ঠাকুরগাঁওয়ে তালিকাভুক্ত ৩১ জনের ২৮ জনই দলীয়
বিএনপির ৯ নেতার স্ত্রী ও ৪ জনের সন্তান সারের ডিলার
এটিএম সামসুজ্জোহা, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঠাকুরগাঁওয়ের চার উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় নিয়োগ পাওয়া ৩১ জন ডিলারের মধ্যে ২৮ জনই বিএনপি-সংশ্লিষ্ট। দলের পদধারী নেতাদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রী, ভাই ও সন্তানরাও এ তালিকায় রয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তাদের অনেকেরই সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি কয়েকজনের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদামও নেই। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করে আসা অভিজ্ঞ ও প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন। এতে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ী মহলে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার ৪ নভেম্বরের এক চিঠির মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। জেলার চারটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় নতুন ডিলার নিয়োগ পান। এর মধ্যে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন, রানীশংকৈল উপজেলার একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন, হরিপুর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন এবং পীরগঞ্জ উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে এই ৩১ জন ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন। তবে নির্বাচন-সংক্রান্ত জটিলতায় সদর ও নবগঠিত দুটি উপজেলায় ডিলার নিয়োগ আপাতত স্থগিত রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই প্রাধান্য পেয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন সরাসরি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। হরিপুর উপজেলার ভাতুরিয়া ইউনিয়নের ডিলার হয়েছেন জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা পারভীন। নিয়োগ পেয়েই তিনি দোকান কিনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছেন। এছাড়া ৯ জন বিএনপি নেতার স্ত্রী, চারজন সন্তান, দুই ভাই, একজন নিকটাত্মীয় ও তিনজন স্থানীয় সংসদ-সদস্যের ঘনিষ্ঠজন রয়েছেন। তালিকায় ছাত্রদল, তাঁতি ও ওলামা দলের নেতারাও আছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী, একই পরিবারের একাধিক সদস্য ডিলার হতে পারবে না। অথচ নিয়মবহির্ভূতভাবে হরিপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরের ছেলে মশিউর রহমানও ডিলারশিপ পেয়েছেন। আবু তাহেরের ছোট ভাই ও মেসার্স লুৎফর রহমানের প্রোপ্রাইটর আব্দুর বশির বহু আগে থেকেই সারের ডিলার। এ বিষয়ে আবু তাহের দাবি করেন, তার ছোট ভাই ও ছেলের আলাদা সংসার এবং তারা আলাদা মৌজায় বসবাস করেন। তাই নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটেনি।
এদিকে, বাকি ডিলারদের মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওয়ার্ড পর্যায়ে নানা পদপদবিতে থাকা ব্যক্তিও রয়েছেন। এই তালিকায় রাজনীতির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই এমন ব্যক্তির সংখ্যা মাত্র দুজন।
যারা আছেন তালিকায় : পীরগঞ্জ পৌরসভায় সার ডিলার হিসাবে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজওয়ানুল হকের স্ত্রী শ্যামলী আক্তার। উপজেলার ভোমরাদহ ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেনের স্ত্রী রেনুয়ারা বেগম। কোষারানীগঞ্জ ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মেজবাহুল পারভেজ। খনগাঁও ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রুস্তম আলীর স্ত্রী মিরা আক্তার। পীরগঞ্জ ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদের মেয়ে শবনম মুস্তারী সিনথিয়া, হাজীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলামের স্ত্রী ফেরদৌসি বেগম এবং দৌলতপুর ইউনিয়নে সংসদ-সদস্য জাহিদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত মোজাফর রহমান সার ডিলার হয়েছেন। এ ছাড়া সেনগাঁও ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাফফর রহমান, সৈয়দপুর ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রদল নেতা ফরহাদ হোসেন, জাবরহাট ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহিদুর রহমানের ছেলে আহমেদ আব ইয়াজ এবং বৈরচুনা ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সমর্থক লুৎফর রহমান সারের ডিলার হিসাবে মনোনীত হয়েছেন।
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার পারিয়া ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক আরফান আলীর স্ত্রী নাজনীন বেগম। ধনতলা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সেলিম জাবেদের স্ত্রী সাবিনা আক্তার, বড় পলাশবাড়ী ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেন, দুওসুও ইউনিয়নে তাঁতি দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী এবং ভানোর ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য রফিকুল ইসলাম ডিলার হয়েছেন। আমজানখোর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মাসুদের বড় ভাই জহিরুল হক ও বড়বাড়ী ইউনিয়নে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জুলফিকার আলীর স্ত্রী নুরজাহান আক্তার ডিলার হয়েছেন।
রানীশংকৈল উপজেলার রাতোর ইউনিয়নে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিলন মাহমুদের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিএস ট্রেডার্স ডিলারশিপ পেয়েছে। রানীশংকৈল পৌরসভায় সারের ডিলার হয়েছেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলীর স্ত্রী পারুল বেগম। ধর্মগড় ইউনিয়নে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জামাল উদ্দিন ডিলার হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন। হোসেনগাঁও ইউনিয়নে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নাজির হোসেন, লেহেম্বা ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থিত সাবেক চেয়ারম্যান মো. হাসানের মেয়ে মিথিলা সানজিদা সিমি, কাশিপুর ইউনিয়নে ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী ময়না আক্তার এবং নন্দুয়ার ইউনিয়নে কেন্দ্রীয় যুবদলের সহসভাপতি কামাল আনোয়ার আহাম্মদের খালাতো ভাই রকিবুল হাসান ডিলার হয়েছেন। বাচোর ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন মালিক রতন রায়। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে জানা গেছে।
হরিপুর উপজেলার গেদুরা ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন সায়েদ আলী। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। আমগাঁও ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরের ছেলে মশিউর রহমান ডিলার হয়েছেন। ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি করিমুল হক, হরিপুর ইউনিয়নে উপজেলা ওলামা দলের সভাপতি দরিবুল ইসলাম ও ভাতুরিয়া ইউনিয়নে জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা পারভীন ডিলার হয়েছেন।
কৃষক ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র ক্ষোভ : রানীশংকৈল উপজেলার বটতলী বাজারের এক সার ব্যবসায়ী বলেন, দলীয় বিবেচনায় অযোগ্য ব্যক্তিদের সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের মনোনীত করা হয়েছে, তাদের অনেকের অভিজ্ঞতা নেই, গুদামও নেই।
জাতীয় কৃষক সমিতির নেতা মোহাম্মদ জুয়েল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের ফলে একদিকে কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে সার সরবরাহের ক্ষেত্রে এক ধরনের শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা : ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, দীর্ঘদিন দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন তাদের অনেকে ব্যবসায় মনোনিবেশ করছেন। ডিলার নিয়োগে দলের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব ছিল না।
ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ-সদস্য ডা. আব্দুস সালাম বলেন, যারা ডিলার হিসাবে নিয়োগ পাননি, তারা এখন নানা কথা বলছেন। সারের ডিলার নিয়োগ ইউএনও ও কমিটির মাধ্যমে হয়েছে, অনিয়ম হলে সেটি তাদের দায়।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ডিলারদের আবেদন উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পরামর্শক্রমে নীতিমালার আলোকেই কমিটি সুপারিশ করেছে এবং মন্ত্রণালয় তা অনুমোদন করেছে। এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি।
