Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

Advertisement

Icon

ড. নূর-ই আলম সিদ্দিকী

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক। ফাইল ছবি

Advertisement

১৯৪৭-পরবর্তী লেখকরা সমাজ ও জীবনঘনিষ্ঠ লেখায় উপন্যাস ও ছোটগল্পের জগৎকে প্রদীপ্ত করেন। প্রত্যেক সাহিত্যিক সেসময় দুটি সমকালীন প্রেক্ষাপট সামনে রেখে সাহিত্য নির্মাণে সক্রিয় হন। এর একটি উদার মানবিক দৃষ্টি এবং অন্যটি মার্কসবাদী চেতনা।

দেশবিভাগ-উত্তর পূর্ববাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে নজর দিলে আবু ইসহাককে বিশেষ স্থান দিতে হয়। আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যে পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক সংকট, ধর্মীয় ও লোকজ বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন বাস্তবমুখী শিল্পরূপ লাভ করেছে। তার উপন্যাস ও ছোটগল্পে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্কের জটিল সমষ্টি হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে। বয়সে তারুণ্যের অভিজ্ঞতার নিবিড় রূপায়ণ করেছেন তিনি তার লেখায়। যেখানে প্রাক্-স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা-পরবর্তী পূর্ববঙ্গের গ্রামের পটভূমিকে তিনি তার সৃষ্টির আধারে রেখায়িত করার আন্তরিক প্রয়াস পেয়েছেন।

রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে ওই সময় সমগ্র বাংলাদেশ উত্তাল। একই সময় এদেশের গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্নতা ও রক্ষণশীলতার শিকড় ছিল সমাজের অনেক গভীরে। এসময় রফিউদ্দিন আহমেদের ‘দ্য বেঙ্গল মুসলিম (১৮৭১-১৯০৬) এ কোয়েস্ট অব আইডেন্টিটি’, লিওনাড বাইন্ডারের ‘রিলিজন অ্যান্ড পলিটিক্স ইন পাকিস্তান’, একে নাজমুল করিমের ‘চেঞ্জিং সোসাইটি ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’, এসএম হাফেজ জায়েদি’র ‘দ্য ভিলেজ কালচার ইন ট্রাঞ্জিশন’ গ্রন্থগুলোয় বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের ভয়াবহ চিত্র প্রত্যক্ষ করি।

উল্লিখিত গ্রন্থে মুসলমান সমাজের বহু যুগের কুসংস্কার, অদৃষ্টবাদ, গোঁড়ামি ও রক্ষণশীলতার জালবন্দি গ্রামীণ সমাজের নিম্নবিত্ত এবং বিত্তহীন নিঃস্ব মানুষকে বিত্তশালীদের শিকারে পরিণত হতে দেখি। আবু ইসহাক এ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কুসংস্কার আবিষ্ট পশ্চাৎপদতার চিত্র তার উপন্যাস ও ছোটগল্পে দৃশ্যায়িত করেছেন। দেশবিভাগ-উত্তর সময়ে বাংলার গ্রামীণ জনপদের ধর্মীয় কুসংস্কার মানুষের যুক্তিবোধকে আচ্ছন্ন করে এবং তাদের মননশীলতাকে সংকীর্ণ আবর্তে ঢেকে দেয়। ১৯৪৭ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তি ঘটে। অবিভক্ত বাংলার ভূগোল সমাজ সংস্কৃতি ও জনজীবন সাম্প্রদায়িক বিভাজনে দ্বিখণ্ডিত হয়। ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবে পূর্ববাংলার মানুষের জীবনের সৃষ্টি হয় নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বস্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিপরীতে দেশ বিভাজন ধর্মীয় গোঁড়ামির দারিদ্র্যের, সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার অযাচিত ব্যবহার মানবসত্তার মর্মমূলে গভীর অভিঘাত সৃষ্টি করে। আবু ইসহাক তার সাহিত্যকর্মে গ্রামের এই জীবনযাপন অর্থনৈতিক সংকট, ধর্মীয় বিশ্বাসের সামাজিক ব্যবহারকার এবং মানুষের ভেতরের মনস্তত্ত্ব বাস্তববাদী দৃষ্টিতে তুলে ধরেন। বিক্ষিপ্ত সময়ের প্রবাহে বিপর্যস্ত মানুষের জীবনচিত্র তিনি শুধু মূর্তিমান করেননি বরং একই সঙ্গে উন্মোচন করেছেন সমাজের অভ্যন্তরের শোষণ, ভয়, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রবঞ্চনায় পীড়িত যাপিত জীবনের সংকট।

