সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক
প্রত্যাখ্যান কয়েক ছাত্র সংগঠনের
Advertisement
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির বৈঠক প্রত্যাখ্যান করেছেন কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতা এবং জুলাই আন্দোলনের অনেক সমন্বয়ক। বৈঠকে ৬২ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও অংশ নেন ৩১ জন। উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারাও। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর বিরোধিতা করে ছাত্রদল। অন্যদিকে সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রাখা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কয়েকজন ছাত্রনেতা। বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক বলে জানানো হয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির দশম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সদস্য চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল।
বৈঠকে আমন্ত্রিতদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, মাহিন সরকার, আবদুল হান্নান মাসউদ, রিফাত রশিদ, নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি, তরিকুল ইসলাম ও আরিফ সোহেল অংশ নেননি। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এসএম ফরহাদ, ছাত্রশক্তির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক তাহমীদ আল মুদাসসীর চৌধুরী এবং ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাছির আহমাদ ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদও বৈঠকে যাননি।
তাদের অভিযোগ, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাই এ ধরনের মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার যৌক্তিকতা নেই। বৈঠক বর্জনের বিষয়ে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম মঙ্গলবার ফেসবুক পোস্টে জানান, তিনি ও ডাকসু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী এ মতবিনিময় সভা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সহস্রাধিক শহীদের আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। নামমাত্র কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের জন্য এ গণ-অভ্যুত্থান হয়নি। সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার এক বিষয় নয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার ফেসবুক পোস্টে সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ লেখেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির নামে গণভোটে জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে যে প্রতারণা চলছে, এর অংশ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের এক বিবৃতিতেও বলা হয়, জনগণের রায় উপেক্ষা করে এ ধরনের মতবিনিময় সভা দেশ ও জাতির কল্যাণ বয়ে আনবে না। এ কারণে তারা বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।
বৈঠকে অংশ নেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাছির, ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক সানজিদা আহমেদ তন্বি ও সদস্য হেমা চাকমা, ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি তামজিদ হায়দার ও সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি সৈকত আরিফ ও ফারহানা মানিক মুনা, জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু, ছাত্র ফ্রন্টের সাবেক সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ফরিদ, এনপিএ-এর মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত এবং ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান।
সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাছির। তিনি বলেন, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয়।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে এভাবে আলোচনা করাও সমীচীন নয়। নোট অব ডিসেন্টসহ জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন তিনি। তার বক্তব্য, জনগণ বিএনপিকে নির্বাচিত করেছে এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য দলটিকে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট দিয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রাখা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এক ছাত্রনেতা। তার মতে, অতীতে ফ্যাসিবাদী সরকার জরুরি অবস্থাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে মানুষের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। হামলা বা মহামারির মতো পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। তাই সংবিধানে এ বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। আরেক ছাত্রনেতা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষা এবং গণহত্যার বিচারের বিধান সংবিধানে স্থায়ীভাবে রাখার প্রস্তাব দেন। অন্য একজন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জুলাই সনদে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা উল্লেখ না থাকলে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখার দাবিও জানান এক ছাত্রনেতা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মতো বিশেষ কমিটির বৈঠক সরাসরি সম্প্রচারের প্রস্তাব দেন তিনি।
সূত্র জানায়, বৈঠকে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গণভোটে শুধু জুলাই সনদের পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত ছিল। বিএনপির পক্ষ থেকেও এ ধরনের প্রশ্ন রাখার প্রস্তাব ছিল। তবে গণভোটে একাধিক প্রশ্ন রাখায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে সংবিধানে শিক্ষা ও চিকিৎসাকে মৌলিক অধিকার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা, জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা, গণ-অভ্যুত্থানের দাবি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই সনদের টেকসই বাস্তবায়ন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা এবং গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
