উত্তরাঞ্চলের চরবাসী
নদী কেড়ে নেয় ভিটে, ফের স্বপ্ন বোনে চরে
চরাঞ্চলের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমন্বিত উন্নয়নের জন্য পৃথক ‘চর মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবি * মৌলিক সেবা নিশ্চিতে কার্যকরী উদ্যোগ চান চরবাসী
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আজ যেখানে ঘর, কাল সেখানে নদীর পানি-এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা মানুষমারা চরে বসতি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নদীর বুকে জেগে ওঠে চর, সেই বালুচরে গড়ে ওঠে মানুষের বসতি। বালুময় জমিতে একসময় সবুজ হয়ে ওঠে ফসলের খেত, তৈরি হয় জীবিকার নতুন পথ। কিন্তু বর্ষার প্রবল স্রোত আর নদীভাঙনে সেই বসতিই আবার হারিয়ে যায়। আজ যেখানে ঘর, কাল সেখানে নদীর পানি-এমন অনিশ্চয়তার মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না। ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ নতুন চরে ঘর বাঁধেন, কেউ আবার কৃষিকাজে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। আশা আর নিরাশার এই লড়াই উত্তরাঞ্চলের চরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতা।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ, ছিনাই ও ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন থেকে চিলমারী, উলিপুর ও যাত্রাপুরের চরাঞ্চল-নদীবক্ষে জেগে ওঠা এসব ভূমিতে গড়ে উঠেছে বসতি। কোথাও ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, ধান ও পেঁয়াজের আবাদ, কোথাও গরু-ছাগল পালন ও দুগ্ধ খামারে তৈরি হচ্ছে জীবিকার সম্ভাবনা। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি রয়েছে নদীভাঙন, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও যোগাযোগের দুর্ভোগ।
রাজারহাট উপজেলার পাঁচটি চরের জনসংখ্যাই চরাঞ্চলের এই বাস্তবতার এক চিত্র। উপজেলা পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২২ সালের তথ্যানুযায়ী, বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের চর বিদ্যানন্দে জনসংখ্যা ২ হাজার ৮২২ জন এবং চর তৈয়বখাঁয় ৭১২ জন। ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ার চরে বসবাস করেন প্রায় ২ হাজার মানুষ। ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর খিতাবখাঁয় প্রায় ৬০০ এবং চর গতিয়াশামে প্রায় ৭০০ মানুষের বসতি। এ হিসাবে পাঁচটি চরে জনসংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৮৩৪ জন। এসব চরে কৃষিই জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। কৃষি ও পশুপালন তাদের সংসারে খাদ্যের জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। কোনো কোনো চরে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগও পৌঁছেছে। তবে মৌলিক সেবার চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়।
চরগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই। বিশুদ্ধ পানির নিরাপদ উৎস ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত নয়। কৃষি ও পশুপালনে সম্ভাবনা তৈরি হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ বাড়ানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চর বিদ্যানন্দের বাসিন্দা মনসুর আলীর জীবনেও রয়েছে এই আশা-নিরাশার হিসাব। চরবাসীর প্রত্যাশা, নিরাপদ বসতি, বিশুদ্ধ পানি ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলে তাদের জীবন আরও স্বস্তির হবে। সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ চান চরবাসী। উত্তরাঞ্চলের অন্য চরগুলোতেও জীবনসংগ্রামের গল্প প্রায় একই।
চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা মানুষমারার চরে বিভিন্ন এলাকার ভাঙনকবলিত প্রায় ৫০০ পরিবার বসতি গড়েছে। এ চরের সত্তরোর্ধ্ব কৃষক নজু মিয়ার উপলব্ধি, ‘এখানে আশা যেমন আছে, নিরাশাও আছে।’
নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমি হারানোর ভয় থাকলেও চর ছেড়ে সমতলে স্থায়ী হতে পারেননি তিনি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ার চরে রয়েছে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসতি। সেখানকার আশি বছর বয়সি ফজলু মুন্সীর অভিজ্ঞতায়, জীবনে সাতবার তাকে চর বদলাতে হয়েছে। আরেক বাসিন্দা মোকছেদ আলীর ভাষায়, কৃষক যেমন ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, চরবাসীরও তেমনি অনিশ্চয়তা-এই বর্ষায় ঘর থাকলেও পরের বর্ষায় নাও থাকতে পারে। তবে চরাঞ্চল এখন শুধু বালুচর নয়; অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন ক্ষেত্র।
উলিপুর উপজেলার চর বেগমগঞ্জে বিদ্যুৎ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাকেন্দ্র, দুগ্ধ খামার ও ছোট চালকল রয়েছে। চরাঞ্চলের কৃষকরা ভুট্টা, মরিচ, বাদাম, তিল, গম, পেঁয়াজ, রসুন ও মিষ্টি আলুর মতো ফসল উৎপাদন করছেন। পশুপালন ও দুগ্ধ খামারও তৈরি করছে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান প্রকৌশলী সরফরাজ বান্দার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম থেকে পাবনার ঢালারচর পর্যন্ত আট শতাধিক স্থানে চর জেগে উঠেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন গবেষণায় দেশে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ মানুষের চরে বসবাসের কথা বলা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই নদীভাঙনে গৃহহীন পরিবার। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, দেশে চর রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০টি। এসব চরের ভূমির পরিমাণ প্রায় ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট ভূমির প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে চর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্রজেক্ট (সিডিএসপি) সংশ্লিষ্ট জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু মনে করেন, চর জরিপ বিচ্ছিন্নভাবে হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান, ভূমি অফিসের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। চরাঞ্চলের সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমন্বিত উন্নয়নের জন্য পৃথক ‘চর মন্ত্রণালয়’ গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
নদী রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও’ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হক্কানী। পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর কার্যালয়ের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা অমূল্য রায়ের মতে, এ অঞ্চলের কৃষি নদীনির্ভর; নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়। নদীভিত্তিক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষার পাশাপাশি চরবাসীর জীবন-জীবিকার উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
