ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা : বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা
Advertisement
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে যে প্রশ্নাতীত শ্রেষ্ঠত্বের বলয় ও প্রায়-ঐশ্বরিক মিথ তৈরি করা হয়েছে, তা বহুলাংশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার তৈরি করা বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের ফসল। উনিশ শতকের তথাকথিত ‘বেঙ্গল রেনেসাঁস’ কোনো সর্বজনীন মুক্তির সামাজিক প্রকল্প ছিল না; বরং তা ছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে উৎসারিত, কোম্পানির শাসনযন্ত্রের আনুকূল্যে গড়ে ওঠা একটি উচ্চবর্ণীয়, হিন্দুভদ্রলোককেন্দ্রিক এবং প্রবলভাবে ইউরোসেন্ট্রিক চৈতন্য। এ বিশেষ শ্রেণির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিমূর্ত বিশ্বমানবতাবাদের বয়ান তৈরি করলেও, তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে পূর্ববঙ্গের অবহেলিত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি এক সুগভীর দ্বিমুখী আচরণ, শ্রেণিগত দূরত্ব এবং ঐতিহাসিক উদাসীনতা ধরা পড়ে। একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডের আত্মমর্যাদাশীল সাংস্কৃতিক বিনির্মাণে কোনো সাহিত্যিককে অন্ধ পূজার বেদিতে না বসিয়ে তার শ্রেণিচরিত্র, রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও মনস্তাত্ত্বিক পক্ষপাতকে নির্মোহভাবে ব্যবচ্ছেদ করা সময়ের দাবি। রবীন্দ্রনাথের বস্তুগত প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের উর্বর কৃষিভূমি। এখানকার ঘর্মাক্ত কৃষক সমাজ-যাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ছিল ধর্মীয়ভাবে প্রান্তিক মুসলিম এবং সামাজিক স্তরায়ণে অবদমিত নমঃশূদ্র জনগোষ্ঠী-তাদের রক্তজল করা খাজনা ও উদ্বৃত্ত ফসল শোষণ করেই কলকাতায় ঠাকুরবাড়ির রাজকীয় বিলাসিতা ও শান্তিনিকেতনের কর্মকাণ্ড সচল থাকত। অথচ চরম ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো, যে মাটির রস নিংড়ে তিনি বিত্তবান হয়েছিলেন, সেই মাটির সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত জীবনসংগ্রাম তার সৃষ্টিসমগ্রের কোথাও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক চরিত্র বা আকাঙ্ক্ষা হিসাবে ঠাঁই পায়নি। পদ্মা ও ইছামতীর ওপর বজরায় বসে তিনি যে প্রকৃতির স্নিগ্ধ রূপ এঁকেছেন, তা মূলত একজন বহিরাগত জমিদারের ভিক্টোরিয়ান নন্দনতাত্ত্বিক তৃপ্তি মাত্র; সেখানে পূর্ববঙ্গের মাটির রুক্ষ লড়াই অনুপস্থিত। তিনি যে সমাজ ও মাটিকে মহিমান্বিত করেছেন, তা আপাদমস্তক পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাকেন্দ্রিক বাবু কালচারের পরিশীলিত পরিসর, পূর্ববঙ্গের মেহনতি কৃষিজীবী মানুষের সঙ্গে যার অস্তিত্বগত কোনো যোগাযোগ ছিল না।
তৃণমূল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তার নির্ভীক ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার পরিবারের জমিদারির নির্মম শোষণ এবং প্রজাপীড়নের চিত্র নগ্নভাবে উন্মোচন করেছিলেন। হরিনাথের মূল্যায়নে ঠাকুর পরিবার কোনো মানবতাবাদী সত্তা ছিল না; বরং তারা ছিলেন নিরীহ কৃষকদের রক্তচোষা চরম সামন্তপ্রভু। পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ ও কুমারখালী অঞ্চলে প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত খাজনার জুলুম, জবরদখল ও তাদের লাঠিয়াল বাহিনীর বর্বর অত্যাচারের বিরুদ্ধে হরিনাথ কলম ধরেন। তিনি দেখান যে, কলকাতার আভিজাত্য ও আধ্যাত্মিকতার মুখোশের আড়ালে এ পরিবারটি আসলে কৃষকের সর্বস্বান্তকারী শোষক। এ সত্য প্রকাশের অপরাধে হরিনাথকে শায়েস্তা করতে ঠাকুরবাড়ি থেকে লাঠিয়াল বাহিনী পর্যন্ত লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এই শ্রেণিগত স্বার্থপরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকীর্ণতার প্রত্যক্ষ নজির মেলে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের অবহেলিত মুসলিম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামনে যখন নতুন রাজধানীর মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার সুযোগ উন্মোচিত হচ্ছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ এবং কলকাতার ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবী সমাজ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে ফেটে পড়েন। এ প্রেক্ষাপটেই তিনি লিখলেন ‘আমার সোনার বাংলা...’। এ গানটিকে এক সর্বজনীন দেশপ্রেমের স্মারক মনে কারানো হলেও, নির্মোহ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই ‘সোনার বাংলা’ মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু জমিদার, আইনজীবী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অর্থনৈতিক একচ্ছত্র আধিপত্য টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক আর্তি। পূর্ববঙ্গ প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পন্ন হয়ে উঠলে জমিদারদের কায়েমি স্বার্থ বিপন্ন হবে এবং আগের প্রজারা রাজনৈতিকভাবে আত্মসচেতন হয়ে উঠবে-এ কায়েমি ভীতি থেকেই রবীন্দ্রনাথ কলকাতার রাজপথে দাঁড়িয়ে রাখি বন্ধনের মাধ্যমে দুই বাংলাকে একত্রিত রাখার ডাক দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ রাজত্বের দীর্ঘসময় ঔপনিবেশিক বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পূর্ববঙ্গের মানুষের যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও স্বাধিকারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ তাকে সচেতনভাবেই উপেক্ষা করেছিলেন শুধু নিজের জমিদারি ও উচ্চবর্ণীয় সামাজিক আধিপত্য অটুট রাখার স্বার্থে।
মুসলিম সমাজ ও অপরাপর প্রান্তিক মানুষের সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব উপস্থাপনেও রবীন্দ্রনাথের ঔপনিবেশিক ও সংস্কারাচ্ছন্ন দৃষ্টির ছাপ স্পষ্ট। বহুল প্রশংসিত ‘কাবলিওয়ালা’ গল্পটির কথাই ধরা যাক। গল্পটিতে পিতৃস্নেহের এক স্বাভাবিক আবেগ দেখানো হলেও, তার সমান্তরালে একজন মুসলমান চরিত্রকে উপস্থাপিত করা হয়েছে বিপজ্জনক সুদের কারবারি, উগ্র মেজাজি এবং রক্তের দাগে অভিযুক্ত এক ভীতিকর আদিম সত্তা হিসাবে। তৎকালীন কলকাতার উচ্চবর্ণীয় ভদ্রলোকদের চোখে প্রান্তিক মুসলমানরা যে সর্বদা এক ধরানের সন্দেহভাজন ও হিংস্র জীব হিসাবে গণ্য হতো, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে সেই মনস্তাত্ত্বিক অবমূল্যায়নই শৈল্পিকভাবে বৈধতা পেয়েছে। তার বিশাল কথাসাহিত্যে মুসলমানদের চিত্রিত করা হয়েছে এক অজ্ঞ, আনুগত্যশীল বা বিপজ্জনক বহিরাগত হিসাবে।
বঙ্গভঙ্গ রদে পর পূর্ববঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমিত করতে যখন ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আসে, তখন কলকাতার সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী এর বিরুদ্ধে তীব্র বাধার প্রাচীর গড়ে তোলে। রবীন্দ্র-অনুসারীরা বিতর্ক এড়াতে প্রায়শই দাবি করেন যে, রবীন্দ্রনাথ সরাসরি এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেননি। কিন্তু এ খোঁড়া যুক্তি এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রকে আড়াল করতে পারে না। প্রথমত, যে রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার সার্বজনীনতা নিয়ে বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহে পৃথিবী ঘুরেছেন, তিনি পূর্ববঙ্গের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর একমাত্র উচ্চশিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কেন সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করলেন? দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে যারা ভাইসরয়ের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিল এবং সভা-সমাবেশ করেছিল, তারা প্রায় সবাই ছিল রবীন্দ্রনাথের ভাবাদর্শিক ও সামাজিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ সহচর। এই কায়েমি গোষ্ঠীকে তিনি কোনোদিন নিবৃত্ত করার ন্যূনতম চেষ্টাও করেননি। এ ঐতিহাসিক নীরবতা আসলে বিরোধিতারই এক নিরবচ্ছিন্ন সম্মতি।
১৯০০-১৯৩০ সাল পর্যন্ত লেখালেখির সময়কালে রবীন্দ্রনাথ যৌবনকাল পার করছিলেন। এ সময় তিনি খ্যাতি, যশ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির শীর্ষে থেকে নিুোক্ত বইগুলো প্রকাশ করেছিলেন, যার একটিও ব্রিটিশরা বাজেয়াপ্ত করেনি। কেননা এসব বইয়ে ভারতীয় জনগণের মুক্তি বা স্বাধীনতার কোনো কথা আসেনি; বরং কোনো কোনো গ্রন্থে তিনি ব্রিটিশ তোষণ করেছেন। আবার তার নীরবতাও ব্রিটিশদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থনেরই নামান্তর। নৈবেদ্য (১৯০১), চোখের বালি (১৯০৩), স্মরণ (১৯০৩), নৌকাডুবি (১৯০৬), খেয়া (১৯০৬), শারদোৎসব (১৯০৮), গোরা (১৯১০), গীতাঞ্জলি (১৯১০), রাজা (১৯১০), ডাকঘর (১৯১২), অচলায়তন (১৯১২), গীতিমাল্য (১৯১৪), চতুরঙ্গ (১৯১৬), ঘরে বাইরে (১৯১৬), বলাকা (১৯১৬), ফাল্গুনী (১৯১৬), পলাতকা (১৯১৮), শিশু ভোলানাথ (১৯২২), মুক্তধারা (১৯২২), রক্তকরবী (১৯২৬), শেষের কবিতা (১৯২৯), যোগাযোগ (১৯২৯), মহুয়া (১৯২৯) এবং তপতী (১৯২৯)।
ঠিক একই সময়ে ব্রিটিশদের বিপক্ষে লেখার কারণে এবং মানুষের মুক্তির জন্য লেখার কারণে নিুোক্ত লেখকদের বইগুলো বাজেয়াপ্ত হয় এবং তাদের কেউ কেউ কারারুদ্ধ হন। এরাই তো ভারত ও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী লেখক। রবীন্দ্রনাথ কোনোভাবেই এদেশ ও ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করেন না। সেসময় যেসব বই নিষিদ্ধ হয়েছিল তা হলো : সখারাম গণেশ দেউস্কর-দেশের কথা (প্রকাশকাল : ১৯০৪, নিষিদ্ধ : ১৯১০); শ্রী অরবিন্দ-ভবানী মন্দির (প্রকাশকাল : ১৯০৫, নিষিদ্ধ : প্রকাশের পরপরই); বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও অন্যান্য বিপ্লবীরা-বর্তমান রণনীতি (প্রকাশকাল : ১৯০৭, নিষিদ্ধ : ১৯০৮-১৯১০-এর দিকে); যুগান্তর গোষ্ঠী-মুক্তি কোন্ পথে? (প্রকাশকাল : ১৯০৭); মতিলাল রায়-কানাইলাল (প্রকাশকাল : ১৯০৯/১৯১১); শ্রী অরবিন্দ-কর্মযোগীন (প্রকাশকাল : ১৯০৯-১৯১০, নিষিদ্ধ : ১৯১০); গিরিজাসুন্দর চক্রবর্তী-হুঙ্কার (প্রকাশকাল : ১৯০৮, নিষিদ্ধ : ১৯১০); কুমুদবন্ধু সেন-বন্দে মাতরম (প্রকাশকাল : ১৯০৬-১৯০৮-এর মধ্যে); মোহাম্মদ নজিবর রহমান-বিলেতী বর্জ্যন (প্রকাশকাল : ১৯০৫-১৯০৭ এর মধ্যে); কাজী নজরুল ইসলাম-বিষের বাঁশী (প্রকাশকাল : ১৯২৪, নিষিদ্ধ : ১৯২৪); ভাঙার গান (প্রকাশকাল : ১৯২৪, নিষিদ্ধ : ১৯২৪); যুগবাণী (নিষিদ্ধ : ১৯২২-১৯২৪ সালের মধ্যে); প্রলয়শিখা (প্রকাশকাল : ১৯৩০, নিষিদ্ধ : ১৯৩০); চন্দ্রবিন্দু (প্রকাশকাল : ১৯৩০, নিষিদ্ধ : ১৯৩১); শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-পথের দাবী (প্রকাশকাল: ১৯২৬, নিষিদ্ধ : জানুয়ারি ১৯২৭); বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়-দেশের ডাক ও সর্বহারা (নিষিদ্ধ : ১৯৩০ সালের আশেপাশে); শচীন্দ্রনাথ সান্যাল-বন্দী জীবন (নিষিদ্ধ : ১৯২৮-১৯৩০); অজ্ঞাত বা বিপ্লবী দল-তরুণের রণভেরী (প্রকাশকাল : ১৯৩০, নিষিদ্ধ : ১৯৩০); শান্তি দাস (শান্তি কবীর)-স্বরাজ গীতা (প্রকাশকাল : ১৯৩০)।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, নজরুল যখন জেলে ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ তাকে যে টেলিগ্রাম দিয়েছিলেন, তা দেশের প্রয়োজনে নয়, সাহিত্যের জন্যই প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং তার ‘বসন্ত’ নাটকটি নজরুলকে যে উৎসর্গ করেছিলেন, সেখানেও তিনি সাহিত্যের প্রয়োজনেই এ কাজটি করেছিলেন। এমনকি ১৯২৯ সালে নজরুলকে যখন স্বাধীন ভারতের জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়, তখনো রবীন্দ্রনাথ নীরব থেকে তার চতুরতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
১৯১৫ সালে সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘নাইটহুড’ উপাধি দেয়। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি ৩১ মে এই উপাধি বর্জন করেন। বর্জনে প্রায় দেড় মাস দেরির কারণ ছিল সামরিক আইনের ভয়ে নেতারা রাজি না হওয়ায়। অর্থাৎ তার নিরাপত্তা আগে, মানুষের হত্যাকাণ্ডের বিচার বা প্রতিবাদ পরে। পূর্ববঙ্গের সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের প্রতি কলকাতার ঠাকুরবাড়ির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, তার বেদনাদায়ক সাক্ষ্য দিয়েছেন মানুষের কবি জসীমউদ্দীন তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘ঠাকুর বাড়ীর আঙিনায়’-এ। উচ্চশিক্ষার একটি সুপারিশ ও স্বীকৃতির আশায় তরুণ জসীমউদ্দীন যখন রবীন্দ্রনাথের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তখন তাকে যে নিদারুণ সামাজিক অবজ্ঞা, দ্বিচারিতা ও আমলাতান্ত্রিক কূটকৌশলের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছিল, তা কলকাতার বর্ণবাদী আভিজাত্যের নগ্ন রূপটিকে সামনে আনে। পূর্ববঙ্গের মাটির কবিকে তারা কোনোদিনই সমান মর্যাদার আসনে বসাতে চাননি। এ বুদ্ধিবৃত্তিক হেজিমনি নিয়ে তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার তার ‘রক্তে দাগ মুছে রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রবীন্দ্র-সাহিত্যের মাধ্যমে ব্রাহ্মণ্যবাদী আধুনিকতা এক বিশেষ ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্ব কায়েম করেছে, যা বাংলার প্রকৃত গণমানুষের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ও তাদের রাজনৈতিক মুক্তির সংগ্রামকে সুকৌশলে ধামাচাপা দেয়।
কবি আবদুল হাই শিকদার এ ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যকেই বাংলাদেশে বহমান ‘কালচারাল ফ্যাসিজম’ বলে অভিহিত করেছেন এবং রবীন্দ্রনাথকে এ ফ্যাসিবাদের প্রধান আদর্শিক আইকন হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ কোনোদিনই পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বাধীন ভূখণ্ডগত স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌম আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকার করেননি। তিনি যে ‘ভারততীর্থ’ বা মহামিলনের স্তুতি গেয়েছেন, তা মূলত উচ্চবর্ণীয় হিন্দু ও ব্রাহ্ম আধিপত্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক আরোপিত কাঠামো, যেখানে পূর্ববঙ্গের মুসলমান বা অবহেলিত জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক চেতনা ছিল চিরতরে বিলীন হওয়ার যোগ্য উপাদান মাত্র। কলকাতার বাবু সমাজ পূর্ববঙ্গের মানুষকে যে ‘বাঙ্গাল’ বলে তাচ্ছিল্য করত, রবীন্দ্রনাথও সেই একই সাংস্কৃতিক অহমিকা লালন করতেন। এমনকি নিজ পরিবারের ভেতরেও তিনি এ বৈষম্য বজায় রেখেছিলেন। পূর্ববঙ্গের খুলনার সাধারণ ঘরের মেয়ে ভবতারিণীকে বিয়ে করে তিনি রাতারাতি তার নাম বদলে দেন ‘মৃণালিনী’। ঔপন্যাসিক হরি শংকর জলদাস তার ‘আমি মৃণালিনী নই’ উপন্যাসে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন কীভাবে একজন পূর্ববঙ্গীয় নারীর অস্তিত্ব ও সত্তাকে অস্বীকার করে ঠাকুরবাড়ির আধিপত্যকামী রূপ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানও কোনো আপসহীন গণমুখী চরিত্র ধারণ করেনি। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি তার কৃতজ্ঞতাসূচক পত্রগুলোর ভাষা ছিল চরম ঔপনিবেশিক আনুগত্য ও দাসত্বমূলক মানসিকতার প্রতিফলন। পরবর্তীকালে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনার পর তিনি নাইটহুড বর্জন করলেও, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামো ও শাসকগোষ্ঠীর অভিজাত স্তরের সঙ্গে তার সামাজিক মিত্রতা কখনোই ছিন্ন হয়নি। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় ছিল রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বীরদের নিয়ে তার লেখনীতে প্রায় নিশ্চুপ ছিলেন। তার নীরবতা ব্রিটিশ তোষণের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জাগ্রত জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে এমন একজন লেখক কখনো জাতীয় আইকন হতে পারেন না, যার জীবন ও দর্শন দেশের গণমানুষের মৌলিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ফ্যাসিবাদবিরোধী বিপ্লবের ময়দানে রবীন্দ্রনাথ কোনো সংগ্রামী প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করতে পারেননি। কারণ একটি সুবিধাভোগী বুর্জোয়া ও বর্ণবাদী শ্রেণিচেতনা দিয়ে গণমানুষের সর্বাত্মক মুক্তি ও শোষিতের ইনসাফ কায়েম করা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথকে অবশ্যই পাঠ করতে হবে, তবে তা কোনো জাতীয় দেবতার আসনে বসিয়ে নয়; বরং হোমার, ভার্জিল, উইলিয়াম শেক্সপিয়র, লিও তলস্তয়, ইমরুল কায়েস, আল্লামা ইকবাল, জালালউদ্দিন রুমি, ফেরদৌসি কিংবা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার মতো বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে একজন সাধারণ সাহিত্যিক হিসাবে। তাদের সাহিত্যকে আমরা বিনোদন ও জ্ঞানচর্চার অংশ করি, কিন্তু তাদের মতাদর্শিক দাসত্ব বরণ করি না।
দুর্ভাগ্যবশত, কলকাতার কায়েমি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের মুখপত্র ‘দেশ’ পত্রিকা যুগের পর যুগ ধরে সাহিত্যের নামে রবীন্দ্র-পূজাকে এক আগ্রাসী কাল্টে পরিণত করেছে। তারা কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্ম নিয়ে সামান্য আলোচনা করলেও, নজরুলের বিশাল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তার লেখা কবিতা, মানুষের বঞ্চনা থেকে মুক্তি, নারী-পুরুষ ও হিন্দু-মুসলিম সম-অধিকারের বিষয়ে তার রেখা, মুসলিম ঐতিহ্য, ইসলামি জাগরণী গান ও আপসহীন দ্রোহের সাহিত্যকে পরিকল্পিতভাবে চেপে গেছে। এই একই সাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক রাজনীতি বাংলাদেশে ছায়ানট, উদীচী এবং এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে পুনর্বাসিত হচ্ছে। ঢাকার রাজপথে রবীন্দ্রনাথের ক্যালিগ্রাফি এঁকে এবং তাকে জাতীয় সংস্কৃতির একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে মূলত এ মাটির গণসংগ্রাম, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আবহমান লোকঐতিহ্যকে মুছে ফেলার এক দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্ত চলছে।
ফলে, একথা বলা যায় রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশ ও ভারতে জাতীয় চরিত্র হতে পারেন না। তিনি একজন সাহিত্যিক হিসাবেই তার নন্দনতত্ত্বের জন্য পাঠ্য হতে পারেন। রবীন্দ্রনাথের ধর্ম হলো সুবিধাবাদী ধর্ম।
