কবিতার ছোট কাগজ
Advertisement
আতাহার খান
প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কবিতা এবং কবিতাবিষয়ক রচনাসহ ২০০ পৃষ্ঠার ছোট কাগজ ‘একান্নবর্তী’ হাতে এসে পৌঁছেছে। খুবই পরিপাটি পত্রিকা। এটি দ্বিতীয় সংখ্যা। ভালো লাগল চলতি সংখ্যার আয়োজন দেখে। দুই মলাটের ভেতরে আছে গত শতাব্দীর ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই এবং একবিংশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত মোট ৪৪ জন কবির ১৪৫টি কবিতা। ছাপা হওয়া কবিতাগুলো নিয়ে আছে একটি দীর্ঘ রচনা। সঙ্গে রয়েছে পাঠক-প্রতিক্রিয়া। একই রকম আয়োজনে দু’দুটি সংখ্যা কবিতা-পাঠকের হাতে সগৌরবে পৌঁছে দেয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, সম্পাদক শেলী সেনগুপ্তা রীতিমতো আপসহীন, তিনি এরই মধ্যে দুটি সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। প্রতিটিরই পৃষ্ঠা সংখ্যা ২০০-এর ওপরে। শুনলাম তৃতীয় সংখ্যার কাজও নাকি শেষ হওয়ার পথে। অয়োজন দেখে মনে হয় তিনি ছোট কাগজের জগতে কিছু উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করার জন্যই এগিয়ে এসেছেন। এ সাহসী মানুষ সত্যই বিরল গুণের অধিকারী। ‘একান্নবর্তী’র সম্পাদনার বাইরে তার আরও একটি পরিচয়, তিনি একজন কবি ও গল্পকার।
আমাদের এখানকার ছোট কাগজগুলো দেখে আমার বিস্ময়ের পারদ আকাশ অবধি ধাঁই ধাঁই করে উঠে যায়। হিসাব মিলাতে পারি না বিজ্ঞাপন ছাড়া এ ব্যয়ভার কীভাবে বহন করা হয়? হয়তো কেউ কেউ আছেন, পেছন থেকে সাহায্য করছেন, কিন্তু তাদের সংখ্যা এত কম যে শতাংশের নিক্তিতে আলোচনাতেই আসে না! অর্থনীতির জটিল বিষয় নিয়ে যারা দিন-রাত পার করেন, তারা হয়তো একে বলবেন, পুরো অর্থ আর শ্রমই জলে ফেলে দেয়া হল। আমি অতটা রূঢ় কথা বলতে পারব না। তবে মানি, যিনি কবিতাকে শুধু ভালোবাসেনই না, মনে-প্রাণে ও রক্তেও অবিরত জিইয়ে রাখেন, তার পক্ষে সাজে এ পাগলামি। যেমন ‘কৃত্তিবাস’ নিয়ে এ রকম
উন্মাতাল হয়ে উঠেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তখন তার সঙ্গে ছিলেন শক্তি চট্টপাধ্যায়, শরৎ কুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপল কুমার বসু, তারাপদ রায় প্রমুখ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কৃত্তিবাস’ ১৯৫৩ সাল থেকে শুরু করে ব্যতিক্রমধর্মী কবিতা পত্রিকা হিসেবে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। তারপর আকস্মিক বন্ধ হয়ে যায় পত্রিকাটি। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ‘কৃত্তিবাস’ আবারও বেরোয়, কিন্তু তার চরিত্র যায় পাল্টে।
এরও অনেক আগে, কল্লোল যুগে কবিতার ছোট কাগজ প্রকাশিত হয় একাধিক। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের পঞ্চপাণ্ডবের এক কীর্তিমান পুরুষ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ১৯৩১ সাল থেকে টানা ১২ বছর ‘পরিচয়’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে কবিতা তো গুরুত্বসহ থাকতই, উপরন্তু মুক্ত বুদ্ধিচর্চা ও মননশীল রচনাও সমান আগ্রহ নিয়ে ছাপা হতো। পঞ্চপাণ্ডবের আরও এক নক্ষত্র, ত্রিশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি বুদ্ধদেব বসু ‘কবিতা’ পত্রিকা নিয়ে ছিলেন ভীষণ সরব। সেখানে তিনি তার নির্বাচিত কবিদের কবিতা ছাপতেন, পাশাপাশি ছাপতেন কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ এবং কবিতা বইয়ের ওপর আলোচনা।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’ ও বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ এবং পাশাপাশি ‘প্রগতি’, ‘কালিকলম’ ও ‘পূর্বাশা’ পত্রিকাগুলো সম্মিলিতভাবে রবীন্দ্র বৃত্তের বাইরে এসে আধুনিক কবিতার জগৎ তৈরির ক্ষেত্রে রাখে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। আর এর কাণ্ডারিরা হলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চত্রবর্তী, অচিন্তকুমার সেনগুপ্ত, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ। এ গোষ্ঠীর পাশাপাশি কাজী নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন সম্পূর্ণ নতুন চিন্তা ও কাব্যভাষা নিয়ে উপস্থিত হন। তবে মানতেই হবে, আধুনিক বাংলা কবিতা আন্দোলনের প্রকৃত নেতৃত্ব ছিল সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বুদ্ধদেব বসুর হাতে। তবে বুদ্ধদেব বসুর দৃষ্টি ছিল আরও সুদূরপ্রসারি- তিনি তার ‘কবিতা’ পত্রিকাকে শুধু সমকালীন কবিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং পরবর্তী প্রজন্ম চল্লিশ তো বটেই, পঞ্চাশের দশকের কবিদেরও মাটির ওপর দাঁড়ানোর জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এই মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই আমাদের এ অঞ্চলের শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দীন ও শহীদ কাদরীর কবিতা বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপা সম্ভব হয়েছিল।
আমরা জানি, ‘পরিচয়’. ‘কবিতা’ ও ‘কৃত্তিবাস’ এই তিন পত্রিকার সম্পাদকেরই প্রথম এবং প্রধান পরিচয় হল কবি, এবং তাদের অগাধ কবিতা-প্রেমের বিষয়টিও নানা কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন। দিন নেই, রাত নেই, কবিদের নিয়ে সে কী জমজমাট আড্ডা! কবিতা নিয়ে চলত সীমাহীন বৈঠকি সভা, এমনকি কবিতার ভাষা, ভাবনা, ছন্দ নিয়েও রচিত হতো নানা পরীক্ষাধর্মী প্রবন্ধ, কবিতার ওপর গদ্য রচনা, কবিতা বই আলোচনা, কত কিছুই না হতো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, এ তিন (কবিতা, পরিচয়, কৃত্তিবাস) পত্রিকাকে ঘিরে। বিশেষ করে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বুদ্ধদেব বসুর ভূমিকা ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী, রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে এসে কবিতাকে আধুনিক মোড়কে প্রতিষ্ঠা করা, সেটি ছিল সত্যই এক দুঃসাহসী লড়াই।
পশ্চিম বাংলায় পরবর্তীতে আরও বেশ কিছু কবিতার ছোট কাগজ আলোচনায় উঠে আসে। এর মধ্যে রয়েছে উত্তম দাশের সম্পাদিত ‘মহাদিগন্ত’। প্রায় ১০০টির মতো সংখ্যা প্রকাশিত হয় এর। কবিতাকে ভালোবেসে কবিতার জন্য কবি উত্তম দাশের এ আত্মনিবেদন সন্দেহ নেই পরবর্তী প্রজন্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রাখবেন। হ্যাঁ, আরও স্মরণে আনতে হবে পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের ‘কবিতাপত্র’, অলোক বিশ্বাস সম্পাদিত ‘কবিতা-ক্যাম্পাস’ ও শ্যামলকান্তি দাশের ‘কবি সম্মেলন’-এর কথা। শুধু কতিাকে ভালোবেসে, সংসার-ধর্মের দায়-দায়িত্বের কথা না-ভেবে কবিতাপত্র প্রকাশ করার তাদের এ অদম্য ইচ্ছাকে বিনীতভাবে জানানো উচিত আন্তরিক শুভেচ্ছা।
আমাদের দেশেও টিকে রয়েছে বেশ ক’টি কবিতাপত্রিকা। এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে ‘কবিকণ্ঠ’ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে, ১৯৫৬ সালে শামসুর রাহমান ও ফজল শাহাবুদ্দীনের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘কবিকণ্ঠ’। তখন শামসুর রাহমানের বয়স ছিল ২৭ বছর আর ফজল শাহাবুদ্দীনের ২০ বছর। ‘কবিকণ্ঠ’ প্রকাশের সময়টা মোটেও অনুকূলে ছিল না, বলা যায় অনেকটা বৈরী পরিবেশ মোকাবেলা করতে হয়েছে তাদের। এ প্রেক্ষাপটে এ কবিতা পত্রিকার ভূমিকা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। পরে অবশ্য ফজল শাহাবুদ্দীনের একক সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘কবিকণ্ঠ’। তার সম্পাদিত কবিতা পত্রিকার চেহারা ছিল আলাদা। সব ক’টি পাতায় ছিল যত্ন আর রুচির ছোঁয়া। ছিল অঙ্গসৌষ্ঠবের ব্যতিক্রমী আয়োজন। দেখে মনে হতো অন্যদের থেকে এ কবিতাপত্রিকা পুরো আলাদা। সেখানে গুরুত্বসহ ছাপা হতো সমকালীন কবিদের কবিতাসহ কবিতাবিষয়ক কিছু রচনা, বিশেষ সাক্ষাৎকার, বই আলোচনা ইত্যাদি। প্রতিটি রচনাই ছিল সুসম্পাদিত ও মননশীলধর্মী। তাই ‘কবিকণ্ঠ’ যে-কোনো কবিতাপ্রেমিকের মনোযোগ কেড়ে নিত অনায়াসেই।
ষাটের দশক ছিল ছোট কাগজের জন্য উজ্জ্বল ক্ষেত্র। এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা ছিল আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’। শুধু ষাট নয়, সত্তরের দশকের কবি ও প্রাবন্ধিকদেরও মুখপত্র হয়ে উঠেছিল এই সাহিত্য পত্রিকা। এখানে লেখা ছাপা হওয়া মানে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ। প্রকাশনার ক্ষেত্রেও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছিলেন যথেষ্ট যত্নশীল। এ দশকে আরও কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা সবার মনোযোগ কাড়ে। এর মধ্যে আমিনুল ইসলাম বেদুর ‘সাম্প্রতিক’, রফিক আজাদের ‘টিপসহি’, রবিউল হুসাইনের ‘না’, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘স্বরগ্রাম’, কবি রফিক নওশাদের ‘কালপুরুষ’ এবং সালাইদ্দিন জাকির ‘কাক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকের আরও একটি বিখ্যাত ছোট কাগজ হল ‘স্বাক্ষর’- এটি এক এক সময়ে এক একজন পর্যায়ক্রমে সম্পাদনা করতেন, তার মধ্যে ছিলেন রফিক আজাদ, প্রশান্ত ঘোষালসহ আরও অনেকে। ষাট ও সত্তর দশকে উল্লিখিত ছোট কাগজগুলো শুধু কবিতাই নয়, সাহিত্যের অন্যান্য শাখাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তবে বিশুদ্ধ কবিতা পত্রিকা হিসেবে চিহ্নিত ছিল রবিউল হুসাইনের ‘না’, হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘স্বরগ্রাম’ এবং সালাউদ্দিন জাকির ‘কাক’। এ ক্ষেত্রে কবি আনওয়ার আহমদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তিনি দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। একটি হল ‘রূপম’, সাহিত্যের সব শাখাকে সমান গুরুত্ব দেয়া হতো সেখানে। আর অন্যটি হল বিশুদ্ধ কবিতা পত্রিকা ‘কিছুধ্বনি’। এখানে কবিতা তো থাকতই, তার ওপর কবিতাবিষয়ক প্রবন্ধ, কবিতা বইয়ের অলোচনা সমান গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো। ৩০ বছরের অধিক সময় ধরে পত্রিকাটি অনিয়মিতভাবে আনওয়ার আহমদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। আজকের প্রতিষ্ঠিত অনেক কবিরই যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘কিছুধ্বনি’র মাধ্যমে।
আমাদের এখানে সাহিত্য ও ছোট কাগজের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, কোনো কোনোটি তো রীতিমতো আগ্রহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে- এ ধরনের একটি পত্রিকা হল ‘অরণি’। এর সম্পাদক সত্তরের দশকের অন্যতম কবি মাহমুদ কামাল। পাঁচমিশালি লেখাই এখানে প্রাধান্য পায় বেশি। তবে ‘অরণি’র ষোলোতম সংখ্যা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী, ‘বাংলা কবিতার পঞ্চাশ বছর’ উপলক্ষে বের হয় এর একটি সুবৃহৎ সংখ্যা। তাতে উভয় বাংলার এক হাজার দশটি কবিতা স্থান পায়। সন্দেহ নেই, সংখ্যাটি বোদ্ধাশ্রেণির ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
এখনকার ছোট কাগজগুলোয় সাধারণত সাহিত্যের একটি শাখা হিসেবে কবিতার জন্য স্থান নির্দিষ্ট থাকে। বিশুদ্ধ কবিতাকেন্দ্রিক পত্রিকা খুবই কম, হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। তবে নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ২০০২ সাল থেকে আমিনুর রহমান সুলতান সম্পাদিত ছোট কাগজ ‘অমৃত্তাক্ষর’ প্রকাশিত হচ্ছে। প্রকাশিত হয়েছে এ পর্যন্ত ১৮টি সংখ্যা। এর মধ্যে অসীম সাহা, কামাল চৌধুরী ও মুহম্মদ সামাদকে নিয়ে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র। তাছাড়া সত্তর- আশি-নব্বই দশকের কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘অমৃত্তাক্ষর’-এর বিশেষ একটি সংখ্যা।
আশির দশকের কবি শাহীন রেজা সম্পাদিত ‘কবি এবং কবিতা’ নামক একটি ছোট কাগজ ২০১৮ সাল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে, এ পর্যন্ত এর চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এটি হল তার দ্বিতীয় দফার উদ্যোগ। নতুন করে নতুন নামে শুরু করেন কবিতার এ ছোট কাগজের প্রকাশনা। এর আগে তিনি কবিতাবিষয়ক ছোট কাগজ ‘ঘাসফুলপাখি’ বের করতেন। মোট ছয়টি সংখ্যা প্রকাশিত হয় তার। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হঠাৎ করেই ‘ঘাসফুলপাখি’ প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। তবে নব্বই দশকের কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত ছোট কাগজ ‘শালুক’ সাহিত্যরসিকদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। এখানে সাহিত্যের সব শাখা সমানভাবে গুরুত্ব পায়। তার পরও কিছু কিছু বিশেষ সংখ্যা কবি, কবিতা এবং কবিতাবিষয়ক রচনা দিয়ে সাজানো হয়েছে। এর মধ্যে একটি সংখ্যা ছিল জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে ৫৪ ফর্মার বৃহৎ কলেবরের অয়োজন। সেখানে জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে ৫০টি প্রবন্ধ, জীবনানন্দ দাশের অপ্রকাশিত পাণ্ডুুলিপি, জীবনানন্দ দাশকে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি স্থান পায়। তাছাড়া ‘শালুক’-এর আরও কিছু কবিতাকেন্দ্রিক সংখ্যা প্রশংসার দাবি রাখে। তার মধ্যে শহীদ কাদরী ও সিকদার আমিনুল হকের ওপর দুটি বিশেষ সংখ্যা কবিতাপ্রেমিক মহলে ভীষণ সমাদৃত হয়। ‘শালুক’-এর আরও কয়েকটি সংখ্যার মধ্যে ‘দুই বাংলার নব্বইয়ের দশকের কবিতা’, ‘সমসাময়িক বাংলা কবিতা ও বিশ্ব কবিতা’, ‘আরব বিশ্বের আধুনিক কবিতা’ ইত্যাদি ছিল বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ বিশেষ সংখ্যা। নব্বইয়ের দশকের আরও এক কবি তৌফিক জহুর সম্পাদিত ‘উদ্যান’-এর নাম বিশেষ কারণে বলতে হয়। এর অধিকাংশ সংখ্যায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায় কবিতা ও কবিতাবিষয়ক রচনাগুলো। পাশাপাশি পাঁচমিশালি রচনা তো থাকছেই। প্রায় ২২ বছর ধরে ‘উদ্যান’ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।
ছোট কাগজগুলো বেরোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু যে অর্থ ও শ্রম এখানে বিনিয়োগ হয়, তার কোনো প্রতিদান নেই বললেই চলে। কোথাও কোন স্টলে ১০ কপি পত্রিকা দেয়া হল বিক্রির জন্য, ওই পর্যন্তই, বিক্রির টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো পথই থাকে না। এ রকম চারপাশের বৈরী অবস্থার কথা জানার পরও ‘একান্নবর্তী’ নিয়ে মাথা উঁচু করে এগিয়ে এসেছেন অস্বীকার করার উপায় নেই, গত শতক থেকে শুরু করে বর্তমান শতকের দ্বিতীয় দশক অবধি যতগুলো ছোট কাগজ বেরিয়েছে, এবং এখনও বেরোচ্ছে, সব ছোট কাগজ ঘিরেই আত্মপ্রকাশ করেছে অসংখ্য লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক। তাদের অনেকেই পরে বাংলাসাহিত্যে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আমরা জানি, একটি জাতির মননচর্চার জমিনটি বড় করে তোলেন লেখকরাই। অথচ লেখক সৃষ্টির যন্ত্র সেই ছোট কাগজগুলো ভালো নেই। মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি বহন করে এগোতে হয়। অর্থের অভাব থাকায় প্রকাশনার নির্দিষ্ট সময়ও ঠিক রাখা যায় না। হয়তো প্রেসের ছাপা-খরচ বাকি থাকে। তারপরও বেরোচ্ছে এসব ছোট কাগজ। হয়তো এখানে কেউ কেউ আছেন নেপথ্যে থেকে সাহায্য করছেন, আছেন বহু কবিতাপ্রেমিও, কিন্তু সেসব প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। রূঢ় বাস্তব হল, অর্থ সহায়তা নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো সুহৃদের অভাব প্রকট- এমনকি আমাদের কর্পোরেট অর্থনীতিও এদের পাশে এসে কখনও ভরসার হাত রাখে না। এটা সত্যিই দুঃখজনক। এসব ছোট কাগজের ভবিষ্যৎ মোটেও আলোকিত নয়। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিছুটা দায়িত্ব নিতে পারে। ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য যেমন অনুদান-প্রথা চালু আছে, ঠিক সেভাবে সাহিত্যের ছোট কাগজগুলোকেও মান অনুযায়ী অনুদান ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা যেতে পারে। তাতে সুবিধা হল, ভবিষ্যতে অনেক মেধাবী লেখক উঠে আসার পথ খুঁজে পাবেন।
