পূর্ববঙ্গের ভাষা : শেষ পর্ব
সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য
Advertisement
সালেহ মাহমুদ রিয়াদ
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আমাদের এই অকিঞ্চিতকর নিবন্ধে ভাষারীতির প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের সুস্পষ্ট অভিমত না-থাকার বিষয় উল্লেখ করিয়াছি। সাধুগদ্যের প্রতি ক্রমশঃ তাঁহার অনুরাগের অভাব অথবা ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’র প্রতি সম্মতিপ্রদানের উদার মনোভাব তাঁহার গদ্যের ব্যঞ্জনা ও বলিষ্ঠতা কিছুটা হইলেও লঘু করিয়াছে বলিয়া আমাদের মনে হইয়াছে। তিনিই আবার কবিতায় বড় সার্থকভাবে সাধুপ্রয়োগের উদাহরণ দিয়া কবিতার এক অনন্যভুবন রচনা করিলেন। ইতঃপূর্বে রবীন্দ্রনাথের কবিতার নমুনা এখানে দেওয়া হইয়াছে।
বাংলাদেশের জনমানুষ শুধু কথা কহিবার কালেই সাধুরূপে থাকিল না; ইহার লোককবি, গণকবি, গণশিল্পী সকলে মিলিয়া সাধুভাষায় গানে গানে, ছড়ায়, কবিতায়, ছন্দে, আনন্দে, বিষাদে ও বিহ্বলতায় ভাসিয়া গেলেন। হাজার হাজার দৃষ্টান্তের মধ্যে আমরা কয়েকটিমাত্র তুলিয়া ধরিলাম:
১. গাছত্ উঠিয়া দুইটা হা ও মুক জলপুই পাড়িয়া দে ( রংপুর)
২. নদী কর্ণফুলী রে সাক্ষী রাখিলাম তরে (চট্টগ্রাম)
৩. তবু তোমায় বিশ্বাস করি রে ওই না ভাঙ্গামেঘে বুক বাঁধিয়া
তুমি এ দেশে কি আসবা রে ফিরিয়া (যশোহর)
৪. পাখা বানাইয়া দেরে বিধি উইড়া যাইতাম রে সুরেশ্বর (ময়মনসিংহ)
৫. গেল বেহুশ হইয়া, গেল বেহুশ হইয়া
রয় বসিয়া বৈঠা দিল ছেড়ে (চাপাইনবাবগঞ্জ)
৬. মোর পরানডায় শান্তি পাইলাম বাংলায় জনম লইয়া (বরিশাল)
৭. বছরখানি ঘুইরা , গেল রে
ভাইয়ের দেখা পাইলাম না , পাইলাম না (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
৮. আসলামুয়ালাইকুম ওহে দুলাভাই
কাজ করিয়া লইবেন সালাম সবাইকে জানাই (নোয়াখালী)
একবারেই দৈবচয়ন করিয়া আমরা এইগুলি গ্রহণ করিয়াছি (এবং স্মৃতিনির্ভর বলিয়া ভুলত্রুটি ঘটিবার শঙ্কা রহিল, ত্রুটি মার্জনীয়)। প্রকৃতপক্ষে, সারাদেশে এত উদাহরণ ছড়াইয়া আছে যে, কোন্টি লইব আর কাহাকে ছাড়িয়া দিব- দিশা মেলে না।
আমরা কোন এক বা একাধিক ভাষারীতি হটাইয়া কিংবা পরাভূত করিয়া, ক্ষমতা ও শাসনের দুষ্ট-প্রয়োগ ঘটাইয়া, তথাকথিত কৌলিন্য বা আভিজাত্যের দোহাই পাড়িয়া কোন ভাষা-ক্ষমতা-রীতি চালু করিবার ঘোর নিন্দা করি। ইহা ভাষার স্বাভাবিক ধর্মের বিরুদ্ধে চলিয়া যায়। আমাদের দেশে এইরকম মহা-কৌতুকময় রাষ্ট্রপ্রয়াস চালানো হয়। উহার পরিণতি আমরা সকলে জানি। ধর্মের নাম করিয়া একটি ভাষাকে উৎখাত করিয়া অপর একটি ‘ধর্মভাষা’ চালু করিবার এমন উদ্ভট তৎপরতা কেবল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের পক্ষেই বুঝি সম্ভব। ‘পুণ্যকর্ম’টি ব্যর্থ হইয়াছে তবে উহার দাগ মুছিয়া যায় নাই। পূর্ববাংলার জনসাধারণ সাধুভাষায় কথা বলেন, চলিতভাষায় নহে- এই সত্য অস্বীকার করিয়া কিছুলোকের ‘অন্য’কিছু চাপাইয়া দেওয়ার ‘নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম’কে অবশ্যই সমালোচনা করিব; সম্ভব হইলে প্রতিরোধ করিব। আমাদের এই দৃঢ় অবস্থানের অর্থ ইহা নয় যে, আমরা ইতোমধ্যেই প্রচলিত কোন রীতি বাতিল করিবার আহ্বান জানাইতেছি। লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক প্রমুখ শিল্প-সাহিত্য-উৎপাদকমণ্ডল ও চিন্তকসমাজ কোন্ ভাষারীতি অবলম্বন করিয়া তাঁহাদের ভাবনা মেলিয়া ধরিবেন- ইহা একান্তই তাঁহাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে গভীর মর্ম-বেদনা লইয়া আমরা লক্ষ করি যে, একদল ‘পণ্ডিতব্যক্তি’ সাধুরীতিকে নস্যাৎ করিবার জন্য বেশ জোরে-শোরে কলরব তুলিয়াছেন। তাঁহারা ইহাকে একটি ‘প্রাচীন জীবাশ্ম’ ভাবিয়া জাদুঘরে স্থাপন করার সুপারিশ পর্যন্ত করিয়া থাকেন। আশঙ্কার বিষয়- দলটি ক্রমশঃ ভারী হইতেছে। ব্যাপকসংখ্যক ‘আধুনিক’ সাহিত্য ও শিল্পপ্রেমিক এই দলে নাম লেখাইতেছেন। তাঁহারা কোন্ গড্ডলিকার মিছিলে কলরব তুলিতেছেন, তাহা নিজেরাও মনে হয় বিচার করিয়া উঠিবার অবসর পাইতেছেন না।
আজিকাল আবার দেখিতেছি আরও একটি বড়সড় সাহিত্যিকদল শিল্প-সাহিত্যকে ‘মুখের ভাষার’ কাছাকাছি টানিয়া আনিবার জন্য উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছেন। ইহা অপেক্ষা অ-বৈজ্ঞানিক, কষ্টকল্পনা ও উদ্ভট ধারণা আর হইতে পারে না। কেন পারে না- উহা নিয়া আলোচনা করিতে যাওয়াও হইবে এক বিষম বিড়ম্বনা। মুখের ভাষা বলিতে ঠিক কাহার বা কাহাদের মুখ অনুমোদন করা হইল, কোন্ মুখ সামনে আসিয়া কোন্ মুখ আড়াল করিল, আমরা খুঁজিয়া বাহির করিতে অক্ষম হইলাম। মুখের ভাষা লিখিলে তাহা কি সর্বজনবোধ্য সাহিত্য হইবে? উদাহরণ দেওয়ার ইচ্ছা নাই; শুধু এইটুকু বলিব, কক্সবাজারের কোন এক সওদাগর বা লবণচাষীর মুখের ভাষায় রচিত সাহিত্য যশোহর কিংবা বর্ধমান বুঝিবে বলিয়া কদাচ আমাদের বিশ্বাস হয় না। জগতের কোন মহৎ সাহিত্য এ-জাতীয় কোন ভাষায় রচিত হইয়া থাকিলে তাহা মুখভাষার জন্য এক অবিস্মরণীয় ঘটনা হইবে- সন্দেহ নাই।
আমাদের জাতীয় প্রতিভা : সাধুভাষা
মুখের ভাষার দাবি শুনিয়া আমাদের প্রাণে বড় শঙ্কা উপস্থিত হয়। বিবেকানন্দ, প্রমথ চৌধুরী, আবুল মনসুর আহমদদের সেই পুরাতন কণ্ঠ যেন প্রতিধ্বনিত হইতেছে। বিশেষ করিয়া পূর্ববাংলায় কয়েকজন প্রথিতযশা কবি তাঁহাদের ‘মুখের ভাষা’ এবং সীমাবদ্ধ ‘গোষ্ঠী’ভাষায় অল্পকিছু কবিতা লিখিয়াছেন। দুই-একজন যৎসামান্য গদ্যসাহিত্যও লিখিয়াছেন। কবিতাগুলি যথেষ্ট সুনাম পাইয়াছে এবং খানিকটা পাঠপ্রিয় হইয়াছে। যতদূর ধারণা করি, তাঁহারা একধরনের নিরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়াছিলেন তবে বেশিদূর অগ্রসর হন নাই; কেননা, তাঁহারা এ-জাতীয় কাব্যের প্রকৃতি ও সাহিত্যের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। সাহিত্যের এইরূপ সীমাবদ্ধতা তাঁহারা উত্তমরূপে জানিতেন। পরে কেহই আর ওই পথে অগ্রসর হন নাই। এবং আমার মুখের ভাষার ‘গন্ধ’ তুমি সহিবে কেন! বিপরীতে, কে বলিল তোমার মুখ হইতে অবিরাম শুধু সুগন্ধ বাহির হয়!
অতএব, কঃ পন্থা? উপায় কী। আমার আন্তরিক ভাষা তুমি লইবে না, তোমার অঞ্চলের ভাষায় আমি কহিব না, তোমার ঘরের ভাষা আমি বুঝিতে চাহি না, বুঝিতে পারিও না, তোমার মুখের ভাষা বড় মিষ্ট তবে উহা তো আমার নহে; সমস্যা বড় প্রকট হইল। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি এবং অনভিপ্রেত সঙ্কট হইতে আমাদের বাহির হইতে হইবে; বাহির না হইলে আমাদের অহঙ্কার করিবার সবচাইতে প্রয়োজনীয় কর্তব্যের প্রতি সবচাইতে বেশি অবহেলা করা হইবে। একটিইমাত্র উপায় আছে আর তাহা হইল- সমগ্র বাঙলাভাষার ভূগোল জুড়িয়া একভাষারীতি গ্রহণ করা। এইরূপ একটি ভাষা-মহাসঙ্ঘ গড়িয়া তুলিতে পারিলে একদিন হয়তো আমরা শুধু ভাষাকে ধরিয়া এক মহাজাতিরূপে আত্মপ্রকাশ করিব। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে কেবল ভাষাকে ঘিরিয়া একটি জাতিসত্তা গড়িয়া তুলিবার ইতিহাস রহিয়াছে। ভাষাকে কেন্দ্রে স্থাপন করিয়া জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে অবতীর্ণ হইবার একমাত্র ইতিহাস রচনাকারী হিশাবে আমরা জগতে অনন্যস্থান অধিকার করিয়া আছি। আমাদের প্রতিবাসী দেশেও ভাষার জন্য আত্মবলিদানের কাহিনী রহিয়াছে।
একভাষা হিশাবে কোন্টি গ্রহণ করিব, কোন্টি করিলে সর্বজনীন হয়- উহার পক্ষে ইতঃপূর্বে আমরা আমাদের যুক্তি তুলিয়া ধরিয়াছি; মনীষিগণের অভিমত তুলিয়া ধরিয়াছি; সুতরাং, নূতন করিয়া কারণ দর্শাইবার কোন কারণ দেখি না। প্রকৃতপ্রস্তাবে, আমাদের নিজস্ব কোন যুক্তিও নাই; আমরা মনীষীদের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত এইখানে শুধু জড়ো করিয়াছি মাত্র। তাঁহাদের ভাবনারাশির সঙ্কলন করিয়া আমরা সাধুরীতিকে সমগ্র বাংলার জাতীয় ভাষারূপে গ্রহণ করিবার জন্য সবিনয় প্রস্তাব নিবেদন করি। এইখানে ‘বাংলা’ বলিতে আমরা কোন রাজনৈতিক বাংলার কথা বলি নাই। এই বাংলা সমগ্র বাঙলাভাষী বাংলা- আমাদের প্রায়-নিখোঁজ প্রাচীন বাংলা। কেবল তাহাই নহে; পৃথিবীর যেখানে বাঙ্গালি আজও বাঙ্গালি বলিয়া পরিচয় দিতে কুণ্ঠা বা লজ্জাবোধ করেন না, তাঁহাদের বাঙলা। আমাদের ‘জাতীয় প্রতিভা’ হিশাবে সাধুভাষাকে মানিয়া লইলে কাহারও আপত্তি করিবার কোন হেতু থাকিবে না। পূর্ববাংলায় তো সাধুভাষাই সর্বজনীন ভাষা; সুতরাং, এইদিক হইতে বিমুখ হইবার কোন কারণ থাকিতে পারে না। পশ্চিমেরও আপত্তি তুলিবার তেমন শক্ত সুযোগ নাই। নিষ্ঠুর এবং বেদনাদায়ক হইলেও এই সত্য আর অস্বীকার করিবার কোন সুযোগ নাই যে, বৃহৎ বাঙ্গালিজাতি