Logo
Logo
×

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

দ্বিশতবর্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি

Advertisement

Icon

সাগ্নিক সরকার

প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

আদিতে কবি জন্মালেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিরাট সম্পদ ও ঐশ্বর্যের মধ্যে। অন্তে মৃত্যুবরণ করলেন পঞ্চাশ হাজার টাকার ঋণগ্রস্ত অবস্থায় এক দাতব্য হাসপাতালে দুঃসহ দুঃখ-দারিদ্র্যের মাঝে। মঝে উন্মোচন করে গেলেন বাঙালি জাতির সামনে সাহিত্য সাধনার এক নতুন দ্বার। এখানে আমরা উনিশ শতকের বাঙালি কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কথা বলছি।

শুধু বাংলাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে, মধুসূদনকে আমরা বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ কিংবা কাজী নজরুল ইসলামের মতো পরিশ্রমী বলতে পারি না; কিন্তু, তাকে বাংলাসাহিত্যের সবচেয়ে প্রতিভাবান লেখক বলে পরিচয় দিলে তা আমার মতে অসংগত হয় না। দেড়শ’ বছরের অধিক কাল ধরে তার রচনা আমাদের বিপুলভাবে প্রভাবিত করে আসছে। ড. হুমায়ুন আজাদ তার সম্পর্কে লিখেছেন:

‘মধুসূদন অনেক কিছু করেছেন তীব্র ঝোঁকের বশে, অনেকটা বাজি ধ’রে। তার ছিল অসামান্য প্রতিভা, তাই তিনি হঠাৎ দিগ্বিজয় করতে পেরেছেন। অন্যরা যা পারেন না অনেকদিন সাধনা করে, মধুসূদন তা করেন কলম হাতে নিয়েই।’

উনিশ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁসকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার এ ‘আসলাম, দেখলাম, জয় করলাম’-স্বরূপ প্রতিভার কোনো বিকল্প ছিল না। তার এ তেজই তাকে করে তুলেছে বাংলার নবজাগরণের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি তিনটি নাটক, দুটি প্রহসন, চারটি কাব্য এবং একশটি সনেট মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে প্রকাশ করেন (১৮৫৯-১৮৬৫)। এর আগে ও পরে তার আরও রচনা প্রকাশিত হয়েছিল।

এ আলোচনার শুরুতেই আমরা ‘মাইকেল মধুসূদন’ নামের সার্থকতা বিশ্লেষণ করব। এখানে একটি মজার বিষয় হলো তার নামকরণও সর্বাংশে সফল হয়েছিল। প্রথমত, ‘মাইকেল’-এর বিশ্লেষণ করা যাক। বাইবেলে ‘মাইকেল’কে একজন ‘আর্কেঞ্জেল’ (প্রধান দেবদূত বা ফেরেশতা) হিসাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে; যিনি ঈশ্বরবিদ্বেষী ‘লুসিফার’ বা শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করেন এবং ঈশ্বরের জয় ঘোষণা করেন। অপরদিকে ‘মধুসূদন’ বলতে শ্রীকৃষ্ণ বা বিষ্ণুকে বোঝানো হয়। অত্যাচারী ও পরপীড়ক রাক্ষস মধু ও কৈটভ-কে বধ করেছিলেন বলে শ্রীকৃষ্ণকে ‘মধুহন্তা’ বা ‘মধুসূদন’ নামে অভিহিত করা হয়।

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ‘মাইকেল’ ও ‘মধুসূদন’-এ দুটি শব্দ স্পষ্টতই দুষ্টের ও অত্যাচারের দমনকারী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু এ প্রেক্ষাপটে ‘দুষ্ট’ বা ‘অত্যাচারী’কে? বর্তমান আলোচনায় আমরা উনিশ শতকে বাংলার সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে ‘দুষ্ট’ বলে অভিহিত করছি, যা আমাদের সাহিত্যকে এগিয়ে যেতে বাধা প্রদান করেছিল এবং পয়ার ছন্দের শৃঙ্খলকে ‘অত্যাচারী’ হিসাবে অভিহিত করছি, যা আমাদের কাব্যকে শত শত বছর ধরে কঠোর সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ করে রেখেছিল। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এ অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং পরিচিত হন বাংলা সাহিত্যের ‘প্রথম বিদ্রোহী কবি’ হিসাবে। তাই, আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার নামকেও সার্থক করেছিলেন।

