হবিগঞ্জের ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল
টং দোকান থেকে শত কোটি টাকার মালিক!
মাহবুবুর রহমান রিপন, সিলেট
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে বিপুল অর্থের লেনদেন, বিদেশে অর্থ পাচার এবং অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জের রুবেল মিয়া (৩৭) নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে স্থানীয়ভাবে তাকে ‘ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল’ নামে অভিহিত করা হয়।
সম্প্রতি ডিজিটাল ডিভাইস ও ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আমেরিকান কোম্পানির প্রলোভন দেখিয়ে ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার পল্টন মডেল থানায় তার বিরুদ্ধে একটি প্রতারণা মামলা হয়েছে। এ মামলার অন্যতম আসামি হবিগঞ্জের রুবেল মিয়া। মামলায় তাকে বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণাচক্রের ‘এশিয়া অঞ্চলের কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
মামলার পরই দুবাই পালিয়ে যাওয়ার সময় ২ অক্টোবর সন্ধ্যায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে হবিগঞ্জে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
সবশেষ পল্টন থানার ডিজিটাল প্রতারণা মামলায় তাকে হস্তান্তর করে হবিগঞ্জ পুলিশ। বর্তমানে মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয়েছে ডিএমপির ডিবি দক্ষিণ বিভাগকে। ডিবি দক্ষিণ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মামলায় উল্লিখিত শুধু একটি অ্যাপ নয়, কিছুদিন পরপরই নতুন নতুন অ্যাপ দিয়ে এই জুয়া চলছে। সব অ্যাপই রুবেলের নিয়ন্ত্রণে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে বলে জানান তিনি।
এর আগে বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার মূল হোতা হিসাবে ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি ডিএমপির সিটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট তাকে গ্রেফতার করে এবং সেই মামলায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। পরে কৌশলে জামিনে বের হয়ে আবারও একই কায়দায় সারা দেশে অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ উঠেছে রুবেলের বিরুদ্ধে।
দেশের অনলাইন জুয়ার মূল হোতা গ্রেফতার হওয়ার পর সিলেটজুড়ে শুরু হয় তোলপাড়। রুবেল মিয়ার অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানে নামে যুগান্তর। হবিগঞ্জের সদর উপজেলার শরীফপুর গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১২ সালেও রুবেল মিয়ার বাবা আব্দুল লতিফ ছিলেন দিনমজুর।
স্থানীয় লস্করপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. উজ্জ্বলের সঙ্গে কথা হলে রুবেল সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রুবেলের বর্তমান জীবনযাপন যেন আলাদিনের চেরাগের গল্পকেও হার মানায়। গ্রামের সবাই দেখেছে, যে ছেলেটি কয়েক বছর আগে গ্রামের দোকানে চায়ের স্টল দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত, বাবা ভ্যান চালাত; সে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পাহাড়সমান টাকার মালিক হয়েছে। তার হঠাৎ এই উত্থান দেখে অনেক আগে থেকেই এলাকার উঠতি বয়সিরা ঝুঁকেছে অনলাইন জুয়ায়। সেটা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’ রুবেলের সম্পদ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যা এই মুহূর্তে এলাকায় দৃশ্যমান তাতেও প্রায় শতকোটি টাকা হবে।
সরকারের সংস্থাগুলো তদন্ত করলে অদৃশ্য আরও কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ খুঁজে পাবে।’ রুবেল বেশির ভাগ সম্পদ দুবাইয়ে পাচার করেছেন এবং সেখানে বসেই দীর্ঘদিন অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে জানান তিনি।
ক্যাসিনো রুবেলের যত সম্পদ : স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রার অফিসে ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল ও তার পরিবারের সম্পদের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, ৫ বছরে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় যে সম্পত্তি কেনা হয়েছে তার বাজারমূল্য শতকোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে রয়েছে সুলতানশী মৌজায় ২০১৯ সালে ১৬০০ নম্বর দলিলে ৯ শতক, ২০২১ সালে ৩৮২৯ নম্বর দলিলে ১০ শতক, ২০২২ সালে ৭৪১৫ ও ৫১১৫ নম্বর দলিলে যথাক্রমে ৪৬.৮ শতক ও ১০ অযুতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৫৬৩৪ ও ৫৬৩৫ নম্বর দলিলে ২৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করেন। এছাড়া সুলতানশী মৌজায় শুধু রুবেলের নামেই ১৫ বিঘা এবং তার ভাই সোহাগসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে আরও ১৭ বিঘা জমি রয়েছে।
পাশাপাশি যমুনাবাদ মৌজায় ২০২২ সালে ৪৬১৮ নম্বর দলিলে ১৫ শতক, দারিয়া মৌজায় ১ একর ৭৬ শতক জমি এবং আনন্দপুর পৌরসভা এলাকায় ২০২৪ সালে ১৪০৩ নম্বর দলিলে ১১.৭২ শতক জমিসহ বাড়ি কেনা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, কটিয়াদী বাজারে ১০ শতকের ওপর একটি বিলাসবহুল মার্কেট, শ্রীমঙ্গলে পল্লীবিদ্যুতের কাছে ৮ শতকের ওপর ৪ তলা চার ইউনিট ভবন ও রেলগেটের কাছে ১০ শতকের ওপর ৩ তলা ভবন, হবিগঞ্জ ইনাতাবাদ পৌরসভায় ১১ শতক, পুরাতন মুন্সীতে ৮ শতক জমি এবং প্রায় ১৫ কাঠা জমির ওপর দুটি নির্মিত বাড়ি।
এছাড়া ঢাকায় মতিঝিল ও উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। নিজ গ্রামে বিশাল অট্টালিকা, বিলাসবহুল গাড়ি, শ্রীমঙ্গলে শত বিঘার বেশি জমির ওপর রিসোর্ট এবং দুবাইয়ে বিলাসবহুল বাংলো, সুপার শপ, হোটেল ও ক্যাসিনো ব্যবসার মাধ্যমে দেশ-বিদেশে এক বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য ও সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, সম্পত্তির সঠিক মূল্য নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দলিল, রেজিস্ট্রি মূল্য, বাজারমূল্য এবং মালিকানার তথ্য চাইলে আমরা সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে দাখিল করব। তবে এসব সম্পত্তির বাজারমূল্য শতকোটি টাকার ওপরে হবে বলে তারা জানান।
২৯ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় মামলার বাদী মো. আকবর হোসেন এজাহারে উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ২২ জুন থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আসামিরা তাকে নানাভাবে প্রলোভন দেখান। অভিযুক্তরা harrywinstongold.vip নামের একটি ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিজেদের আমেরিকান কোম্পানির প্রতিনিধি হিসাবে পরিচয় দিয়ে বাদীর কাছ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। মামলার বাদী আকবর হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রুবেল পুরো দেশের অনলাইন ‘জুয়ার ব্যবসা’ নিয়ন্ত্রণ করছেন। সব অর্থ বিদেশে পাচার করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন-রাজধানীর উত্তর বাড্ডার মো. ইকবাল আশরাফ ওরফে ক্যাসিনো ইকবাল, গাজীপুরের তাসনুভা নওরিন সানজানা ওরফে শারমিন জাহান তিশা, হবিগঞ্জ সদরের শরীফপুর গ্রামের মো. রুবেল মিয়া ওরফে ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল, কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার জুয়েল রানা, চুয়াডাঙ্গার মো. সুজন, হবিগঞ্জের সুলতানশী গ্রামের ময়নুল হাসানসহ অজ্ঞাতনামা ৫/৬ জন। এদের মধ্যে রুবেল মিয়াকে এ মামলায় ‘এশিয়া অঞ্চলের কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
তাদের মধ্যে হবিগঞ্জের ময়নুল হাসান ওরফে দুলাল রুবেলের স্থানীয় সহযোগী হিসাবে পরিচিত। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বাগিয়ে নিয়েছিলেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের পদও। যদিও এসব অভিযোগে সম্প্রতি তার নিয়োগ বাতিল করে আইন মন্ত্রণালয়। পুলিশের খাতায় এখনো তিনি পলাতক। এছাড়া রুবেলের ভাই মো. সোহাগ মিয়া ওরফে মাদক্কা ক্যাসিনো সোহাগ নামে এলাকায় পরিচিত। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার ও অনলাইন জুয়া ও মাদক চোরাচালান পরিচালনা করছেন তিনি। সোহাগ ক্যাসিনো রুবেলের প্রধান সহযোগী।
রুবেল ছিলেন আবু জাহিরের অর্থ জোগানদাতা: স্থানীয়রা জানান, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রুবেল মিয়া ছিলেন তৎকালীন সংসদ-সদস্য আবু জাহিরের অর্থ জোগানদাতা। নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসাবে পরিচয় দিতেন। গত জুলাই আন্দোলনে একটি হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়। রুবেলের এসব অপরাধ ও তার সহযোগীরা বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকার বিষয়ে কথা হয় হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ-সদস্য ও হুইপ জিকে গউছের সঙ্গে।
তিনি বলেন, রুবেল মূলত আওয়ামী লীগের এমপির শেল্টারেই এসব অপরাধ করে আসছিলেন। বিষয়টি পুরো হবিগঞ্জের মানুষ জানে। বর্তমান সরকারের সময় এসব অপরাধী কোনোভাবেই পার পাবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অনলাইন জুয়ার মতো জঘন্য অপরাধ যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা যে দলেরই হোক তাদের যে কোনো মূল্যে গ্রেফতার করতে হবে। রুবেলের সহযোগী ময়নুল হাসান ওরফে দুলালের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নেবে না। ইতোমধ্যে তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
