Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

সময়ের সুরে ভাসা জীবনের শব্দ

Advertisement

Icon

স্বর্ণপ্রভা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

গান। বেশির ভাগ মানুষেরই প্রাণের ভেতরকার না-বলা অনুভবের ভাষা। কারও গানের কথা ভালো লাগে, কারও বা সুর। কেউ কাজ শেষ করে গান শুনতে বসেন, আবার কেউ গান শুনতে শুনতেই কাজ করেন। কেউ গান থেকে উদ্দীপনা ও প্রেরণা পান, কেউ বা মনের গভীরে হারান। গান ভাবায়, গান কাঁদায়, আবার কিছু কিছু সময় গানই হাসায়। গান মনকে ভারী করে, আবার গানই পারে মনকে একটু হালকা করতে। জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপের জন্যই যেন কোনো না কোনো গান তৈরি হয়ে আছে। আনন্দের গান আছে, দুঃখের গান আছে, প্রেমের গান আছে, বিচ্ছেদের গান আছে, বর্ষার গান আছে, বসন্তের গান আছে। এমনকি এমন গানও আছে, যা শুনলে মনে হয়, এই গানটি যেন ঠিক আমার জন্যই লেখা হয়েছিল।

আমাদের জীবনের সঙ্গে গান এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে যে, অনেক সময় আমরা গান শুনি না, বরং গানের মধ্যে নিজের জীবনটাকেই আবিষ্কার করি। কোনো একটি গানের লাইন হঠাৎ বহু বছরের পুরোনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। কোনো সুরে অকারণে মন ভালো হয়ে যায়। আবার কোনো গান দূরে কোথাও বাজতে শুনে পুরোনো কোনো মানুষ, কোনো বিকেল, কোনো বিচ্ছেদ কিংবা কোনো অপূর্ণতার কথা মনে পড়ে যায়। কারণ গান শুধু সুর নয়। একটি গান তৈরি হয় কথা, সুর এবং পরিবেশনের সম্মিলিত শিল্পে। এ তিনটির যে কোনো একটিতে যদি সাহিত্যবোধ, নান্দনিকতা কিংবা অনুভূতির ঘাটতি থাকে, তাহলে গানটি হয়তো জনপ্রিয় হতে পারে, শ্রুতিমধুরও হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ জীবনপ্রাপ্ত হয় না। আর এখানেই আসে গানের সাহিত্যমূল্য বিচারের প্রশ্ন।

গান কী সাহিত্য? শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু গানের কথা একবার সুর থেকে আলাদা করে পড়লে বোঝা যায়, অনেক গানের লিরিক আসলে কবিতার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে, কিংবা বলা যায় প্রত্যেক গানের লিরিকই একটা করে কবিতা। সেখানে উপমা আছে, রূপক আছে, চিত্রকল্প আছে, প্রতীক আছে, আবেগ আছে, কখনো দর্শনও আছে। তবে গানের সাহিত্য কবিতার মতো একা হাঁটে না। সে হাঁটে সুরের হাত ধরে। ফলে গানের সাহিত্যিক মূল্যমান বিচার করতে হলে শুধু শব্দ সুন্দর কি না, তা দেখলেই হবে না; দেখতে হবে শব্দ ও সুর একে অপরকে কতটা সম্পূর্ণ করছে। গানের সাহিত্যিক মূল্যমান বিচার করতে গেলে ভাষার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো গান শুধু ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলে না; বরং বোঝায় ভালোবাসা কেমন। সে অপেক্ষাকে দৃশ্যমান করে, অনুপস্থিতিকে শ্রাব্য করে, স্মৃতিকে স্পর্শযোগ্য করে তোলে। কখনো একটি ছোট্ট উপমা পুরো সম্পর্কের ইতিহাস বলে দেয়। কখনো একটি অসম্পূর্ণ বাক্য পূর্ণ বাক্যের চেয়ে বেশি অনুভূতি তৈরি করে। সাহিত্যিক শক্তি অনেক সময় শব্দের জটিলতায় নয়, অনুভূতির গভীরতায়। ‘তুমি আছো’ একটি অত্যন্ত সহজ বাক্য। কিন্তু সেই বাক্য যদি এমন এক মুহূর্তে আসে, যখন শ্রোতা বুঝতে পারেন জীবনে সত্যিই কেউ আছে, তখন চারটি অক্ষরের মূল্য হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়।

সাহিত্যিক মূল্যমানের একটি বড় লক্ষণ হলো স্থায়িত্ব। যে গান দশ বছর পরও শোনা যায়, পঞ্চাশ বছর পরও নতুন কোনো শ্রোতার মনে একই অনুভূতি জাগায়, সেই গান নিশ্চয়ই কিছু একটা অর্জন করেছে।

আমাদের পুরোনো দিনের গানের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের গান, নজরুলগীতি, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ কিংবা পরবর্তী সময়ের অসংখ্য গীতিকারের গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এসব গানের বড় শক্তি শুধু সুরে নয়, শব্দেও। সেখানে প্রকৃতি আছে, প্রেম আছে, বিরহ আছে, দেশ আছে, আধ্যাত্মিকতা আছে, দার্শনিকতা আছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করার জন্য ভাষার একটি নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। ভাষা ও সুর লয় ছন্দের এক অপরূপ মেলবন্ধনের কারিশমা আছে।

ধরা যাক, কোনো গানে বলা হলো, ‘তুমি আমার জীবনের আলো।’ কথাটি নতুন নয়। পৃথিবীর অসংখ্য গান, কবিতা, উপন্যাসে আলো দিয়ে প্রেম বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সাহিত্যিক সৌন্দর্য সবসময় অভিনব শব্দে থাকে না; অনেক সময় থাকে পরিচিত অনুভূতিকে নতুনভাবে বলার মধ্যে। একই ‘আলো’ একজন গীতিকারের সৃষ্টিতে সাধারণ একটি শব্দ হয়েই থেকে যেতে পারে, আবার অন্য একজনের হাতে সেটিই হয়ে উঠতে পারে স্মৃতির, আশ্রয়ের, প্রাপ্তির কিংবা হারানোর প্রতীক।

এখানেই পুরোনো দিনের ও বর্তমান সময়ের নতুন গানের মধ্যে একটি মজার পার্থক্য দেখা যায়। পুরোনো দিনের গানে অনেক সময় একটি অনুভূতিকে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলা হয়। সেখানে অপেক্ষা আছে, বিরতি আছে, আবেগ আছে, ইঙ্গিত আছে। তাতে আবেগেরও যেন একটি সিঁড়ি ছিল। আধুনিক গানে সেই সিঁড়ির কিছু ধাপ যেন টপকে পেরোনোর একটা প্রবণতা আছে। সময় বদলেছে, মানুষের ভাষা বদলেছে, সম্পর্কের ধরন বদলেছে, শ্রোতার মনোযোগের পরিসরও বদলেছে। আজকের গান অনেক দ্রুত কথা বলে। কারণ আজকের শ্রোতাও দ্রুত শুনতে চান, দ্রুত অনুভব করতে চান, দ্রুত অন্য গানে চলে যেতে চান। ফলে গানের ভাষায় এসেছে কথ্যভাষায় ব্যক্ত করার প্রবণতা, সরলতা, সংক্ষিপ্ততা এবং অনেক সময় ইচ্ছাকৃত ভাঙাচোরা বাক্য। একই চিত্র সুরের ক্ষেত্রেও।

পুরোনো দিনের এবং বর্তমান সময়ের নতুন গানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পার্থক্যগুলোর একটি হলো তাদের উপমা ও চিত্রকল্পে। এ পার্থক্যকে ভালো-মন্দ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বরং এটি অনেক বেশি সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুরোনো গানের জগতে চাঁদ, জোছনা, নদী, কাশফুল, শিউলি, বকুল, বৃষ্টি, বসন্ত, পাখি, বাতাস, নৌকা, পথ, সন্ধ্যা, দীপশিখা কিংবা আকাশের মতো অসংখ্য চিত্রকল্প বারবার ফিরে এসেছে। প্রেমিকের মুখ চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, প্রিয়জনের চোখকে বলা হয়েছে নীল আকাশ, অপেক্ষাকে তুলনা করা হয়েছে পথের সঙ্গে, বিরহকে নদী বা বৃষ্টির সঙ্গে। এসব উপমা আজ আমাদের কাছে পরিচিত। কখনো এতটাই পরিচিত যে মনে হয়, গানে চাঁদ না থাকলে বোধহয় চাঁদও একটু অভিমান করবে। কিন্তু এসব উপমার শক্তি ছিল অন্য জায়গায়। এগুলো প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অনুভূতির একটি গভীর সম্পর্ক তৈরি করত। প্রকৃতি ছিল শুধু পটভূমি নয়, অনুভূতির অংশ। বৃষ্টি মানে শুধু পানির বর্ষণ নয়, অপেক্ষা। নদী শুধু নদী নয়, দূরত্ব, বহমানতা, ভাঙা-ভাঙা-গড়া, নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা। বসন্ত শুধু ঋতু নয়, প্রেমের আগমন। রাত শুধু সময় নয়, প্রেম-বিরহ-মিলন, স্মৃতি-একাকিত্বের অবকাশ।

অন্যদিকে, বর্তমানের গান অনেক বেশি নগরজীবন-নির্ভর। এখানে চাঁদের পাশাপাশি আসে শহরের আলো, রাস্তা, কফির কাপ, মোবাইলের পর্দা, এসএমএস, রাত জাগা, ব্যস্ততা, ট্রাফিক, একাকী ঘর। প্রেমিক-প্রেমিকার দূরত্ব এখন শুধু নদীর দুই তীরের দূরত্ব নয়; একই শহরে থেকেও ‘seen’ হয়ে কোনো উত্তর না পাওয়ার দূরত্ব। এটিও কিন্তু সময়ের এক ধরনের সাহিত্যি-দলিল। আগে অপেক্ষার প্রতীক হতে পারত জানালার পাশে বসে থাকা। এখন অপেক্ষার প্রতীক হতে পারে মোবাইলের পর্দায় একই নামের দিকে বারবার তাকানো। আগে বিচ্ছেদের ভাষা হতে পারত-‘তুমি দূরে চলে গেছ’। এখন কেউ হয়তো বলতে পারেন, ‘তুমি অনলাইনে আছ, অথচ আমার জন্য নেই।’ শব্দ বদলেছে, কিন্তু অনুভূতি বদলায়নি।

আজকের গানে কথ্য ভাষা, ইংরেজি শব্দ, দৈনন্দিন জীবনের শব্দ বা প্রযুক্তির ভাষা এসেছে বলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কম সাহিত্যিক হয়ে যায় না। সাহিত্য জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে না। জীবন বদলালে তার ভাষাও বদলায়। একসময় চিঠি ছিল প্রেমের প্রধান দূত। এখন এসএমএস, মেসেজ।

একটি গান কত পুরোনো, সেটি তার মূল্যমান নির্ধারণ করে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, গানটি পুরোনো হয়েও নতুন মানুষের কাছে কতটা কথা বলতে পারে, কতটা হৃদয় স্পর্শ করতে পারে। এর অসাধারণ উদাহরণ হতে পারে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’। গানটি একটি নির্দিষ্ট সময়, একটি নির্দিষ্ট জায়গা এবং কয়েকজন মানুষের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত। কিন্তু তার আবেদন কোনো একটি সময় বা প্রজন্মে আটকে থাকেনি। কারণ গানটি শুধু কফি হাউজের আড্ডার গল্প বলে না; এটি বন্ধুত্ব, যৌবন, সময়, সম্পর্ক, বিচ্ছিন্নতা, পরিবর্তন, হারিয়ে যাওয়া মানুষ এবং স্মৃতির গল্প বলে।

আজকের একজন তরুণ হয়তো সে সময়ের কফি হাউজে বসেননি। তিনি সেই মানুষগুলোকেও চেনেন না। তবুও গানটি তার কাছে অর্থবহ হতে পারে। কারণ মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব হারিয়ে যায়, মানুষ দূরে সরে যায়, সম্পর্ক বদলায়, সময় আমাদের আলাদা করে দেয়-এ অভিজ্ঞতাগুলো তো কোনো নির্দিষ্ট যুগের সম্পত্তি নয়। এ জায়গাতেই একটি গানের সাহিত্যিক শক্তি।

একটি গান যদি শুধু তার সময়ের ঘটনা বর্ণনা করে, তবে তা সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি সেই নির্দিষ্ট ঘটনার ভেতর দিয়ে মানুষের কোনো সর্বজনীন অনুভূতিকে ধরতে পারে, তবে সেটিই তাকে সময়ের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।

বর্তমানের গানকে বিচার করার সময় আমাদের কিছুটা ধৈর্যও দরকার। আজ যে গান আমাদের খুব ভালো লাগছে, দশ বছর পর হয়তো সেটি শুধু একটি সময়ের স্মৃতি হয়ে থাকবে। আবার আজ যে গানকে কেউ খুব সাধারণ ভাবছেন, আগামী প্রজন্ম হয়তো সেটিকেই তাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিল হিসাবে দেখবে। তারপরও নতুন গানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: নিজস্ব ভাষা। সবাই প্রেম নিয়ে গান লিখতে পারেন। কিন্তু সবাই নিজের মতো করে প্রেম লিখতে পারেন না। সবাই বিচ্ছেদ নিয়ে লিখতে পারেন, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা বা কল্পনার ভেতর দিয়ে বিচ্ছেদকে নতুন অর্থ দিতে পারেন কজন? সাহিত্যিক গানের শক্তি এখানেই। অনুভূতি তো সবারই আছে। কিন্তু সেই অনুভূতিকে ভাষা দেওয়ার ক্ষমতাই শিল্পীর আলাদা পরিচয় তৈরি করে।

কারণ শেষ পর্যন্ত গান কানে শোনা হলেও তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ঠিকানা কান নয়-মন। আর যে গান সেখানে একবার জায়গা করে নেয়, তাকে সরানোর জন্য কোনো ‘Skip’ বাটন থাকে না। সাহিত্যিক মূল্যমান সমৃদ্ধ গান নিজের চিরস্থায়ী জায়গা খুঁজে নেয় শ্রোতার হৃদয়ে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা

ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা

সময়ের সুরে ভাসা জীবনের শব্দ

সময়ের সুরে ভাসা জীবনের শব্দ

গল্প হারুন মোল্লার বিবিধ জীবন

হারুন মোল্লার বিবিধ জীবন

পূর্ববঙ্গের ভাষা : পর্ব ১৩ পূর্ববাংলার জনভাষা এবং একটি ভাষা-ভ্রমণ

পূর্ববাংলার জনভাষা এবং একটি ভাষা-ভ্রমণ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম