Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

বেঁচে থাকবেন স্বর্গছেঁড়ার

সমরেশ মজুমদার

Advertisement

Icon

রফিকুর রশীদ

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

বাগানের নাম স্বর্গছেঁড়া।

না, সাধারণ কোনো ফুলবাগান কিংবা সবজিবাগান নয়। বরেণ্য কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার রচিত অনন্য এক চা-বাগান। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ডুয়ার্সের চা-বাগানে শৈশব-কৈশোর কাটানো এ লেখকের চৈতন্যজুড়ে বিস্তৃত ছিল চা-বাগানের চিরহরিৎ স্মৃতি, ফলে তার উপন্যাসের পটভূমিতে যে কোনো চা বাগানের দৃশ্য উঠে আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তাই বলে স্বর্গছেঁড়া! কোথায় সেটির অবস্থান? সমরেশ মজুমদারের বিপুল জনপ্রিয় ট্রিলজি উত্তরাধিকার-কালবেলা-কালপুরুষের পাতাজুড়ে স্বর্গছেঁড়া চা বাগানের বিবরণ পড়তে পড়তে প্রবল কৌতূহল জাগে এ বাগান সম্পর্কে। ধুবগুড়ির সাংবাদিক বন্ধু ড. কৃষ্ণপদ দেবের মাধ্যমে জানতে পারি-সমরেশ তার উপন্যাসে যে চা বাগানের বর্ণনা দিয়েছেন বাস্তবে তার নাম স্বর্গছেঁড়া নয়, অন্যকিছু। তাহলে স্বর্গছেঁড়া এলো কোথা থেকে? সিদ্ধান্তে আসতে হয়-এ নাম শিল্পীর কল্পনা থেকে পাওয়া। এ বছর বাঙালি জাতি যখন রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উদযাপনের জন্য প্রস্তুতিমুখর, তখনই সহসা ভেসে আসে এ অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃসংবাদ-কথাশিল্পী সমরেশ মজুমদার চিরতরে চলে গেলেন এ চরাচর ছেড়ে, বিশাল পাঠকরাজ্যে মর্মন্তুদ হাহাকার ছড়িয়ে তিনি চলে গেলেন সমূহ দৃশ্যমানতার অন্তরালে, এমনকি তার স্বর্গছেঁড়া ছেড়ে চলে গেলেন স্বর্গের পথে।

যে যতই বিনয় প্রকাশ করুন না কেন, এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, লেখকমাত্রই সাধনা করেন পাঠকহৃদয়ের রুদ্ধ দুয়ার খুলে সেখানে নিজের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার। নিজের আনন্দের কথা ভেবে লেখালেখির সূচনা হলেও প্রত্যেক লেখকেরই আকাঙ্ক্ষা থাকে পাঠকহৃদয় জয় করার। এ জয়ের সঙ্গে জবরদস্তির কোনো সম্পর্ক নেই। কার রচনা পাঠক কীভাবে গ্রহণ করবে অথবা প্রত্যাখ্যান করবে এ সার্বভৌম স্বাধীনতা একান্তই পাঠকের। বাংলা সাহিত্যের পাঠকেরও রুচি-শিক্ষা-জীবনদৃষ্টিভেদে শ্রেণিকরণ করা যেতে পারে। প্রায় সব শ্রেণির পাঠকের হৃদয় দুয়ারে প্রবেশাধিকার ক’জন লেখকই বা লাভ করেন! এ জাদুকরী ক্ষমতা নিয়ে বাংলা কথাসাহিত্যের জগতে পা রাখেন সমরেশ মজুমদার। থিয়েটারের প্রতি প্রবল অনুরাগ ছিল তার। নাটক লিখতে গিয়ে ‘অন্যমাত্রা’ নামে গল্প লিখে যাত্রা শুরু করেন কথাসাহিত্যের জীবনঘনিষ্ঠ চত্বরে, ১৯৬৭ সালে দেশ পত্রিকায় তা ছাপা হয়। প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। তারপর কত গল্প কত উপন্যাস! এমনকি চিত্তাকর্ষক কিশোর সাহিত্যও রচিত হয়েছে তার হাতে। তার কলমের সর্বোচ্চ শক্তির ব্যবহার হয়েছে কথাসাহিত্যেই। বাংলাভাষার কথাসাহিত্যের দিগন্ত বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে তার হাতে, প্রতিটি উপন্যাস অতিক্রম করেছে পূর্ববর্তী উপন্যাসকে, এভাবে তিনি সত্যিই অন্য এক উচ্চতা স্পর্শ করেছেন এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তিনি পেয়েছেন গণনঅযোগ্য পাঠকের ভালোবাসার মূল্যে।

অসংখ্য পাঠককে আজীবন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করার মতো বিরল প্রতিভা নিয়েই জন্মেছিলেন সমরেশ মজুমদার। মোহাবিষ্ট পাঠকগোষ্ঠী লেখক সমরেশ মজুমদারের আবেশ থেকে বেরিয়ে আসতেই চান না অথবা পারেন না। জনপ্রিয় ধারার লেখকদের করাতের মুখে পা ফেলে চলতে হয়। করাতের দু’মুখো ধার-একদিকে জনপ্রিয়তা অন্যদিকে কলাকৈবল্য। তার রচনায় শিল্পমান অক্ষুণ্ন রইল কিনা তা নিয়ে সুস্থ তর্কের বদলে ঈর্ষাপ্রসূত কূটতর্কের মুখোমুখিও হতে হয় অনেক সময়। সমরেশ মজুমদার এ সব কখনো পাত্তা দিয়েছেন বলে মনে হয় না, তার ভক্তকুলও কানে তোলেননি এমন ধারার অভিযোগ।

সমরেশ মজুমদারকে বাঙালি পাঠক সম্ভবত বেশি করে মনে রাখবে পশ্চিমবঙ্গের একদা আলোচিত নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা তার সর্বাধিক পঠিত ত্রয়ী উপন্যাস উত্তরাধিকার-কালবেলা-কালপুরুষের জন্য। বলা যায় এগুলো তার লেখক-জীবনের গোড়ার দিকের রচনা। এ তিন উপন্যাসের জনপ্রিয়তা তাকে রাতারাতি একেবারে তারকালেখকের খ্যাতি এনে দেয়। বহু পরে এ ত্রয়ী উপন্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এ ধারার চতুর্থ উপন্যাস মৌষলকাল। বাংলাভাষায় ত্রয়ী উপন্যাস আমরা আগেও পেয়েছি। বিশেষ করে গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ত্রয়ী উপন্যাস কলকাতার কাছেই, উপকণ্ঠে এবং পৌষফাগুনের পালার কথা বলতেই হয়। শতব্দীর পেছন থেকে কাহিনি টেনে এনে উপস্থাপন করা হয়েছে সেখানে। কিন্তু সমরেশ মজুমদারের ত্রয়ী একেবারে নিকট-অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাস্তবতায় রচিত হয়েছে। সার্থক দুই লেখকের ত্রয়ী উপন্যাসের প্রেক্ষাপটের মধ্যে প্রধান পার্থক্য এখানে। গত শতকের সত্তর দশকে পশ্চিমবঙ্গে সংঘটিত নকশাল আন্দোলনের রক্তখচিত পরিপ্রেক্ষিতে রচিত হয়েছে সমরেশের ত্রয়ী উপন্যাস। সমাজ বদলের উন্মাতাল উন্মাদনায় অস্থির যুবসম্প্রদায় এ তিন উপন্যাসে প্রাণ সঞ্চার করেছে। একেবারে সমসাময়িককালের ঘটনাকে আশ্রয় করে উপন্যাস রচনায় কতটা ঝুঁকি আছে সে সম্পর্কে লেখক যথেষ্ট সচেতন। তাই কালবেলা উপন্যাসের গোড়াতেই চমৎকার বিবৃতি দিয়েছেন এভাবে, ‘ভরদুপুরে নিজের ছায়া দেখা যায় না। ছায়া যখন দীর্ঘতর হয়, তখন তার আদল দেখে কায়াকে অনুমান করাও সহজ কাজ নয়। এই সেদিন যেসব ঘটনা ঘটে গেল এ দেশে তাই নিয়ে কিছু লিখতে বসার সময় হয়েছে কি না এ সংশয় থাকতেই পারে। সমসাময়িক কিছু নিয়ে লেখার মুশকিল হলো আমাদের দেখাটা অন্ধের হস্তিদর্শন হয়ে যায়।’

নিজের ভেতরে পরিষ্কার এ উপলব্ধি থাকা সত্ত্বেও সমরেশ মজুমদার সেই ঝুঁকি নিয়েছেন দুঃসাহসে বুক বেঁধে। দ্বিধা থরোথরো টালমাটাল সেই সময়টাকেই ধরতে চেয়েছেন তার মহাকাব্যিক ব্যাপ্তিসম্পন্ন এ ট্রিলজিতে। এ ত্রয়ীর পরে লেখা গর্ভধারিণী উপন্যাসেও আমরা দেখতে পাই শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর চার বন্ধু বিপ্লবের পথ বেছে নিয়েও শেষে বিভ্রান্তির চোরাগলিতে আটকা পড়েছে। জয়িতা কিন্তু আসন্ন বিপ্লবকেই গর্ভে ধারণ করে চমকে দিয়েছে পাঠককে। সমসাময়িক স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ নিয়ে উপন্যাস রচনা করতে গিয়ে অনেক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ঠিক সমান্তরাল দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো পোষণ করেননি লেখক, সে দায় একজন সৃষ্টিশীল লেখক কেনইবা মাথায় তুলে নেবেন! সমরেশ মজুমদার নিজেই প্রশ্ন রেখেছেন কালবেলার ভূমিকায়-‘কালেবলা কি রাজনৈতিক উপন্যাস?’ পরের বাক্যে এ প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন, ‘আমি জানি না। কারণ এ ধরনের সাইনবোর্ডে আমি বিশ্বাসী নই।’ তবে আর ভয় কী! নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতেই তার দেখা অস্থির সেই সময়কে মেলে ধরেছেন কালজয়ী ত্রয়ী উপন্যাসে।

রাজনীতিমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গিই সমরেশ মজুমদারের অধিকাংশ জনপ্রিয় উপন্যাসের চালিকাশক্তি হয়ে কাজ করেছে। অথচ এসব উপন্যাসে প্রতিফলিত রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা পাঠকমহল যে খুবই প্রভাবিত হয়েছে এমন হয়তো নয়, তবু অসংখ্য পাঠক নেশায় বুঁদ হয়ে পাঠ করেছে তার উপন্যাস। কিন্তু কেন এ পাঠকপ্রিয়তা! আমার মনে হয় পাঠকের বুকের ভেতরের নায়কসত্তাকে নাড়িয়ে দিয়ে লেখক এক অদ্ভুত খেলা খেলতে ভালোবাসেন। এখানে তিনি সফল এবং অনন্য। পাঠক থাকে হিরোইজমের ঘোরের মধ্যে মগ্ন হয়ে। এ প্রসঙ্গে কালপুরুষ উপন্যাসের ফ্ল্যাপ থেকে উদ্ধৃত করা যায়, ‘সত্তর দশকের অগ্নিস াবী রাজনৈতিক পথপরিক্রমার শেষপর্বে কালবেলার নায়ক অনিমেষ আশা করেছিল তার পুত্র অর্ক তার সমাজতান্ত্রিক আদর্শের নিশানটি শক্ত হাতে বহন করে নিয়ে চলবে। কিন্তু সমকালীন অন্তঃসারহীন কুটিল রাজনীতি এবং পঙ্কিল সমাজব্যবস্থা অর্ককে করে তুলেছিল অন্ধকার অসামাজিক রাজ্যের প্রতিনিধি। কিন্তু যেহেতু তার রক্তের মধ্যে ছিল অনিমেষের সুস্থ আদর্শবাদ এবং তার মা মাধবীলতার দৃঢ়তা ও পবিত্রতার সংমিশ্রিত উপাদান, সেই হেতু তার বোধোদয় ঘটতে বিলম্ব হয়নি। এক ভিন্ন মানসিকতায় সে আহ্বান শুনেছিল চিরকালীন মানবতার।’

এখানেই আশাবাদে উচ্চকিত হয় পাঠক, হৃদয়ের গভীরে আগামী পৃথিবীর সুন্দরতম এক মানচিত্র বিছিয়ে দেয়, সমূহ নৈরাজ্যের মধ্যেও জাগিয়ে তোলে নতুন আশাবাদ। সমরেশ মজুমদারের সাহিত্য পাঠের সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে এখানে। পাঠকের হৃদয়বেদিতে আশাবাদের আলোকশিখা জ্বালিয়ে দিয়ে জীবনবাদী একজন লেখক সত্যিই কি হারিয়ে যেতে পারেন অনন্ত অন্ধকারে? গর্ভধারিণীর জয়িতা বিপ্লবের যে স্বপ্ন আপন গর্ভে ধারণ করেছিল, সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যু নেই সমরেশ মজুমদারের। তিনি বেঁচে থাকবেন আগামীকালের অসংখ্য অর্কের চোখের তারায় প্রেরণার দ্যুতি হয়ে।

জন্ম ১০ মার্চ ১৯৪২ মৃত্যু ৮ মে ২০২৩

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

গল্প রূপান্তর

রূপান্তর

এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতার নির্ভীক স্থপতি

এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতার নির্ভীক স্থপতি

পূর্ববঙ্গের ভাষা : শেষ পর্ব সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য

সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম