ঢাকা-কুয়াকাটা সড়ক
কম দূরত্বে বেশি টোল
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
টোলের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ঢাকা থেকে সড়কপথে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা যাওয়া পর্যটকসহ সাধারণ মানুষ। ২৮০ কিলোমিটার পথে যাত্রীবাহী বাস থেকে টোলের নামে ৮ হাজার ৪৬০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। একই হারে প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য যানবাহন থেকেও অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ কুয়াকাটার হোটেল-মোটেল মালিকসহ এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী নেতারা। নির্মাণ ব্যয় উঠে যাওয়ার পরও ছয়টি সেতু থেকে টোল আদায় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত অপ্রশস্ত সড়ক এবং অযৌক্তিক টোলের কারণে শিল্পমালিকরা এ অঞ্চলে কলকারখানা স্থাপন করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ অনেকের।
১৬ পয়েন্টে সাড়ে ৮ হাজার টাকা টোল: রাজধানী ঢাকা থেকে বাস, মাইক্রোবাস অথবা প্রাইভেট কারে চেপে বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা রওয়ানা হওয়ার পর প্রথম টোল দিতে হয় ধলেশ্বরী ব্রিজে। এরপর এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু, দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতু, দপদপিয়া সেতু, পায়রা সেতু, পটুয়াখালী সেতু, আন্ধারমানিক সেতু, হাজিপুর সেতু ও আলীপুর সেতুর টোল দিয়ে কুয়াকাটায় পৌঁছাতে হয়। এ রুটে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত যাওয়া-আসায় একটি প্রাইভেট কারকে ২ হাজার ৪৮০ টাকা টোল দিতে হয়। একইভাবে একটি মাইক্রোবাসের টোল বাবদ ৪ হাজার ২৩০ টাকা খরচ হয়।
যাত্রীবাহী বাসের ক্ষেত্রে টাকার অঙ্কে এ খরচ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪৬০। কারণ, সড়ক ও সেতু ছাড়াও বাসের কাছ থেকে সিটি করপোরেশন ও পৌর টোলের নামে বাড়তি ১ হাজার ১২০ টাকা আদায় করা হয়।
কুয়াকাটা-বরিশাল-রাজশাহী রুটে নিয়মিত আসা-যাওয়া করা বাসচালক কাইয়ুম হাওলাদার জানান, মহাসড়ক ধরে চলার সময় দেশের প্রায় কোথাও সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার নামে টোল দিতে হয় না। কিন্তু বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত প্রতিটি বাস থেকে যাওয়া-আসায় ৬ পয়েন্টে সিটি আর পৌর টোল নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রয়েছে হাইওয়ে আর ব্রিজগুলোর টোল।
কুয়াকাটা-কক্সবাজার রুটের বাসচালক আব্দুল হাই জানান, ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া-আসায় টোলবাবদ ৯২০ টাকা খরচ হয়। ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কে কেবল মেঘনা, গোমতী আর কর্ণফুলী নদীর সেতুতে আমরা টোল দিই। এ সড়কে সাংগু, চিরিংগা, মাজার পয়েন্ট, ইন্দ্রপুলসহ আরও বেশ কয়েকটি বড় সেতু থাকলেও সেসব সেতু থেকে কোনো টোল নেওয়া হয় না। অথচ ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত ২৮০ কিলোমিটার সড়কের প্রায় সব সেতু থেকে টোল নেওয়া হয়।
বাসচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের দূরত্ব ৪৯৪ কিলোমিটার। এ পথে ১৫শ টাকা টোল দিতে হয়। অথচ ঢাকা থেকে কুয়াকাটা রুটে প্রতিটি বাস থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
নির্মাণ ব্যয় উঠে যাওয়ার পরও ছয় সেতুতে টোল আদায়: ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথে এমন ছয়টি সেতু রয়েছে, যেগুলো বহু বছর আগে নির্মিত হয়েছে। এসব সেতুর নির্মাণব্যয় উঠে বিপুল অঙ্কের লাভসহ। তবুও সেতুগুলো পার হতে টোল দিতে হয়। এ সড়কের দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতুর উদ্বোধন হয় ২০০৩ সালে। ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু থেকে ৩০০ কোটি টাকা আয় করেছে সরকার। এরপরও বন্ধ হয়নি টোল আদায়।
একইভাবে ২০০১ সালে উদ্বোধন হওয়া পটুয়াখালী সেতু, ২০১১ সালে উদ্বোধন হওয়া দপদপিয়া সেতু, ২০১৫ সালে চালু হওয়া আলীপুর সেতু এবং ২০১৬ সালে উদ্বোধন হওয়া কলাপাড়া ও হাজীপুর সেতুর নির্মাণ ব্যয় উঠে গেছে বহু আগে। এরপরও এসব সেতু থেকে টোল আদায় নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের।
বরিশাল উন্নয়ন ও সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, নির্মাণ ব্যয় উঠে যাওয়ার পর কোনো সেতু থেকে টোল আদায় করতে পারে না সড়ক ও সেতু বিভাগ। এরপরও কেন এসব সেতু থেকে টোল আদায় হচ্ছে, বিষয়টি দেখা উচিত সরকারের। ঢাকা থেকে সড়কপথে দেশের আর কোনো বিভাগে যেতে এত টাকা টোল দিতে হয় না। কেন এ অযৌক্তিক টাকা দেব আমরা? একটি সড়ক দিয়ে কেবল কুয়াকাটা নয়, রাজধানীতে যাতায়াত করে বরিশাল অঞ্চলের ছয় জেলাসহ ৪৪ উপজেলার মানুষ। নির্মাণ ব্যয় উঠে যাওয়া ছয়টি সেতুর টোল আদায় বন্ধ হলে অনেক কম খরচে রাজধানীতে যাওয়া-আসা করতে পারব আমরা।
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী ও পরিবহণ মালিকরা : ঢাকা থেকে কুয়াকাটাসহ বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহণ করা ‘চেয়ারম্যান ট্রাভেলস’-এর মালিক অ্যাডভোকেট ইকবাল মাহমুদ লিটন বলেন, ঢাকা থেকে সীমান্তবর্তী বাংলাবান্ধার দূরত্ব ৪৭৪ কিলোমিটার। বাস ভাড়া ৮৫০ থেকে ১৩শ টাকা। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যেতেও প্রায় একই হারে বাস ভাড়া দিতে হয় পর্যটকসহ বরিশাল অঞ্চলের মানুষকে। অথচ এ পথের দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার। দূরত্ব প্রায় অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও দুই রুটের ভাড়া একই। কেন এ বৈপারীত্য, তা সড়ক বিভাগ ভালো বলতে পারবে।
ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা, টোয়াকের প্রেসিডেন্ট রুম্মন ইমতিয়াজ তুষার বলেন, অযৌক্তিক টোলের কারণে পর্যটকসহ সাধারণ মানুষকে বাড়তি বাস ভাড়া দিতে হয়। এ কারণে আশানুরূপ পর্যটক পাওয়া যায় না। এ কারণে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, কেবল সহজ যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে একটি অঞ্চল জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে। ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়ক ৬ লেন হচ্ছে না। এছাড়া ঢাকায় যেতে দেশের যে কোনো এলাকার তুলনায় সবচেয়ে বেশি সড়ক আর সেতুর টোল দিতে হয় আমাদের। এতে শিল্পমালিকরা যেমন এ অঞ্চলে কলকারখানা করার আগ্রহ পাচ্ছেন না, তেমনি পিছিয়ে থাকছে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা আর সমুদ্রবন্দর পায়রা। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় ভোলার গ্যাস নেওয়া যাচ্ছে না রাজধানীসহ দেশের অন্য অঞ্চলে। সরকারের কাছে দাবি, ভাঙ্গা-কুয়াকাটা সড়ক ৬ লেন করা এবং ভোলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনসহ অযৌক্তিক টোল কমানোর ব্যবস্থা নিন। তাহলে জাতীয় অর্থনীতিতে বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি অবদান রাখবে বরিশাল।