প্রথমত কবি হিসাবে মধুসূদনের সার্থকতা বিশ্লেষণ করা যাক। ‘যুগসন্ধিক্ষণের কবি’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের হাতে বাংলার কাব্যসাহিত্য প্রথমবার আধুনিকত্বের স্পর্শ অনুভব করেছিল। কিন্তু তা পূর্ণতা পায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের সৌজন্যেই। তিনি প্রথাগত ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে কাব্য রচনা করেন। তিনিই বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতা রচনা করেন। তিনি তার সনেটগুলোতে আকুল আবেগ চরম সফলতার মধ্যদিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। আমরা তার চারটি কাব্যের মধ্যে মহাভারত, রামায়ণ ও পুরাণের খণ্ডিত কাহিনিই দেখতে পাই। তিনিই প্রথম সফলভাবে পৌরাণিক চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে পেরেছিলেন। তাই আমরা তার কাব্যে সুন্দ, উপসুন্দ, রাবণ কিংবা ইন্দ্রজিতের মধ্যে পুরাণবর্ণিত নিছক রাক্ষসমাত্র দেখতে পাই না। বরং তাদের মধ্যদিয়েই ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবনের আবেগ ও দ্বন্দ্ব। উদাহরণস্বরূপ রামায়ণে রাবণ শুধু এক অসংযমী ও পরস্ত্রীপীড়নকারী রাক্ষস; কিন্তু, মেঘনাদবধে রাবণকে একজন প্রজাবৎসল রাজা ও পুত্রবৎসল পিতা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পুরাণে শুধু কামের বশ্যতা ও ভ্রাতৃঘাতকতাই সুন্দ ও উপসুন্দের মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসাবে নির্দেশিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘তিলোত্তমা সম্ভব’ কাব্যে দৈবের বিরোধিতা এবং পরাজিত ও ভীরু দেবতাদের ষড়যন্ত্রই তাদের পতনের মূল কারণ হিসাবে বর্ণিত হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে মধুসূদনের ভাষাগত দক্ষতা ও বর্ণনার কৌশল ছিল সর্ব সাহিত্যে অতুলনীয়। আমরা জানি, বস্তুগত দিক থেকে সুন্দ, উপসুন্দ, রাবণ কিংবা মেঘনাদ কখনোই আদর্শ চরিত্র হতে পারে না। কিন্তু মধুসূদনের লেখার এতই তীক্ষ্ণতা যে, তা পাঠ করলে আমাদের সবারই রাক্ষসের প্রতি অনুকম্পা জাগে। হৃদয় বলে, রাক্ষসের দৃষ্টিকোণ ঠিক; মস্তিষ্ক বলে, রাক্ষসের দৃষ্টিকোণ ভুল। এখানেই কবির সার্থকতা। বর্ণনার দক্ষতা ও শব্দচয়নের তীক্ষ্ণতার মাধ্যমে ‘দিনকে রাত’ করে ফেলার ক্ষমতাই মধুসূদনের সবচেয়ে বড় গুণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি তার বক্তব্য ও আবেগকে যে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারলেন, তার পূর্ববর্তী কবিরা সেই কার্যসাধনে ব্যর্থ হয়েছিলেন কেন? এর কারণ হলো, আমাদের আলোচনায় পূর্ববর্ণিত ‘অত্যাচারী’ পয়ার ছন্দের শৃঙ্খল। মধুসূদন এ অত্যাচারীকে দমন করে বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন। এটি বাংলা কাব্যকে হাজার বছরের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে। এ মুক্তির ফলে তিনি স্বাধীনভাবে তার বক্তব্য ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন। তিনি যদি ‘বিদ্রোহী কবি’ হয়ে না উঠতেন এবং পয়ার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়তেন, তাহলে তিনি হয়ত কখনোই কবি হিসাবে এমন সাফল্য অর্জন করতে পারতেন না। মধুসূদনের কাব্য সার্থকতার সঙ্গে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এ পর্যায়ে আমরা মধুসূদনের নাট্যগুণ সম্পর্কে আলোচনা করব। মধুসূদন কবি হিসাবে যতখানি সার্থক, ঠিক ততখানিই সার্থক নাট্যকার হিসাবে। বাংলাসাহিত্যে প্রথম সার্থক মহাকাব্যের পাশাপাশি প্রথম সার্থক নাটকটিও রচিত হয় তার তেজস্বী লেখনীতে। উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় নাটক লেখা ও মঞ্চস্থ হওয়া শুরু হয়েছিল। তবে মধুসূদন এগুলোর শিল্পগুণ দেখে প্রচণ্ড হতাশ হন এবং ১৮৫৯ সালে প্রকাশ করেন বাংলাসাহিত্যের প্রথম সার্থক ও মৌলিক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’। মধুসূদনের সামগ্রিক নাট্যপ্রতিভার পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করলে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক হিসাবে ‘দুর্বল’; অথচ সমগ্র বাংলা নাট্যসাহিত্যের মধ্যে অন্যতম ‘সবল’। ‘শর্মিষ্ঠা’ প্রকাশের পর থেকে তার নাট্যরচনার উৎকর্ষ একের পর এক বৃদ্ধিই পেয়েছিল।

মধুসূদনের কাব্যের বিশেষত্ব হলো গাম্ভীর্যপূর্ণ শ্রুতিমধুর তৎসম শব্দচয়ন; অপরদিকে, তার নাটকের বিশেষত্ব হলো মানুষের সুখ-দুঃখ মেশানো মৌখিক শব্দের সারল্য। মধুসূদনের আগেও বাংলায় নাটক লেখা হয়েছিল; কিন্তু এগুলো মধুসূদনের নিজের মতেই ছিল ‘কুনাট্য’। সমুদ্র দেখে এসে পুকুরে নামলে যেমন অনুভূতি হয়, গ্রিস-ব্রিটেনের উন্নত নাট্যসাহিত্য পাঠ করার পর বাংলার নাট্যসাহিত্যের করুণ অবস্থা দেখে মধুসূদনের তেমন অনুভূতি হয়েছিল। তিনি নিজে উদ্যোগ নিয়ে রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’।

‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকের ভাষা অত্যন্ত সরল হলেও তা স্থূল গ্রাম্যতার রূপ ধারণ করেনি। পরবর্তীকালে তার রচিত দুটি প্রহসন ও দুটি নাটক মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ আরও প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। বিশেষত, তার সর্বশেষ নাটক, ‘মায়া-কানন’ (নাটকটি তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়)-এর ভাষার সারল্য দেখে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়। অনেক পাঠকের জন্য এটা মেনে নেওয়া কঠিন যে, ‘মেঘনাদবধ’ ও ‘মায়া-কানন’ একই ব্যক্তি রচনা করেছেন।

এ প্রসঙ্গেই এবার তার গদ্য রচনার ওপর আলোকপাত করা যাক। তিনি বাংলায় শুধু একটি গদ্য রচনা করেছিলেন-‘হেক্টরবধ’ নামে। এটি হোমারের ‘ইলিয়ড’ মহাকাব্যের প্রথম কয়েকটি স্বর্গের অনুবাদ। এখানেও মধুসূদনের দিগ্বিজয়ী প্রতিভার প্রতিফলন ঘটেছে। তার গদ্য রচনাও অত্যন্ত উৎকৃষ্ট; যা আমাদের কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর। কারণ, তিনি কখনো বাংলা ভাষায় গদ্যচর্চা করতেন কিনা তা আমরা জানি না। ইংরেজিতে মাত্র কয়েকটি প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছিলেন-ঐটুকুই তার ‘হেক্টরবধ’-পূর্ব গদ্য সাধনা।

এ বছর এ মহাকবির জন্মদ্বিশতবর্ষ পালিত হচ্ছে। হ্যাঁ, আমরা এখানে স্বীকার করছি যে, মধুসূদনের আরও অনেক কিছু করার মতো প্রতিভা ছিল। শুধু অসংযম ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাত্রার কারণে তিনি তা করতে পারেননি; কিন্তু আমাদের দেখতে হবে আমরা কী করছি। আমরা কি এ মহাকবির যোগ্য উত্তরসূরির মতো বাংলাসাহিত্যকে উন্নত করার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করছি? আমাদের এ অনন্ত বিনোদনের যুগে আমাদের কিশোর ও তরুণরা এ সমৃদ্ধ সাহিত্যভান্ডার ভুলে যেতে বসেছে। চরম অসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতায় ছেঁয়ে গেছে আমাদের তরুণ সমাজ। সাহিত্যসম্রাট শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এ কথাটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না: ‘বাঙ্গালা সাহিত্য, বাঙ্গালার ভরসা’। আমাদের সাহিত্যের উৎকর্ষের অন্যতম পথপ্রদর্শক মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি মধুসূদন কখনো অনুসরণীয় নয়; সাহিত্যিক মধুসূদন সর্বদা অনুসরণীয়। তিনি আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকুন; এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সাহিত্য সম্রাটের ভাষায় বলতে চাই:

‘ভিন্ন ভিন্ন দেশে জাতীয় উন্নতির ভিন্ন ভিন্ন সোপান। বিদ্যালোচনার কারণেই প্রাচীন ভারত উন্নত হইয়াছিল, সেই পথে আবার চল, আবার উন্নত হইবে। কাল প্রসন্ন-ইউরোপ সহায়-সুপবন বহিতেছে দেখিয়া, জাতীয় পতাকা উড়াইয়া দাও-তাহাতে নাম লেখ ‘‘শ্রীমধুসূদন’’।’

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

আবু ইসহাকের সাহিত্য : আমাদের মাটি ও মানুষের শিল্প

গল্প রূপান্তর

রূপান্তর

এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতার নির্ভীক স্থপতি

এজরা পাউন্ড আধুনিক কবিতার নির্ভীক স্থপতি

পূর্ববঙ্গের ভাষা : শেষ পর্ব সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য

সাধুরীতি: গণচিত্তের গন্তব্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম