শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেসা
কুমিল্লায় নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানীর বাড়ি -সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নারী নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছিলেন শিক্ষা-সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত। ঊনবিংশ শতকের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি নারী শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা এবং সমাজ সংস্কারে অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। কেবল জমিদারি পরিচালনা কিংবা আরাম-আয়েশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম ও একমাত্র নারী নবাব হিসাবে তিনি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। ব্রিটিশ রাজমুকুট থেকে ‘নবাব’ উপাধি লাভ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন এ মহীয়সী।
১৮৩৪ সালে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁওয়ের সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী এবং মা আরাফান্নেসা চৌধুরানী। মোগল রাজত্বের উত্তরসূরি এই পরিবারে কন্যাসন্তান হলেও বাবার অদম্য উৎসাহে গৃহশিক্ষকের অনুশাসনে তিনি বাংলা, আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে মহারাণী ভিক্টোরিয়া তার সমাজসেবা ও নারীশিক্ষায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নবাব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম এবং একমাত্র নারী ‘নবাব’।
শিক্ষাবিস্তারের আলোকবর্তিকা : নবাব ফয়জুন্নেসার একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হলো পর্দানশীন নারী থেকে শুরু করে সমাজের অবহেলিত সবাইকে আলোর পথ দেখাতে তিনি বহুমুখী পদক্ষেপ নেন। ১৮৭৩ সালে তিনি কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও এবং কুমিল্লা শহরে নিজ উদ্যোগে মেয়েদের জন্য বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে এটি কলেজে রূপান্তরিত হয়ে বর্তমান ‘নবাব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজ’ নামকরণ হয়। প্রতিষ্ঠানটি এখন শিক্ষাবিস্তারের আলোকবর্তিকা। মেয়েদের আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসারে তিনি একটি অবৈতনিক মাদ্রাসা এবং নিজের জমিদারির ১৪টি মৌজায় ১৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। ১৮৯৩ সালে পর্দানশীন ও অসহায় দরিদ্র নারীদের উন্নত চিকিৎসার কথা চিন্তা করে তিনি কুমিল্লা শহরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফয়জুন্নেসা জেনানা হাসপাতাল’ ও দাতব্য চিকিৎসালয়। ডাকাতিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, রাস্তাঘাট ও দিঘি-পুকুর খনন এবং মুসাফিরখানা নির্মাণ ছাড়াও তিনি নবাববাড়ি সংলগ্ন একটি সুদৃশ্য ১০ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন, যা মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন।
সাহিত্যকর্মে অসামান্য প্রতিভা : সমাজসেবার পাশাপাশি সাহিত্য সাধনায়ও তিনি রেখে গেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ও উপন্যাস ‘রূপজালাল’ বাংলা সাহিত্যে কোনো মুসলিম নারীর লেখা প্রথম উপন্যাস হিসাবে সমাদৃত। এছাড়া তার অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘সঙ্গীত লহরী’ ও ‘সঙ্গীত সার’। ব্যক্তিগত জীবনের নানা ট্র্যাজেডি ও বেদনার ছায়া ওই উপন্যাসের গল্পে ফুটে উঠলেও এর গদ্যশৈলী ও আত্মজৈবনিক সুর বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
১৯০৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এই মহীয়সী ইন্তেকাল করেন। লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ের নিজ বাড়িতে তাকে চিরশয্যায় শায়িত করা হয়। বাংলার নারীজাগরণ ও সমাজ সংস্কারে তার আজীবন অবদানের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে তাকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। পশ্চিমগাঁওয়ের ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা। এখানে প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে বহু পর্যটক ভিড় জমান।
ফয়জুন্নেসার আদর্শ ধরে রাখছে ফাউন্ডেশন : নবাব ফয়জুন্নেছা ফাউন্ডেশনের সভাপতি সৈয়দ ফজলে ইলাহী ফয়সাল বলেন, তিনি ছিলেন শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের অগ্রদূত। ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আজাদ সরকার লিটন বলেন, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী ছিলেন একজন উদারপন্থি। জীবনের পুরো সময় মানবসেবায় কাজ করে গেছেন। ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি সাকিনা বেগম বলেন, নবাব ফয়জুন্নেছার স্মৃতি ও সমাজসেবামূলক আদর্শ ধরে রাখতে ১৯৯৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাউন্ডেশনটি যাত্রা শুরু করে। আমরা এ মহীয়সীর জীবনকর্ম অনুসরণ করে তার কর্মযজ্ঞ মানুষের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার বলেন, নবাব ফয়জুন্নেসার স্মৃতি সংরক্ষণ ও তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে দেখভাল করা হচ্ছে।