বিপরীতে সমস্যার গভীরে গিয়ে তিনি কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম পর্বে গড়ে ওঠা তার সাহিত্যে দেশবিভাগ-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতাকে বিচার করার শক্তিশালী শিল্পভাষা নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দেন। আবু ইসহাকের প্রথম প্রকাশিত রচনা ছোটগল্প ‘অভিশাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। প্রথম উপন্যাস ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ ১৯৫০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত। স্বাধীনতার পর প্রকাশিত হলেও এ উপন্যাসে ঔপনিবেশিক সময়ের দুর্ভিক্ষ, গ্রামীণ দারিদ্র্য এবং দেশবিভাগ-পূর্বকার সামাজিক বিপর্যয় দেখা যায়। ফলে গ্রামীণ জীবনের অন্তর্গত সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব অন্বেষণ তার কাহিনির প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। ‘দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে অপরাজেয় জীবনের অনুপম আলেখ্য নির্মাণ করেছেন ঔপন্যাসিক।’

উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত একটি পরিত্যক্ত বাড়িকে কেন্দ্র করে। সাধারণ মানুষের ধারণায় অভিশপ্ত বাড়িটির অমঙ্গল ও ভয়কে তুচ্ছ করে জয়গুন তার সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নেয়। ফলে বাড়িটি তখন আর আশ্রয় নয় বরং অন্ধবিশ্বাসের বিপরীতে সংঘাতের প্রতীক হয়ে ওঠে। ধর্মের নামে সামাজিক বিধিনিষেধের ছায়ায় নারী স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে গরিব মানুষের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় সংকটকে তীব্র করে তোলে। ফলে ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি, তাই সমাজের প্রভাবশালীদের শক্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। ঔপন্যাসিকের লক্ষ্য তাই ধর্ম না হয়ে, ধর্মের অপব্যবহারই মুখ্য ও স্পষ্ট রূপ নেয়। সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রভাবশালীরা ধর্মীয় বিধান ও মনোজগতের ভণ্ডামি আর ক্রূরতা দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে, আর তখনই তাদের কথাই নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণকারীতে পরিণত হয়। এখানেই ‘সূর্য-দীঘল বাড়ীর’ ধর্মীয় কর্তৃত্ব, পুরুষতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জয়গুনকে বড্ড অসহায় করে। উপন্যাসে জয়গুনের দুর্দশা তাই তার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি না হয়ে বরং একটি অসম সমাজব্যবস্থার নির্মম পরিণতি মূর্ত করে। অবশ্য সে অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে জয়গুন। ধর্মীয় বিধিনিষেধ অমান্য করায় জয়গুনকে একঘরে করে ইমামের ফতোয়া। কিন্তু জয়গুন তাতে টলেনি, ভয়ও পায়নি। বরং সে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দেয়-‘খাইট্যা খামু। কেওরডা চুরি কইর‌্যাও খাইনা, খ’রাতও খাইনা। কউক না যার মনে যা।’

‘পদ্মার পল্লী দ্বীপ’ আবু ইসহাকের দ্বিতীয় উপন্যাস। ভূমিকে কেন্দ্র করে সংঘাত এবং মানুষের আদিম প্রবৃত্তি উপন্যাসটির মূল প্রেক্ষিত। রচনাটি সামাজিক সংস্কারের সমালোচনা পাঠ হয়ে ওঠে। কাহিনিতে তালাক সামাজিক রীতি এবং পীরকেন্দ্রিক বিশ্বের ধর্মীয় সংস্কারক দেখা যায়। উপন্যাসের কাহিনি শুধু চর দখলকে নিয়ে পল্লবিত হয়নি, জমিজমা দখল ছাড়াও এখানে আছে নরনারী হৃদয়ের গভীরতা। আছে সুন্দরী রূপজানকে কাছে নিতে জঙ্গুরুল্লার পীর বাবাকে ব্যবহারের কথা। কাহিনির এক পর্বে রাজনীতির আলোও ফেলেছেন লেখক। ফজল জেলে গেলে সাক্ষাৎ হয় মতির সঙ্গে। রাজনৈতিক কর্মী মতির কাছে সে দীক্ষা পায় উদারতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতার। শোষকের বিরুদ্ধে চেতনা জাগ্রত হয় তার। সে বুঝতে পারে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা ও নিজের ভেতরের সদর্থক পরিবর্তন। উপন্যাসে পীরকেন্দ্রিক ঘটনাপ্রবাহের তাৎপর্য বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে বিচার করা যায়। যখন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সামাজিক প্রভাব যুক্তিবিচার ও নৈতিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে ওঠে, তখনই ব্যক্তির বিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসাবে ব্যবহারের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ঔপন্যাসিক তার সৃষ্টিতে এ ধরনের কর্তৃত্বের সামাজিক কার্যকারিতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার পথকে মুক্ত করে দেন। আবু ইসহাকের সাহিত্যিক দৃষ্টির তাৎপর্য হলো তিনি সামাজিক সংস্কারকে অপরিবর্তনীয় সত্য হিসাবে গ্রহণ করেন না কখনো। বরং মানুষের অভিজ্ঞতা সম্পর্ক ও বিবেকের আলোকে তার গ্রহণযোগ্যতা বিচার করার পথ তৈরি করেন।

দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনবোধ ও রচনাশৈলীর মুনশিয়ানা আবু ইসহাকের ছোটগল্পের অনন্য দিক। গল্পগ্রন্থ ‘হারেম’ ও ‘মহাপতঙ্গ’-এর একুশটি গল্পের বিষয়বস্তু মূলত দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের বাঁচার সংগ্রাম, সামাজিক আকাঙ্ক্ষা, লোকোবিশ্বাসের প্রভাব, পারস্পরিক সম্পর্কের দ্বন্দ্ব, ক্ষমতাবানদের প্রভাব এবং পরিবর্তনশীল সমাজের অস্থিরতা। তার গল্প বাংলার চিরন্তন রূপকেন্দ্রিক নয়, সময় ও সমাজের পরিবর্তনের প্রবাহে ভাঙা-গড়ার দোদুল্যমানতায় বিপর্যস্ত এবং একই সঙ্গে নতুন রূপ প্রত্যাশার ইঙ্গিতবাহী। এ কারণে আবু ইসহাকের ছোটগল্প বিশ্লেষণে সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা, মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক অবস্থান, ধর্ম ও লোকাচারের পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রেণিবৈষম্য এবং মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনকে পর্যবেক্ষণে নিতে হয়। দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও আবু ইসহাকের গল্পে রেখায়িত সমাজচিত্র আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

