-কোনো প্রশ্নেরই নিশ্চিত উত্তর জানা নেই স্থানীয়দের কাছে। অথচ কয়েক প্রজন্ম ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষটি। কেউ বলেন, ভারতের কামরূপ-কামাখ্যা থেকে জাদুকররা গাছটি উড়িয়ে এনেছিলেন। কারও বিশ্বাস, কোনো এক অজানা পীর এর চারা রোপণ করেছিলেন। লোককথার এসব কাহিনির সত্যতা জানা না গেলেও গাছটি ঘিরে মানুষের বিস্ময় কমেনি। সবার কাছে এটি পরিচিত ‘অচিন গাছ’ নামে।
স্থানীয়দের ধারণা, গাছটির বয়স পাঁচ শতাব্দীরও বেশি। দীর্ঘ অনুসন্ধানে এর বৈজ্ঞানিক পরিচয় শনাক্তের দাবি উঠলেও জন্মরহস্য এখনো অমীমাংসিত। অন্যদিকে অযত্ন-অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষের চারপাশের অবকাঠামো। কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে রাজারহাট উপজেলার জয়দেব হায়াত গ্রামে মৃত দর্পণ নারায়ণের বাড়ির উঠানের পাশে গাছটির অবস্থান। বিশালাকার কাণ্ড, বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা আর সবুজ পাতায় ঘেরা বৃক্ষটি দূর থেকে দেখলে মনে হয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী যেন দুই হাত প্রসারিত করে আগলে রেখেছে চারপাশের জনপদ। গাছটি দেখতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসে মানুষ। কেউ দেখেন বিস্ময় নিয়ে, কেউ খোঁজেন এর অজানা ইতিহাস।
স্থানীয় প্রবীণদের ধারণা, গাছটির বয়স অন্তত ৫০০ বছর। তাদের পূর্বপুরুষরাও এর প্রকৃত পরিচয় জানতেন না। ব্রিটিশ আমল থেকেই এটি ‘অচিন গাছ’ নামে পরিচিত। একসময় গাছটির শাখা-প্রশাখা ১৫ থেকে ২০ শতক জমিজুড়ে বিস্তৃত ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। ডালপালার ঘনত্ব এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের বাড়িগুলোয় রোদ পড়ত না ঠিকমতো। সময়ের সঙ্গে কিছু ডালপালা ভেঙে যাওয়ায় গাছটির বিস্তৃতি কমেছে।
গাছটির বৈশিষ্ট্যও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। পাতাগুলো ডুমুর পাতার মতো হলেও মসৃণ। সারা বছরই গাছে সবুজ পাতা দেখা যায়। গাছে পাইকরের মতো গোলাকার ফল ধরে। তবে মাটিতে পড়ে থাকা ফল থেকে নতুন গাছ জন্মাতে দেখা যায় না বলে জানান স্থানীয়রা। একসময় গাছটিতে বিশাল আকৃতির বিষধর সাপ বাস করত-এমন গল্পও প্রচলিত রয়েছে। গাছটি ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত কাহিনিগুলোর একটি মংলু রামকে নিয়ে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, মংলু রাম নামের এক ব্যক্তি ভারতের কলতাপাড়া এলাকায় কাজ করতেন। সেখানে এক বৃদ্ধার নাতনির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পরে ওই বৃদ্ধা তাদের বাড়ি ফেরার জন্য একটি গাছ উপহার দেন। কথিত আছে, সেই গাছের ডালে তাদের বেঁধে দিলে রাতের আঁধারে গাছটি তাদের নিয়ে মংলু রামের বাড়িতে পৌঁছে যায়। সকালে গ্রামবাসী সেখানে বিশাল গাছটি দেখে বিস্মিত হন। গাছটির পরিচয় না জানায় তারা এর নাম দেন ‘অচিন গাছ’। গাছটির নাম থেকেই পরে এলাকার নামকরণ হয়েছে বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।
আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, আসাম রাজ্যের কামরূপ-কামাখ্যা থেকে একদল জাদুকর চোখের পলকে গাছটি উড়িয়ে এনে এখানে রোপণ করেন। অন্যদের ধারণা, কোনো এক অজানা পীর পশ্চিমদিক থেকে এর চারা এনে লাগিয়েছিলেন। এসব গল্পের কোনটি সত্য, তা জানা যায়নি। তবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকা এ কিংবদন্তি গাছটি ঘিরে মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অচিন গাছটি স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। গাছটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পূজা-অর্চনার স্থান। ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকাচার ও পারিবারিক স্মৃতির মেলবন্ধনে গাছটি হয়ে উঠেছে এলাকার ঐতিহ্যের অংশ।
দীর্ঘদিন গাছটির পরিচয় অনুসন্ধান করেছেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষক ও সাবেক অধ্যক্ষ এবং কুড়িগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যক্ষ মীর্জা মো. নাসির উদ্দিন। তার দাবি, নমুনা সংগ্রহ ও কয়েক বছরের অনুসন্ধানের পর তিনি গাছটির বৈজ্ঞানিক পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘গাছটি মরীচি পরিবারের ফিকাস গণভুক্ত।’
এদিকে রহস্যময় এই বৃক্ষের চারপাশের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৫ থেকে ১৬ বছর আগে রাজারহাট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গাছটির গোড়া পাকা করে বেঁধে দেওয়া হয়। পরে ২০১৬ সালে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এর চারপাশ সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। কিন্তু নিয়মিত পরিচর্যা ও সংস্কারের অভাবে সেই অবকাঠামোও এখন নষ্ট হওয়ার পথে।
রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের সহকারী অধ্যাপক এটিএম সাজেদুর রহমান মণ্ডল চাঁদের মতে, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় গাছটি সংরক্ষণে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
