কপ-৩১ সম্মেলন শুরু ৯ নভেম্বর
সংকট মোকাবিলায় সহজলভ্য অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ
Advertisement
আলমগীর মিয়া
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উন্নত বিশ্ব অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে জলবায়ুর ঝুঁকি তৈরি করলেও তা নিরসনে নেওয়া উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী ৯ নভেম্বর থেকে তুরস্কের আনতালিয়ায় বসছে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১। আসন্ন সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘সহজলভ্য অর্থায়ন’ নিশ্চিত করাসহ ৪ বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। সরকারের বিভিন্ন সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, জলবায়ু সম্মেলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি বা ঝুঁকি নিরসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রত্যক্ষ হয়নি বিগত কপ সম্মেলনগুলোতে। বরং এ নিয়ে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ভূমিকায় হতাশ বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহ। তুরস্কের আনতালিয়ায় ৯ থেকে ২০ নভেম্বর এ সম্মেলনের মূল কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। এতে কনভেনশনের ৩১তম অধিবেশন-এর পাশাপাশি কিয়োটো প্রটোকলের ২১তম অধিবেশন এবং প্যারিস চুক্তির আওতাধীন পক্ষগুলোর ৮ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ জোরদার, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন কার্যক্রম, জলবায়ু অর্থায়ন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়তা বাড়ানোর বিষয়গুলো সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন ও ২০৩০ সালের আগে উচ্চাভিলাষী জলবায়ু পদক্ষেপ নিয়েও উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হতে যাচ্ছে ১১ ও ১২ নভেম্বরের বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলন। তুরস্কের প্রেসিডেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বনেতারা নতুন ও বাস্তবায়নযোগ্য জলবায়ু অঙ্গীকার ঘোষণা এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক গতি তৈরির সুযোগ পাবেন।
জানা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় চারটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে সরকার। প্রথমত, বৈশ্বিক নিঃসরণ আরও দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কমাতে হবে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করতে হবে। চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, উন্নত বিশ্ব অতিমাত্রায় কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি তৈরি করলেও তা নিরসনে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশ, বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানাবে। তিনি বলেন, আসন্ন কপ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘সহজলভ্য অর্থায়ন’ নিশ্চিত করাসহ ৪ বৈশ্বিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০০৯ সালে নিজস্ব অর্থায়নে জাতীয় জলবায়ু তহবিল গঠন করে এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এবারের সম্মেলনের আয়োজক তুরস্ক, দর-কষাকষির নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া, আর প্রাক-সম্মেলন বসছে প্রশান্ত মহাসাগরের দুই দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি ও টুভালুতে। আয়োজকরা একে বলছেন ‘বাস্তবায়নের সম্মেলন’, অর্থাৎ নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, পুরোনো অঙ্গীকার মাঠে নামানোর পালা। এই দুই ঘটনার সংযোগেই বাংলাদেশের এবারের অবস্থানের মূল সুরটি বাঁধা উচিত। সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা, পর্যবেক্ষক সংগঠন, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা আসন্ন কপ সম্মেলনে অংশ নেবেন। এরই মধ্যে এ অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশের জন্যও আনতালিয়া সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, অভিযোজন এবং উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত সহায়তা বাস্তবায়নের মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে আজারবাইজানের বাকুতে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৯) উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বার্ষিক ৩০ হাজার কোটি ডলার পাওয়ার প্রতিশ্রুতি মেলে। এই চুক্তি ২০৩৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়ন করার কথা।
বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩ হাজার কোটি ডলার (প্রায় ২৮ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখানো হয়েছে। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব অর্থে যে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড চালায়, সেটি পেয়েছে মাত্র ১০০ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক সরকারি জলবায়ু অর্থের বড় অংশও আসছে ঋণ হিসাবে। বাজেটে বন সৃজন, বায়ু ও প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্বন বাণিজ্য এবং ‘এক শিশু এক গাছ’ কর্মসূচির মতো উদ্যোগের কথা আছে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আসন্ন কপ সম্মেলন নিয়ে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র দুর্যোগ ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো কীভাবে আর্থিক সহায়তা পাবে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। তিনি বলেন, আমাদের তরফ থেকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় পরিবেশ দূষণ হ্রাস ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শহরাঞ্চলে বায়ুদূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক বাস চালুর পাশাপাশি এ ধরনের বাস আমদানিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে কর কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের উদ্ভাবনী ধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আরও কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