ধর্ম সম্পর্কে তার অভিমত-‘ধর্ম যার যার ব্যক্তিগত অনুরাগের বিষয়। ধর্মকে পুঁজি করা কোনো মৌলিক লেখকের কাজ নয়।’ আবু ইসহাকের গল্পে সহজসরল মানুষের ধর্মবিশ্বাস, ধর্মের প্রতি অন্ধ আবেগ, গোঁড়ামি, মহাজনদের পীড়ন এবং পীর-দরবেশের প্রতি অতিনির্ভরতা বারবার প্রতিবিম্বিত হয়েছে। ‘কানাভুলা’ গল্পের ভেতর গ্রামের সরল মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে পীর ব্যবসার বিকৃত রূপ বিবৃত হয়েছে। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর প্রসবকষ্ট লাঘবে জাহিদ মায়ের পরামর্শে পীরের কাছে পানি পড়া আনতে ছোটে। পীরের মহিমা লক্ষ করে জাহিদের মা বলেন-‘তেনার পানি পড়া খাইলে বিনা কষ্টে খালাস অইয়া যাইব।-আর হোন হুজুরের মোখের কাছে বোতল নিসনা। তেনার ফুঁ-এর তেজে কিন্তু বোতল ফাইট্যা চৌখণ্ড অইয়া যাইব।’ কিন্তু পানি পড়া নিয়ে ফিরতেই জাহির পীরের বাড়ি থেকে ডাক্তার ও নার্সকে বের হতে দেখতে পায়। ‘জাহিদ আশ্চর্য হয়। পীর সাহেবের বাড়িতেও তাহলে এদের দরকার হয়।’ জাহিদের স্ত্রী ও পীরের মেয়ের সন্তান প্রসব-এ দুটি ছবি গল্পকার পাশাপাশি এনে একদিকে পীরের কেরামতির অসারতাকে এবং অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বকে স্পষ্ট করেছেন। গল্পের শেষে জাহিদের মায়ের চাপে পীরকে দেওয়ার নজরানা ও মিষ্টি লেডি ডাক্তারকে দিয়ে গল্পকার মানুষের অন্ধবিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। ‘শয়তানের ঝাড়ু’ গল্পের বিষয়ও পীর ব্যবসা। গল্পে হাজি বাবার অলৌকিক কর্মে গ্রামের মানুষ বিমোহিত। কিন্তু প্রধান চরিত্র মোতাহার মঞ্চে জাদু দেখালে মানুষের মনে পীরের অলৌকিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দোলাচল শুরু হয়। জাদুকরের খেলা দেখার পর মানুষের মনে পরের কেরামতির ধর্মীয় মাহাত্ম্যে সন্দেহ দেখা দেয়। জাদুকরের ম্যাজিকের চমৎকারিত্ব মানুষের চিরায়ত বিশ্বাসের পরম্পরায় ফাটল ধরায়।

‘দাদির নদী দর্শন’ নদীবিধৌত বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে জীবনে একবারও নদী দেখেননি এ গল্পের দাদি। চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের পর থেকে অন্দরমহলে কাটিয়ে দেন সারা জীবন। ‘পুরোনো সবকিছুই তার ভালো লাগে’ দাদির। আধুনিক জিনিসের মধ্যেই তিনি হারাম ও পাপ দেখতে পান। তার মতে, বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা কুফরি এলেম। নিজের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠায় তিনি জিহাদ পর্যন্ত ঘোষণা করেন। মীর গৃহে গৃহবিবাদ শুরু হয়েছে অনেকবার। এ বিবাদকে দাদি বলেন জেহাদ। জিহাদ হয়েছে ছেলেদের ইংরেজি পড়া নিয়ে, গ্রামোফোন-রেডিও বাজানো আর দেওয়ালে ছবি টাঙানো নিয়ে। ধর্মীয় অজ্ঞতা দাদির ভেতর এত প্রবল যে মৃত্যু পথযাত্রী হয়েও তিনি ডাক্তারের কাছে যাননি।

‘আবর্ত’ গল্পটি দুটি সরল প্রাণের অকালে বিনষ্টির চিত্র। যুবক-যুবতির প্রেমকে লেখক এখানে ট্র্যাজেডির আবহে রাঙিয়েছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নুরজাহান। গভীর ভালোবাসা দিয়েও ইউনুসকে পায়নি নুরজাহান। বিড়ম্বনার শিকার প্রেমিক ইউনুস। দাদা বেঁচে থাকতে বাবার মৃত্যু হলে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে সে বঞ্চিত হয়। চাচা ওমর মোড়লের হাত-পা ধরে এক বিঘা জমি পেলেও কিছুদিন পর তার প্রতারণায় ইউনুস আবার নিঃস্ব হয়ে যায়। ‘মোড়লের গ্রাম্য রাজনীতির কাছে হেরে যায় ইউনুস।’ চাচার লাম্পট্যের কাছে প্রেমিক ও জমি দুটোই হারায় সে।

আবু ইসহাকের ছোটগল্পে মুসলিম সমাজের জীবন-সংগ্রাম বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ‘জোঁক’ গল্পটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গল্পটিতে শ্রমজীবী মানুষের শোষণ, শ্রেণিগত বৈষম্য এবং শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সম্ভাবনা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। গল্পের ‘জোঁক’ শিরোনামটি নিজেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক। জোঁক যেমন মানুষের শরীর থেকে রক্ত শোষণ করে বেঁচে থাকে, ঠিক তেমনই মানুষ নামক কিছু জোঁক মানুষকে নির্মমভাবে শোষণ করে। গল্পটিতে গল্পকার রূপক-প্রতীক আশ্রয়ী, জোঁকের প্রতীকে ভূমি মালিকদের শোষণ ও নির্যাতনের চিত্র নিখুঁতভাবে বিস্তারিত করেছেন। গল্পের শেষে আমরা জোঁকের মতো ভয়ংকর জোরদার মহাজনদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে জেগে উঠতে দেখি। গল্পটির মূল মেসেজ সমাজের শোষণের শিকল ভেঙে একটি নতুন সমাজ নির্মাণের দৃঢ়প্রত্যয়।

‘মহাপতঙ্গ’ আবু ইসহাকের একটি ব্যতিক্রমী গল্প। একজোড়া চড়ুই পাখির দৃষ্টিকোণ থেকে গল্পটি বর্ণিত হয়েছে সত্য। কিন্তু শ্রেণিবিভক্তহীন, শোষণমুক্ত ও কল্যাণকামী সমাজের প্রতি গল্পকারের যে দুর্বলতা, তা শিল্পিত অঙ্গীকারে রূপায়িত হয়েছে এখানে। লেখক নিজে বৈশ্বিক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ গল্পের ভেতরের উপস্থাপনায় তা পরিষ্কার। বিজ্ঞানের অবদান অনেক সময় আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়, প্রতিধর্মী গল্প মহাপতঙ্গ সে লক্ষ্যেই রচিত। আবু ইসহাকের গল্পগুলো বর্ণনাধর্মী। আঙ্গিক ও ভাষাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গল্পকারের সাফল্য প্রশ্নাতীত হয়তো নয়। কিন্তু গল্পে গ্রামীণ জীবনের চিত্রের গল্পে উপস্থাপনায় তিনি গভীর বস্তুনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন।

আবু ইসহাকের উপন্যাস ও গল্পে নিবিড় পাঠ দিলে সমাজের চেতনার দ্বান্দ্বিকতা যে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক সংস্কারের সংঘাতে নয়, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা লক্ষ করি ঐতিহ্য, আধুনিকতা, বিশ্বাস-যুক্তি, সংস্কার-মুক্ত বুদ্ধি এবং সামাজিক অনুশাসন ও ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যের মধ্যকার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত দ্বন্দ্ব তিনি তার কথাসাহিত্যে প্রতিভাত করেছেন।

আবু ইসহাকের কথাসাহিত্যকে দেখতে হবে সমাজের আত্মসমালোচনা, চেতনাগত সংঘাত এবং পরিবর্তনের অন্তর্লীন আকাঙ্ক্ষার শৈল্পিক দলিল হিসাবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মকবুলা মঞ্জুরের সাহিত্যভুবন: সময়, সমাজ ও মানুষের অন্তর্জীবনের কথন

মকবুলা মঞ্জুরের সাহিত্যভুবন: সময়, সমাজ ও মানুষের অন্তর্জীবনের কথন

এআই দিয়ে লেখা বইয়ের জন্য চালু হলো নতুন সাহিত্য পুরস্কার

এআই দিয়ে লেখা বইয়ের জন্য চালু হলো নতুন সাহিত্য পুরস্কার

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

ঐতিহ্য প্রকাশ করবে কবি ও সম্পাদক ‘আবদুল হাই শিকদার-রচনাবলী’

শেখ রবিউল হকের ৮০ বছরের সৃজনযাত্রা উপলক্ষে চিত্রপ্রদর্শনী

শেখ রবিউল হকের ৮০ বছরের সৃজনযাত্রা উপলক্ষে চিত্রপ্রদর্শনী

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের চিরবিদায়

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলামের চিরবিদায়

‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ এবং রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক

সৃজনের মাসিক পাঠচক্র ‘মৃত্যু ও নির্বাসন’ এবং রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক

আরও পড়ুন

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

গল্প রূপান্তর

রূপান্তর

এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতার নির্ভীক স্থপতি

এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতার নির্ভীক স্থপতি

পূর্ববঙ্গের ভাষা : শেষ পর্ব সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য

সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম