চরাঞ্চলে প্রতিদিন গোলাগুলি
ঈশ্বরদীর অবৈধ বালু ব্যবসায় বিএনপির আধিপত্যের লড়াই
Advertisement
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর বালুমহাল ও অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে চলছে ব্যাপক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। বালুমহালের দখল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। এই আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতে এলাকায় ধাওয়া-পালটাধাওয়া ও প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন ও গুলিবর্ষণের কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক মহড়া, পালটাপালটি অভিযোগ এবং স্থানীয়দের তীব্র প্রতিবাদের কারণে এলাকায় চরম উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করছে। সোমবার রাতে বিএনপির একটি পক্ষের উদ্যোগে থানার সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে অপরপক্ষের কর্মীদের ওপর দোষ চাপিয়ে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে স্লোগান দেওয়া হয়েছে।
অনেকদিন ধরেই বালু উত্তোলন ও বালুবাহী নৌকা থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে চরম কোন্দল চলছে। সাঁড়া ঘাটের বালু ব্যবসায়ী ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার বিরুদ্ধে অন্য পক্ষ নদী ও তীরবর্তী স্থাপনা ধ্বংস করে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগ এনেছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষ একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যাচার বলে দাবি করেছে। এই বিরোধের জেরে উভয়পক্ষই এলাকায় পালটাপালটি বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে।
২৪-এর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঈশ্বরদীর সাঁড়া ঘাট, ইসলামপাড়া ঘাট, আরামবাড়িয়া এবং রূপপুর ফটু মার্কেটসংলগ্ন পদ্মা নদীর বালুমহালের আধিপত্য ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির দুটি গ্রুপ বিরোধে লিপ্ত রয়েছে। একটি পক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং রাতে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন সচল রাখার চেষ্টা করছে। স্থানীয়দের অভিযোগে এ চক্রের সঙ্গে ‘কাকন বাহিনী’ এবং আনারুল ইসলামের মতো ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে।
ঈশ্বরদীতে আধিপত্য বিস্তার ও বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বটি মূলত পাবনা জেলা বিএনপি এবং ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে বিভক্ত। সাঁড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও নবঘোষিত ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাক্কে মন্ডল এবং তার সহযোগীরা (যাদের মধ্যে আনারুল ইসলাম প্রমুখের নাম উঠে এসেছে) রাতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। তবে এই পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে একে রাজনৈতিক বিরোধ হিসাবে দাবি করেছে।
অন্যপক্ষ ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা জাকারিয়া পিন্টু। এলাকায় আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব পক্ষের প্রভাব খর্ব করতে তার অনুসারী ও যুবদল নেতারা (ঈশ্বরদী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সুলতান আলী টনি বিশ্বাস) বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য মাঠে সক্রিয় অবস্থান নিয়েছেন।
পদ্মা নদীর প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে (বিশেষ করে লক্ষ্মীকুণ্ডার ডিক্রির চর ও সাঁড়া এলাকা) বালুর রাজত্ব ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সরাসরি যে দুটি সশস্ত্র গ্রুপ গোলাগুলি ও মহড়ায় লিপ্ত রয়েছে তারা হলো-কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার চরমপন্থি নেতা হিসাবে পরিচিত মো. কাকনের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র। অন্যটি ঈশ্বরদী চরাঞ্চলের স্থানীয় সশস্ত্র দল বা কালু নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। এরা কাকন বাহিনীর বালু কাটার একক আধিপত্য ঠেকাতে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চরে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
এই রাজনৈতিক গ্রুপ ও সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ ও প্রকাশ্য বিরোধের কারণেই ঈশ্বরদীর সাঁড়া ঘাট, আরামবাড়িয়া ও রূপপুর এলাকার পদ্মা নদীতে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিরক্ষা বাঁধে ফাটলের শঙ্কা তৈরি হওয়ায় নিরাপত্তা চেয়ে ২৬ অক্টোবর আরামবাড়িয়া স্কুলপাড়া পদ্মার তীরে এলাকাবাসী গণস্বাক্ষর, মানববন্ধন ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।
বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিএনপি কর্মী পায়েল হোসেন রিন্টু জানান, বাঘার মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজের কাছ থেকে বালু আনার কারণে জামায়াতের ইলিয়াস ও তার লোকজন বিএনপির কতিপয় নেতার সঙ্গে মিলে জোর করে বালু বিক্রি করছে। এ কারনে দ্বন্দ্ব লেগে আছে। সোমবার রাতের গোলাগুলিতে আহত উপজেলার মাঝদিয়া খাঁপাড়া গ্রামের অয়ন (১৮), ঈশ্বরদী পৌর এলাকার আকাশ (২৬) ও মাঝদিয়ার সানোয়ার (৩০) জানান, এ ঘটনার জন্য কাকন বাহিনী ও সাঁড়ার জামায়াত নেতাকর্মীরা দায়ী।
এই উত্তেজনার মাঝে পাবনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জেলায় বর্তমানে কোনো ‘বৈধ বালুমহাল’ নেই। ফলে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত অবৈধ বালু উত্তোলনের সংবাদ আমলে নিয়ে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ও দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ আশাদুর রহমান জানান, দুষ্কৃতকারীদের ধরতে প্রায়ই আমাদের অভিযান চলমান আছে। নদীপথের নিরাপত্তা ফেরাতে এবং বালু উত্তোলন বন্ধে ১ নভেম্বর (শনিবার) লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌপুলিশ ও ঈশ্বরদী থানা-পুলিশের সমন্বয়ে পদ্মার চরে যৌথ অভিযান চালানো হয়। তবে অপরাধীরা পালিয়ে যাওয়ায় ঘটনাস্থল থেকে কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
