সংকটেও মিলছে না ৪৮১৩ কোটি টাকা
দুর্বল ব্যাংকে বিপিসির এফডিআর কার স্বার্থে
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এর আওতাধীন কোম্পানিসমূহের ৪ হাজার ৮১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) নিয়ে তদন্ত শুরু হচ্ছে। দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকে কীভাবে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ রাখা হলো; এর নেপথ্যে কারা ছিলেন; এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঘুস বা আর্থিক লেনদেন হয়েছে কিনা, সেসব বিষয়ে তদন্ত করতে ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে চারটি নির্দেশনা দিয়ে এক মাসের মধ্যে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ৩ নভেম্বর বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানার স্বাক্ষরে তদন্ত কমিটি গঠন-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে শাহিনা সুলতানা রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আমরা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটি শিগগিরই বৈঠকে বসে নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম শুরু করবে।’ কমিটির প্রধান করা হয়েছে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) নাজনিন পারভীনকে। অন্য সদস্যরা হলেন-বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) রেজা মো. জিয়াউদ্দিন, পদ্মা অয়েলের উপমহাব্যবস্থাপক (নিরীক্ষা) মো. শফিউল আজম, ইস্টার্ন রিফাইনারির সহমহাব্যবস্থাপক (কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট) কবির উদ্দিন আহাম্মদ, যমুনা অয়েলের ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস) মোহাম্মদ আবু সাইদ ও বিপিসির ব্যবস্থাপক (হিসাব/ফান্ড) আল আমীন।
কমিটিকে যে চারটি বিষয়ে তদন্ত করে সুপারিশ ও প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে এর মধ্যে রয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায়, কার সুপারিশে এবং কী উদ্দেশ্যে সংকটাপন্ন ব্যাংকগুলোতে অর্থ জমা রাখা হয়েছিল তা উদ্ঘাটন করা। যদি ব্যক্তি স্বার্থ, ঘুস বা কোনো অনৈতিক লিয়াজোঁর মাধ্যমে (অস্বাভাবিক উচ্চ সুদের প্রলোভন দেখিয়ে কমিশন বাণিজ্য) ডিপোজিট রাখা হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে। দেশের সংকটাপন্ন বেসরকারি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) হিসাবে বিপিসি ও এর আওতাধীন কোম্পানিসমূহের মোট ৪ হাজার ৮১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা নগদায়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করতে হবে। কোম্পানিসমূহের স্থায়ী জামানতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্যাংকের স্থিতি বিবেচনায় সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ব্যাংকে জামানত রাখার বিষয়ে সুপারিশ করতে হবে। কমিটি গঠনের তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে বিপিসি চেয়ারম্যান বরাবর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেল বিক্রির কারণে বিপিসি বর্তমানে বড় ধরনের অর্থ সংকটে পড়েছে। যে মুহূর্তে বিপিসির অর্থের খুব বেশি প্রয়োজন হচ্ছে ঠিক সে মুহূর্তে সংস্থাটি বিভিন্ন ব্যাংকে জমা বা এফডিআর করে রাখা অর্থ নগদায়ন করতে পারছে না বা ফেরত পাচ্ছে না। এর মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক তথা একীভূত পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকেই সংস্থার আওতাধীন কোম্পানি সমূহের ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। দুই বছর ধরে চেষ্টা করেও এই টাকা নগদায়ন করতে পারছে না বিপিসি। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বাইরে আরও কয়েকটি দুর্বল ও সংকটাপন্ন ব্যাংকে ৫০০ কোটি টাকার মতো আটকে গেছে। বিপুল পরিমাণ এই টাকা আটকে যাওয়ার কারণে বিপিসি জ্বালানি তেল আমদানির বিপরীতে টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। অবরুদ্ধ হয়ে পড়া টাকা ফেরতে বিপিসি বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থও হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই আটকে যাওয়া টাকা ফেরত পাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিপিসি সাধারণত দুই মাসের চাহিদার জ্বালানি তেলের মূল্য চলতি মূলধন হিসাবে সংরক্ষণ করে রাখে। বর্তমান চাহিদা ও বাজারদর অনুযায়ী এই টাকার পরিমাণ ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বিপিসির প্রদত্ত এক চিঠিতে উঠে আসে বিপিসির বর্তমান অর্থ সংকটের বিষয়টি। সেপ্টেম্বরে দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, গত মার্চের প্রথম দিকে বিপিসির হাতে ৩৭ হাজার ২৮৭ কোটি ১২ লাখ টাকা জমা ছিল। আমদানির বিপরীতে বিল পরিশোধের কারণে সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে বিপিসির ব্যাংক স্থিতির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার কিছু বেশি। দুই মাসের জ্বালানি তেলের মূল্য বাবদ যে টাকা প্রয়োজন তার চেয়ে কম। আবার এই টাকার মধ্যেও ১ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার বেশি বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে অবরুদ্ধ বা আটকে আছে। যেগুলো নগদায়ন করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ বিভিন্ন ব্যাংকে জমা থাকা অর্থের মধ্যে চলতি মূলধন হিসাবে ব্যবহারযোগ্য অর্থ রয়েছে মাত্র সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, মূলত চরম এই অর্থ সংকটের কারণেই বিগত সময়ে কীভাবে, কার ইন্ধনে বা কাদের স্বার্থে বিপিসি ও আওতাধীন কোম্পানির বিপুল পরিমাণ অর্থ দুর্বল ব্যাংকে রাখা হয়েছে, এতে কারা লাভবান হয়েছেন। কর্মকর্তাদের মধ্যে কাদের দায় আছে, তা খুঁজে বের করতে চায় মন্ত্রণালয়। ভবিষ্যতে যাতে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের তহবিল যেনতেনভাবে ব্যবহার না হয়, সেই পথও বের করতে চায় সরকার। এর অংশ হিসাবেই বিপিসি ৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার এফডিআর নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে জানা গেছে।