বলিয়া কোন জাতি আজ হারাইয়া গিয়াছে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আচরণের দীর্ঘকালের অনুশীলন বাঙলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন ধারার সূচনা করিয়াছে; ফলে, একটি অখণ্ড বাঙ্গালি জাতিসত্তা ফিরাইয়া আনা হয়তো সম্ভব নহে। আমরা যদি ধর্ম ও রাজনীতির শ্রেণীস্বার্থজড়িত সঙ্কীর্ণ পথগুলি পরিহার করিয়া একটি জাতীয় ভাষাভিত্তিক পরিচয় গড়িয়া তুলিতে পারি, তাহা আমাদের সামগ্রিক উৎকর্ষের পথে গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় হইয়া উঠিবে। ইহা মোটেও কোন কষ্টকল্পনা নহে।
তাই বলিয়া চলিতরীতি বাতিল বা অগ্রাহ্য কিংবা উহাকে ‘অপদস্থ’ করিবার কোন সুদূর কল্পনাও আমরা করি না। অনুরূপ চিন্তা বাঙলাভাষার বিপুল বৈভবময় বৈচিত্র্যরাশির অনুপম সৌন্দর্য্যকে পদদলিত করিবার দুরভিসন্ধি ছাড়া আর কিছু হইতে পারে না। চলিতরীতি বাঙলা সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছে। কোন গৃহীত ও অনুশীলিত রীতি বর্জন করা বা উহাকে নিয়া তর্জন-গর্জন করার বিন্দুমাত্র অভিলাষ কাহারও থাকিবার কথা নহে। আমাদের প্রস্তাব- সাধুরীতিকে সর্বগ্রাহ্য, সর্বমান্য ও সর্বজনীনরূপে অভিষিক্ত করা। এই প্রস্তাব কোন নূতন বিষয় নহে, ইহার মধ্যে কোন অভিনবত্ব নাই। সাধুভাষা সমগ্র বাঙ্গালিজাতির ভাষা; বহুবর্ষ ধরিয়া এই ভাষা আমাদের বাঙ্গালিত্ববোধকে জীবন্ত ও গতিশীল রাখিয়াছে। মাঝে-মধ্যে ধর্মীয় আবেশের বশবর্তী হইয়া, সাংস্কৃতিক অগ্রগামিতার অহমিকা দিয়া, অঞ্চলভিত্তিক তথকথিত নিজস্বতার দোহাই পাড়িয়া কেহ ভাষাকে আবদ্ধ করিতে চাহিলে আমরা তাহাকে প্রতিরোধ করিবার কোন আয়োজন করিব না। বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বিকাশের সর্বজনীন গ্রাহ্যতা আসে বলিয়া আমরা মনে করি না। সুতরাং, তুমি ‘একা চির-উন্নত শির’ খাড়া করিয়া বেশিকিছু পাইবার আশা করিলে ফলবতী হইবার আশা কমিতে থাকিবে, বাড়িবে না।
আজিকাল আবার বিচ্ছিন্ন্ হইবার, ক্ষুদ্র হইয়া উঠিবার, একা হইবার এক দুর্নিবার আন্দোলন বেশ দানা বাঁধিয়া উঠিয়াছে। স্বাতন্ত্র্যের আলাদা জ্যোতি বহুত্বের মধ্যে আনিতে পারিলে ইহা আরও প্রখর হইয়া উঠে- ইহা স্বতঃসিদ্ধ কথা; আমরা সকলেই জানি। আঞ্চলিকতার সীমাবদ্ধ আয়তন হইতে আমরা ভাষারীতিকে ‘জাতীয় সীমা’র ভিতর আনিতে পারিলে আমাদের আত্মপরিচয়ের কয়েকটি সাধারণ অস্বস্তির অবসান ঘটিত। দুঃখের বিষয়- এমন কোন উদ্যোগের কথা কেহ ভাবিতেছেন বলিয়া মনে হয় না। আজ যে-সকল বন্ধন দিয়া উভয় বাংলার সর্বস্তরের মানুষকে ‘আলাদা’ মানুষরূপে চিহ্নিত করিবার সর্বগ্রাসী তৎপরতা চালানো হইতেছে- উহা নিশ্চিতভাবেই এক সর্বনাশা কীর্তি। একটি সর্বজনীন ভাষারূপ সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করিতে পারিলে, আশা করা যায়, হয়তো আমরা ক্ষুদ্রত্বের কয়েকটি লঘু সীমা পার হইতে পারি। পার হইবার একটি প্রধান পন্থা হইতে পারে আমাদের জাতীয় প্রতিভা সাধুভাষাকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে স্থাপন করা।
কীভাবে ইহা করা যাইতে পারে- এই প্রশ্ন তো আসিবে। এ-বিষয় নিয়া আমরা কোন সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করি নাই। তবে যে-কথাটি জোরের সহিত বলা দরকার, তাহা হইল, রাষ্ট্রের ভূমিকা। রাষ্ট্র চাহিলে সাধুভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন কিছু নহে- ইহা আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা হইতে জানি। কথা উঠিবে, রাষ্ট্রের কী এমন দায় ঠেকিল কোন একটি নির্দিষ্ট ভাষারীতিকে প্রতিষ্ঠিত করিবার! আবার আমরা অনেকেই রাষ্ট্রের দায়িত্বগ্রহণ ও অংশগ্রহণকে আরামদায়ক মনে করি না। ভাষার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের ন্যক্কারজনক অপকর্মের সাম্প্রতিক ইতিহাসও আছে; সুতরাং, এ-সকল বাস্তবতাও আমাদের সক্রিয়ভাবে মনে রাখিতে হইবে। রাষ্ট্র-ভূমিকার অভিজ্ঞতা এইদেশে প্রায়শঃ কোন সুখকর অভিজ্ঞতা নহে। প্রচলিত শঙ্কার বাইরেও রাষ্ট্রের যে একটি প্রতিক্রিয়াশীল স্বভাব আছে- উহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, সারা বাংলা (উভয় বাংলা) জুড়িয়া অসংখ্য কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর লোকজন সাধুরীতি প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য আগাইয়া আসিবেন। বিশ্বময় ছড়াইয়া থাকা বাঙলাভাষিগণ সচেতনভাবে জাতীয় প্রতিভার প্রতি আন্তরিক হইবেন। সবাই একসঙ্গে জড়ো হইয়া বহুকণ্ঠ মিলাইয়া দাবি তুলিতে হইবে না, মিছিল করিয়া কলরব করিতে হইবে না, সভা ডাকিয়া আহ্বান করিবার আবশ্যকতা নাই। সকলে নিজের অবস্থান হইতে ভাষা-কর্তব্য নির্ধারণ করিলেই আমাদের অভীষ্ট পূরণ হইবে।
আমরা বিভিন্ন বিষয় ধরিয়া আজ বহুধা-বিভক্ত হইয়াছি। এ-সকল বিচ্ছিন্নতার অবসান হয়তো সহজ নহে; তবে একটি জাতীয় ভাষারীতি অবলম্বন করিয়া সর্ববাঙ্গালিত্বের ঐতিহাসিক আশ্রয় গড়িয়া তুলিবার লক্ষ্যে আমরা সাধুরীতিকেই নির্বাচন করিব।
